E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও চেতনা বিনাশ : কার দায় কতটুকু

২০২১ সেপ্টেম্বর ১৯ ১৪:৪৯:০৬
মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও চেতনা বিনাশ : কার দায় কতটুকু

আবীর আহাদ


১৯৭৫ সালে স্বাধীনতাবিরোধী দুর্নীতিবাজ লুটেরা ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বঙ্গবন্ধুকে পরিবার-পরিজনসহ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী চার জাতীয় নেতা ও বহু মুক্তিযোদ্ধাকে নির্মমভাবে হত্যা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছিলো। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ চেতনা ও অঙ্গীকার বিনাশের কার্যক্রম। তারই ধারাবাহিকতায় চলে চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধ্বংস ও অবমূল্যায়নের পালা। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিশেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির ওপর চলে অত্যাচারের স্টিম রোলার। এ-লক্ষ্যেই জিয়া এরশাদ ও খালেদা-নিজামী সরকার বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের নানান মামলায় জড়িয়ে জেল খাটিয়েছে। অনেক নেতাকর্মীকে হত্যা ও নানাভাবে অত্যাচার করেছে। সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন থেকে শত শত মুক্তিযোদ্ধা ও সৎ কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করেছে। ঐসব শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা, লুটপাট ও তাদের রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঐসব কাজগুলো অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে। এসব বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তারা তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তথা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকে এক বিন্দুও ছাড় দেয়নি।

জেনারেল জিয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম স্তম্ভ ধর্মনিরপেক্ষতাকে কলমের খোঁচায় মুছে দিয়ে দেশকে সাম্প্রদায়িক অপচেতনায় মণ্ডিত করার লক্ষ্যে জাতীয় সংবিধানে 'বিসমিল্লাহির রাহমানের রাহিম' আর জেনারেল এরশাদ আরো একধাপ এগিয়ে সংবিধানে তথাকথিত রাষ্ট্রধর্ম হিশেবে ইসলামকে সন্নিবেশিত করেন। অথচ এদেশের মানুষ কখনো এসব দাবি করেননি। এগুলো স্রেফ ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার একটি অপকৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। কে না জানে, জিয়া এরশাদ ও খালেদা জিয়া গদগদ কন্ঠে 'বিসমিল্লা' উচ্চারণ করলেও তারা ইসলাম ধর্মের ধারেকাছেও ছিলেন না। মাদকসহ অন্যান্য ব্যভিচারমূলক কর্মকাণ্ডে তারা আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন।

মূলত: মুখে আল্লাহ্ আর বগলে ছুরি এটাই ছিলো তাদের নিত্যদিনের আচার। আর এর মধ্য দিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে নাস্তিকসহ ভারতের দালাল হিশেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছে। এদেশের মানুষের চরিত্রও এমন যে, নিজেরা কতোটুকু ধর্ম পালন করে বা বিশ্বাস করে, সেদিকে তলিয়ে না দেখে অপরের ধর্মীয় বিষয়ে বেশ নাক গলিয়ে থাকে কাউকে নাস্তিক মুরতাদ ও বিধর্মী বলে অপবাদ দিয়ে একধরনের আত্মতৃপ্তি ও পুলক অনুভব করে থাকে। আসলে বিসমিল্লা ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এগুলো ছিলো এদেশের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে জিয়া এরশাদ ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রতারণা ও ধান্দাবাজি। অথচ কী আশ্চর্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামধারী আওয়ামী লীগ, তারাও জিয়া-এরশাদ প্রবর্তিত বিসমিল্লা ও রাষ্ট্রধর্মের মধ্যে অবস্থান নিয়েছে!

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ও বঙ্গবন্ধু আদর্শের অন্যতম স্তম্ভ যে ধর্মনিরপেক্ষতা, বর্তমান আওয়ামী লীগ সেটিকে বিসর্জন দিয়ে বসে আছে! বিশেষ করে ক্ষেত্রে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এ-ক্ষেত্রে জিয়া-এরশাদের আদর্শ অনুসরণ করে চলেছে! রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদ তথা ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বহুচিন্তার সমনিত ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনার স্থলে তথাকথিত মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনাকে লালন পালনের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ও চেতনাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থার জন্য জিয়া-এরশাদ ও বর্তমান আওয়ামী লীগ ইতিহাসের কাছে দায়ী হয়ে থাকবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

উপরোক্ত বিষয়সহ আরো কতিপয় সাংঘর্ষিকতার মধ্যে ডুবে থেকে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জনগণের মঙ্গলের কথা বলে কী করে? আগের একটার্ম ও চলমান তিনটার্ম একনাগাড়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেও জিয়া এরশাদ ও খালেদা-নিজামী অনুসারী তথা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের একটা কেশ স্পর্শ তো করেনি বরং তাদের কাছে থেকে মোটা অর্থ হাতিয়ে নিয়ে ও লুটপাটের ভাগাভাগির প্রক্রিয়ায় তাদেরকে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছে, পদোন্নতি দিয়েছে, লুটেরাদের অবাধে ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ক্ষমতাসহ তাদের দলের বিশাল নিবেদিতপ্রাণ নেতা ও কর্মী বাহিনী থাকার পরও স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও বিএনপির অপরাধী, বিশেষ করে রাজাকার ও রাজাকার শাবকদের নিকট থেকে বিশাল অর্থ নিয়ে তাদেরকে মামলাসহ অন্যান্য ঝামেলা থেকে নিরাপত্তা দেয়ার পাশাপাশি তাদেরকেই দলের বিভিন্ন স্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়ে মূল ও দরিদ্র আওয়ামী লীগার ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে।

এ-সুযোগে রাজাকার শাবকরা আওয়ামী লীগের তকমা গায়ে জড়িয়ে তাদের রাজাকার বাপ-দাদাদেরকে যেসব মুক্তিযোদ্ধা জাতীয় স্বাধীনতার প্রয়োজনে হত্যাসহ নানান শাস্তি প্রদান করেছিলো, সেসবের প্রতিশোধ নিতে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, তাদের বাড়ি দখল, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ নানান অত্যাচার করে চলেছে। সারা দেশের সর্বত্র চলছে মুক্তিযোদ্ধা দলন। হামলা। মামলা। মুক্তিযোদ্ধারা আজ তাদেরই সৃষ্ট দেশে পরবাসী হয়ে দুর্বিসহ জীবনযাপন করছে। এ-ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কোনোই প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না! অপরদিকে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গিবাদী হেফাজতে ইসলামের সাথে রাজনৈতিক দহরম-মহরম করার ফলে ঐসব জঙ্গিরা দেশের সর্বত্র সাম্প্রদায়িকতার উন্মাদনা সৃষ্টি করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। জামায়াত-বিএনপি থেকে আগত ও হেফাজতী জঙ্গিরাই এখন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড়ো সমর্থক । মুক্তিযোদ্ধা ও প্রকৃত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এসব দেখে চরম হতাশা ও মনোবেদনায় নীরবে চোখের জল ফেলছে।

জামায়াত-বিএনপির হাতে সৃষ্ট লুটেরা শ্রেণী আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর লোভী নেতৃত্বের যোগসাজসে তারাই আজ দেশের বড়ো বড়ো মাফিয়া। তারাই দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করছে, দেশের মধ্যে অতিবিলাসী জীবনযাপন করছে। আওয়ামী লীগের প্রশ্রয়ে বিএনপি-জামায়াতপন্হী আমলা ও ব্যবসায়ীরা দেশের প্রশাসন ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে প্রায় ভেঙে দিয়েছে। আর হেফাজত ধ্বংস করছে আবহমানকালের বাঙালি সংস্কৃতি। এককথায় বিএনপি জামায়াত ও হেফাজত বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী যে লুটেরা ধনবাদী রাজনৈতিক আর্থসামাজিক ও অপসংস্কৃতির পথ রচনা করেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নামধারী আওয়ামী লীগ সার্থকভাবে সেই রচিত পথেই দ্বিধাহীন চিত্তে হেঁটে চলেছে! আর এর মাঝখানে চিপায় পড়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি বিশেষ করে বৃদ্ধ ও দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষীণকণ্ঠে আর্তনাদ করে চলেছেন।

যে বিএনপি-জামায়াত সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ জামুকা সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা পাশ কাটিয়ে একটি গোঁজামিল সংজ্ঞায় তাদের দ্বি-দলীয় ক্যাডার এবং রাজাকার আলবদর আলশামস ও আলমুজাহিদের মধ্য থেকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টি করে গেছে, এসব জেনেও আওয়ামী লীগ সরকার সেই অমুক্তিযোদ্ধাদের উচ্ছেদ না করে তারাও বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা পাশ কাটিয়ে বিএনপি-জামায়াত সরকারের অনুসৃত নীতিমালা অনুসরণ করে সেই পঞ্চাশ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বহাল রেখে তারাও তাদের প্রায় সমপরিমাণ অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে ফেলেছে! এসব নিয়ে প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধারা ধারাবাহিক বাদপ্রতিবাদ করলেও তারা গভীর নীরবতা পালন করে অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েই চলেছে! আর এসবের মূলে রয়েছে অর্থ, আত্মীয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব।

বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে কোনোই ভুল করেনি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদানকারী আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে জেনে বা না-বুঝে বা তাদের অপরাজনৈতিক ও আর্থিক লাভের বেদীমূলে নিজেদের সমর্পণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার যেসব ভুল করে আসছে তা কি তারা একবারও ভেবে দেখেছে ?

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে দেশের রাজনৈতিক আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক ও জাতির নৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ যদি আত্মসমালোচনা আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযম না-করে তাহলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে ।

লেখক :মুক্তিযোদ্ধা লেখক ও গবেষক।

পাঠকের মতামত:

১৬ অক্টোবর ২০২১

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test