E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

একাত্তর আমার একাত্তর

২০২২ এপ্রিল ২৬ ১৬:২১:০৭
একাত্তর আমার একাত্তর

দেবেশ চন্দ্র সান্যাল


৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন ৭ ডিসেম্বর’৭০ ও ১৭ জানুয়ারি’৭১ সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ গণ পরিষদ (জাতীয় পরিষদ) আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয়লাভ করে। ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে একইভাবে ৩১০ আসনের মধ্যে ৩০৫ আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে। তখন পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদ ছিল ১৩টি সংরক্ষিত মহিলা আসন সহ ৩১৩ সদস্যের।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের একছত্র জননেতা অর্থাৎ এই প্রথম পাকিস্তান শাষন করবেন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ। এই অভাবনীয় ফলাফলে পাকিস্তান শাসককূলে আতঙ্ক দেখা দেয় এবং তারা বাঙালির বিজয়ে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু করে। বঙ্গবন্ধু পরিস্কার জানিয়ে দিলেন তিনি ছয় দফার কথা বলে নির্বাচনে জিতেছেন তাই তিনি শাসনতন্ত্র রচনা করবেন এবং দেশ চালাবেন ছয় দফার ভিত্তিতেই। পাকিস্তান সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যেকোন ভাবেই বাঙালির হাতে পাকিস্তানের শাসনভার তুলে দেয়া যাবে না। শুরু করলো ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা। ফলে নিজের অজান্তেই ইয়াহিয়া খান এবং তাঁর সতীর্থরা বাংলাদেশ নামে একটি রাষ্ট্র জন্ম দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে দিলো। ২৭ জানুয়ারি জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকা সফরে এসে বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনায় বসলেন। কিন্তু কোন মতৈক্যে না পৌঁছে তিনদিন পর পশ্চিম পাকিস্তান ফেরত যান। ১৩ ফেব্রুয়ারি এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। কিন্তু পাকিস্তান পিপল্স পার্টি (পিপিপি) নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান থেকে বিরত থাকবেন বলে ঘোষণা দেন। তিনি পাকিস্তানের দুই অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ২ দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবী জানান। বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর অনৈতিক দাবীর সমালোচনা করে বলেন, ক্ষমতা সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই দিতে হবে। ২২ ফেব্রুয়ারি’৭১ পশ্চিম পাকিস্তানি জেনারেলদের এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান গোপন নির্দেশ দিলেন-“৩ মিলিয়ন আওয়ামীলীগ ও তাদের সমর্থকদের হত্যা করুন”।

১ মার্চ ১৯৭১ দুপুরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এই খবর শোনা মাত্র ঢাকায় ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। মিছিল-সমাবেশে ঢাকা অগ্নিগর্ভ রূপ ধারণ করে। বঙ্গবন্ধু তখন হোটেল পূর্বানীতে আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারী দলের সভা করছিলেন। তিনি বিকাল ৩টায় সংবাদ সম্মেলণ আহ্বান করেন। সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারাদেশে হরতাল ও শোক দিবস পালিত হবে। তিনি ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে গণজমায়েতের ঘোষণা দেন। ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশের ঠেউ সারাদেশে পৌঁছে যায়।

২ মার্চ ঢাকায় সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ঢাকায় সব ছাত্র, শ্রমিক ও রাজনৈতিক দল বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল বেড় করে। বিক্ষোভের ব্যাপকতায় রাত ৮টায় সরকার কার্ফু জারী করে। বিক্ষোভকারীদের উপর গুলিবর্ষণ করে এবং বহু হতাহত হয়। ২ মার্চ ১৯৭১ ছাত্রলীগের সভায় ছাত্র লীগের পক্ষে ডাকসু সভাপতি আ.স.ম আব্দুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবণের সম্মুখে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ৩ মার্চ সারাদেশে একইভাবে হরতাল ও সাথে সাথে বিক্ষোভ সমাবশে ও বিক্ষোভ মিছিল হয়। বিকালে পল্টন ময়দানে বিক্ষোভ সমাবেশ বঙ্গবন্ধু সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ছাত্র নেতা শাজাহান সিরাজ নতুন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। সেদিন চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্র গোলা-বারুদ ও সৈন্য নিয়ে পাকিস্তানী জাহাজ “সোয়াত” আসে কিন্তু ডক শ্রমিকেরা এ খবর সারাদিকে ছড়িয়ে দেন এবং বিক্ষুব্ধ জনতা মালামাল খালাসে সৈন্যদের বাঁধা দেয় এবং পাকিস্তানী সৈন্য ও নাবিকদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বিকালে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জন সভায় জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচিত হলো। বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও জাতির পিতা ঘোষণা করা হলো। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হলো।

৪ মার্চ থেকে ৬ মার্চ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সারাদেশে সর্বাত্মক ও স্বতঃস্ফুর্ত হরতাল পালিত হয়। বিক্ষোভ সমাবেশ এবং মিছিলে গগনবিদারী স্লোগানে-বিক্ষোভে সারাদেশে উত্তাল। ঢাকায় প্রতি রাতে গুলিবর্ষণ করে এবং অনেক হতাহত হয়।

৭ মার্চ ১৯৭১ বাঙালির রাজনীতির নাটকীয় মোড় গ্রহণের দিন। বঙ্গবন্ধূর ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার জন্য ঢাকা ও আশ-পাশের এলাকা থেকে স্লোগনে-স্লোগানে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা বাঁশের লাঠি, রড, বল্লম ইত্যাদিসহ রেসকোর্স ময়দানে সমবেত হতে থাকে। দুপুরের মধ্যে পুরো ময়দান মানুষের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু এলেন রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষাধিক উত্তেজিত স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতার এক মহাসমুদ্রে। মঞ্চে উঠে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। “জয় বাংলা”। সমবেত জনতার “জয় বাংলা”; বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো”; তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব” ইত্যাদি স্লোগানে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতে থাকে। ১৯ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীণতার ঘোষণা না দিলেও ঠিকই স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিলেন, অস্ত্র হাতে নিতে বললেন। প্রেসিডেন্টের কাছে ৪ দফা দাবী করলেন। পূর্ব বাংলা পরিচালনার জন্য ১০টি সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিলেন।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনাসমূহ ৮ মার্চ যখন পালন শুরু হলো পশ্চিম পাকিস্তানে ভীতির সঞ্চার হলো। সেখানকার বড় বড় ব্যবসায়ীদের পূর্ব বাংলার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা, ব্যাংক-বীমা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়লো। সরকারি অফিস-আদালত, ব্যাংক বন্ধ থাকায় জনসাধারণের কিছু অসুবিধা সৃষ্টি হলো। তবে জনগণের কষ্ট লাগবে ও পূর্ব বাংলার অর্থনেতিক ক্ষতি রোধ করার জন্য কতিপয় ব্যাখ্যা ও ছাড় দেয়া হলো। অসহযোগ আন্দোলন স্বতঃস্ফুর্তভাবে চলে ২৫ মার্চ পর্যন্ত।

অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে সারাদেশে বিক্ষোভ-সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, রাতে মশাল মিছিল ছিল নিয়মিত কার্যক্রম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো ২ মার্চ থেকেই বন্ধ। আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে ঢাকার কবি-সাহিত্যিকরা “লেখক সংগ্রাম শিবির” নামে একটি কমিটি গঠন করেন। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত খেতাব বর্জন করতে থাকলেন। জানুয়ারি থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানে “প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও ভুট্টো জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করা এবং বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার উপর ভিত্তি করে রচিত খসড়া সংবিধান গ্রহণ না করে” ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে থাকে। ১৬ মার্চ ইয়াহিয়া তার সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে ঢাকা এলেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে সংকট সমাধানের লক্ষ্যে প্রহসন মূলক বৈঠক করতে থাকলেন। ২১ মার্চ বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার সাথে বৈঠকে যোগ দিতে ১২ উপদেষ্টাসহ ভুট্টো ঢাকা এলেন এবং বৈঠকে বসলেন।

২৩ মার্চ পাকিস্তান জাতীয় দিবসে বাঙালিদের বাসায় পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের নতুন জাতীয় পতাকা ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হল। প্রেসিডেন্ট ও ভুট্টোর সাথে বঙ্গবন্ধুর বৈঠক কোন সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা ছাড়াই শেষ হল ২৪ মার্চ। ২৫ মার্চ সকালে ভুট্টো ও বিকালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া অত্যন্ত গোপনীতায় পশ্চিম পাকিস্তান ফেরত চলে যান। প্রেসিডেন্টের বিমান রাত ১০টায় করাচী বিমান বন্দরে অবতরণের সংবাদ ঢাকা পৌঁছানোর সাথে সাথে ইষ্টার্ন কমান্ড হেড কোয়ার্টার থেকে বাঙালি নিধনকল্পে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর “অপারেশন সার্চলাইট” শুরু করার নির্দেশবার্তা-“বাছাই করো, খতম করো বাঙালিদের” সব ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছে যায়। রাত ১১.৩০ মিনিটে ঢাকা ও চট্টগ্রামে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অত্যাধুনিক অস্ত্র সজ্জিত হয়ে সামরিক বাহিনী ট্যাংক ও সাজোয়া যানসহ নেমে পড়ল রাজপথে। ঢাকার পিলখানায় ইপিআর সদর দপ্তর ও রাজারবাগ পুলিশ সদর দপ্তরে প্রথমেই আতর্কিত আক্রমণ চালায়, বাঙালি সৈন্য, ইপিআর, আনসার ও অন্যান্যরা প্রচন্ড প্রতিরোধের চেষ্টা করে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল এবং শিক্ষকদের বাসভবনে নৃশংস হত্যাকন্ড চালায়। পাকিস্তানের পশ্চিম অংশ কর্তৃক নিজ দেশের পূর্ব অংশের বাঙালিদের উপর শুরু হয়ে গেল ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুটপাট ও অন্যান্য মানবতা বিরোধী কর্মকান্ড।

সারারাত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত পাকিস্তান দখলদার বাহিনী বিভিন্ন পত্রিকা অফিস, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, মন্দির ও তাদের তালিকাভূক্ত বিভিন্ন স্থাপনা ও বাড়িঘর ধ্বংস করে এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। কারফিউ জারি করে পিলখানা, রাজারবাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ও আবাসিক এলাকায়, রমনা কালীবাড়ী মন্দির, শাঁখারীপট্টিসহ বিভিন্ন জায়গায় মেশিনগান ও স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা গুলি করে ও বেয়নেট চার্জ করে হাজার হাজার বাঙালিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। শুধু শাঁখারীপট্টিতে গলির দুই মুখ আটকিয়ে সেনা সদস্যরা ৮ হাজার হিন্দু আবাল-বৃদ্ধবনিতা হত্যা করে। পিলখানা ও রাজারবাগে ৫ হাজার ইপিআর এবং পুলিশ সদস্যকে এবং রমনা কালীবাড়িসহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় আরও কয়েক হাজার নিরস্ত্র বাঙালিকে হত্যা করে।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও ভুট্টো প্রকৃতপক্ষে কোন রাজনৈতিক সমাধানের জন্য বঙ্গবন্ধুর সাথে বৈঠক করতে আসেননি, এসেছিলেন সময় ক্ষেপনের জন্য। যাতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিমান ও জাহাজ ভর্তি করে দ্বিগুনের বেশি সেনা সদস্য এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ বাঙালি নিধনের জন্য আনা যায়। বঙ্গবন্ধু রাত ৮টায় গোপন সংবাদ পান যে তাঁর বাসায় রাতে পাকবাহিনী আক্রমণ চালাবে। তিনি সব নেতাকর্মীকে সতর্ক করে গা ঢাকা দেয়ার প্রস্তুতি নিতে বললেন। তিনি নিজ বাড়িতেই অবস্থান করলেন। রাত ১১.৩০ টায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণ শুরু হলে রাত ১২.২০ মিনিট অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীণতা ঘোষণা ও শেষ বানী প্রদান করেন এবং সারাদেশে প্রচারিত হয় যা নিম্নরূপ:

“এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে সেনাবাহিনীর দখলদারীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আপনাদেরকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।” (সুত্রঃ স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র প্রথম খন্ডের প্রথম সংস্করণ)। জাতির পিতার স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা ইপিআর ট্রান্সমিটার, মগ বাজার ওয়্যারলেস কেন্দ্র ও টেলিগ্রাম অফিসের মাধ্যমেও সারাদেশে প্রেরণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করায় ২৬ মার্চ’৭১ জেনারেল ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এক বেতার ভাষণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করেন।

রাত ১.১০ মিনিট একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে সেনা সদস্যরা বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। পরক্ষনেই বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব তাঁর শিশুপুত্র রাসেলকে নিয়ে এক প্রতিবেশির বাড়িতে আশ্রয় নেন। কয়েক ঘণ্টা পর বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। ঐ দিন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ. হান্নান চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। কারফিউ ২৭ মার্চ সকাল ৮.৩০ মিনিট পর্যন্ত বলবত থাকে। সাথে সাথে বাঙালি হত্যা ও স্থাপনা ধ্বংসে গোলাগুলি অগ্নিসংযোগ চলে পুরো সময়। তবে পাকিস্তান বাহিনী সর্বত্র জনতার প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়।

পাকিস্তান বাহিনী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সারা দেশে বাঙালি নিধন যজ্ঞের পর সারাদেশে ধ্বংস লীলা ও গণহত্যা চালাতে তাদের অভিযানের পরিধি বাড়াতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে বাড়ি-ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে এবং গুলিবর্ষণ করে নির্বিচারে বাঙালি নিধন করে।

১০ এপ্রিল অতি গোপনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে অস্থায়ী করে বিপ্লবী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। নবগঠিত বিপ্লবী সরকার ১৭ এপ্রিল ভারতের সীমান্তবর্তী মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননে শপথ গ্রহণ করে। এই দিনে এই স্থানের নামকরণ করা হয় মুজিব নগর। মুজিবনগর বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এই সরকারের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। এলাকাটি বর্তমানে মুজিবনগর হিসেবে পরিচিত এবং একটি উপজেলা। কয়েকদিন পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ভারত যান এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠক করে অস্থায়ী সরকারের জন্য অফিস, শরনার্থীদের জন্য থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র-গোলাবারুদের ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাজউদ্দিন আহমদ কে আশ্বস্ত করে বলেন যে শরনার্থীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং অন্যান্য সব সহায়তা অতি শীঘ্রই দেয়া হবে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর হত্যা, গণহত্যা, জ্বালাও, পোড়াও, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও লুটপাটের মহাযজ্ঞ পুরাদমে চলছে। সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত জামায়েতে ইসলাম ও অন্যান্য ইসলামী দল পাক-বাহিনীকে সহায়তার জন্য কুখ্যাত রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ইত্যাদি বাহিনী তৈরি করে। বিহারীরা এবং এসব বাহিনীর সদস্যরা সব রকমের নৃশংস কর্মকান্ডে পাক-বাহিনীকে সহায়তা এমনকি এরা পাক-বাহিনী অপেক্ষা বেশি নৃশংসতম কাজও করতো। জামাত শিবিরের সদস্যরা পাক বাহিনীকে সর্বতোভাবে সহায়তা করতো। পাকিস্তান সামরিক জান্তা পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে; তাদের দরকার শুধু সোনার বাংলার মাটি, আর কিছুই না। এপ্রিলের মাঝামাঝি পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসছে এটা দেখানোর জন্য পাকিস্তান সরকার কয়েকজন পাকিস্তানী সাংবাদিক বাংলাদেশে নিয়ে আসে। তাঁরা ঢাকা এবং দেশের বেশ কিছু এলাকা দুই সপ্তাহ ধরে ঘুরে দেখেন। পাকিস্তান বাহিনী পরিকল্পিতভাবে যেসব জায়গায় হত্যা-অগ্নিসংযোগ কম হয়েছে, সাংবাদিক দলকে সে সব জায়গায় নিয়ে যায়। সাংবাদিকগণ দেখতে পান ঢাকার রাস্তাঘাট জনশুন্য, বিশাল এলাকায় আগুনে পোড়ানোর চিহ্ন, দোকানপাট বন্ধ, গোলার আঘাতের গর্ত, বুলেটের দাগ, ঘন কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী তখনও আকাশের দিকে উঠছে, বাতাস দূষিত-এ সবই ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনার কথা বলছে। তারা বিভিন্ন জায়গা সফরের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে নারকীয় গণহত্যার গা কাঁপানো রূপ সচক্ষে দেখেছেন তা হিটলার বা তার নাৎসী বাহিনীর অমানবিক হত্যাকান্ডের চেয়েও ভয়াবহ। তখনও বিশ্ববাসী বাংলাদেশের গণহত্যা ও ধ্বংসলীলা সম্পর্কে কিছুই জানতো না। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা সম্পর্কে যা জানাতো সে টুকুই জানতো। প্রায় সব সাংবাদিক পাকিস্তান সরকারের মন মত সংবাদ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থার প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। একমাত্র সাংবাদিক এন্থনী মাসকারেনহাস অন্য সাংবাদিকদের মত ডাহা মিথ্যা না লিখে লুকিয়ে লন্ডন গিয়ে “সানডে টাইমস” এ তাঁর পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে চলা গণহত্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞের বাস্তব ও সত্যনিষ্ঠ প্রতিবেদন পেশ করেন। ১৩ জুন ১৯৭১ তারিখে “সানডে টাইমস” এন্থনী মাসকারেনহাস সরবরাহকৃত পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যার সকল ঘটনা প্রকাশের পর বিশ্ববাসী জানতে পারে প্রকৃত অবস্থা। ভারত সরকার লক্ষ লক্ষ শরণার্থী শিবির স্থাপন এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে থাকে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনার জন্য কলকাতায় অফিস ভবন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সবরকম সহযোগিতা প্রদান করে।

ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের জুন মাসে মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণের জন্য ক্যাম্প স্থাপন, প্রশিক্ষন প্রদান এবং অস্ত্র-গোলাবারুদের ব্যবস্থা করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর অযৌক্তিক গণহত্যা বন্ধে এবং ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী প্রায় ১ কোটি মানুষকে রক্ষার এবং বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিদানের জন্য জাতিসংঘ এবং সম্পদশালী ক্ষমতাধর দেশ সমূহের নেতৃবৃন্দের দ্বারে-দ্বারে ধর্ণা দিয়েছেন এবং কুটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে জোরালো সমর্থন জানায় এবং ভারতের মাধ্যমে অস্ত্রসহ অনেক সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করে। পিয়েরে ট্রুডোর কানাডা সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করে। অন্য দেশ ছাড়াও অনেক সরকারের ব্যক্তি, অনেক শিল্পী, সাংবাদিক ও ব্যক্তিগণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য ও পক্ষে কাজ করেন। মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র ও গণচীন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার দ্রুত সব বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে থাকে। বাঙালি সামরিক বাহিনীর, ইপিআর, পুলিশ-আনসার-মুজাহিদ সদস্যদের একত্রিত করে বাংলাদেশে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য কর্ণেল (অবঃ) মোঃ আতাউল-গণ ওসমানীকে সেনাবাহিনী প্রধান এবং বিমান বাহিনীর একে খন্দকার উপ-প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। পুরা দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে ১১ জন সেক্টর কমান্ডারও নিয়োগ দেয়া হয়, প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাব-সেক্টর কমান্ডারও নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্বর পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। প্রশিক্ষণ পেয়ে সাধারণ পরিবারের যুব-কিশোররা বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যগণের কমান্ডে ও গেরিলা গ্রুপ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। তাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি গণযুদ্ধ।

৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানের লায়ালপুর কারাগারে বন্দী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সামরিক জান্তা আনিত রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে গোপন বিচার সম্পন্ন করে এবং রায়ে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ দেয়। জেল প্রকোষ্টের কাছে কবর খুরে বঙ্গবন্ধুকে দেখিয়ে আপোষ করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। সাথে সাথে পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী জনগণ বঙ্গবন্ধুর সার্বিক নিরাপত্তা দাবী করেন।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালি নিয়মিত বাহিনীর সাথে বাংলার সদ্য প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দামাল ছেলেরা জীবন বাজি রেখে দেশকে পাকিস্তান দখলদার বাহিনী মুক্ত করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ও দেশ মাতৃকার টানে আমি আওয়ামীলীগের ৬ দফা, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা ও অন্যান্য তথ্য থেকে জানতে পেরেছিলাম সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ বিজয়ী হলে- পশ্চিম পাকিস্তানি অবাঙালি শাসকদের নিপীড়ন আর বৈষম্যের শিকার হতে রক্ষা পাওয়া যাবে। দেশের সম্পদ দেশে থাকবে। বাঙালিরা বিভিন্ন চাকরি পাবে। দেশ ধর্ম নিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক নীতিকে পরিচালিত হবে। তদানীন্তন বাঙালিদের অবিসংবাদিত নেতা মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে সাড়া দিয়ে আমি জীবন পন মহান মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলাম। আমি তখন রতনকান্দি আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। ২৩ জুলাই’৭১ ৬ শ্রাবন ১৩৭৯ শুক্রবার আমরা ২২ জন আমাদের শাহজাদপুরের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এ্যাড. জনাব মোঃ আব্দুর রহমানের কাছ থেকে সব জেনে শুনে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারত রওনা হই। ৩ দিন পায়ে হেঁটে ও অন্যান্য ভাবে বিভিন্ন ঝুঁকির মধ্যে খেয়ে না খেয়ে ভারতে গিয়ে পৌঁছাই। ভারতের কামারপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্প, কুড় মাইল, মালঞ্চ, প্রতিরাম ও শিলিগুড়ি জেলার পানি ঘাটা ক্যাম্পে বিভিন্ন আগ্নেয় অস্ত্রের ও অন্যান্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদেরকে নিয়ে আসা হয় ৭ নং সেক্টরের হেড কোয়ার্টার পশ্চিম বঙ্গের তরঙ্গপুরে। তরঙ্গপুর থেকে আমাদের প্রত্যেকের নামে নামে অস্ত্র ও গোলাবারুদ ইস্যু করা হয়। রাস্তাঘাট চেনা একই এলাকার ১০ জনের সমন্বয়ে আমাদের একটা গেরিলা গ্রুপ করা হয়। আমার এফ.এফ নং-৪৭৪২। তখন ৭ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন লেঃ কর্ণেল (অবঃ) কাজী নুরুজ্জামান।

আমাদের সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী। আমরা ছিলাম লাল গোলা সাব-সেক্টরাধীন। গ্রুপ কমান্ডার নিযুক্ত হন তামাই গ্রামের এম. এ মান্নান। আমাদের গ্রুপের কর্ম এলাকা নির্ধারণ করা হয় ৭ নম্বর সেক্টরের সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন থানা এলাকা। আমরা মানিকার চর, রৌমারী, বাহাদূরাবাদ ঘাটের সম্মুখ দিয়ে ৬ সেপ্টেম্বর’ ৭১ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করি। আমরা (১) বেলকুচি থানা আক্রমন যুদ্ধ (২) কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশন সংলগ্ন ব্রীজ পাহাড়ারত রাজাকার ক্যাম্প এ্যাম্বুস (৩) বেলকুচি উপজেলার কল্যানপুর যুদ্ধ ও (৪) শাহজাদপুর উপজেলার ধীতপুর নামক স্থানে পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকারদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েছি। আমি একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের রনাঙ্গনে বিজয়ী হয়ে ৯ ডিসেম্বর’৭১ আমরা জামিরতা উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্যাম্প করেছিলাম। ১৪ ডিসেম্বর শাহজাদপুর উপজেলা হানাদার মুক্ত হয়। জাতির পিতার নির্দেশে ২৪ জানুয়ারী’ ৭২ রবিবার সিরাজগঞ্জে অস্থায়ী অস্ত্র জমা ক্যাম্প ইব্রাহিম বিহারীর বাসায় অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়িতে এসে পড়া লেখা শুরু করি। ১২ মার্চ’ ৭২ ভারতীয় সৈন্যদের বিদায়ী কুজ কাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। ভারতীয় মিত্র বাহিনী আমাদের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে স্যালুট দিয়ে ভারতীয় সকল সৈন্য বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে গেলেন। ২১ নভেম্বর’৭১ মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনী নিয়ে যৌথ বাহিনী গঠন করা হয়।

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় এক জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। এমন সময় দিল্লী থেকে খবর আসে যে পাকিস্তান ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে বিমান হামলা করে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। তিনি সাথে সাথে দিল্লী ফিরে যান। সন্ধ্যায় মন্ত্রী পরিষদের জরুরি বৈঠক করেন এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। রাতেই ভারতীয় বিমান বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনা ও বিমান বন্দরে হামলা চালায়। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর সারাশি আক্রমণে পাকিস্তান বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে পর্যুদস্ত হয়ে যায়। ১৩ দিনের যুদ্ধে বর্বর পাকিস্তান বাহিনী পরাজয় বরণ করে নিতে বাধ্য হয়। ৬ ডিসেম্বর’৭১ সোমবার সকাল ১০.০০টায় প্রথম ভূটান এবং ১০.৩০টায় ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ১৪ ডিসেম্বর’৭১ আলবদর বাহিনী ৩০ এর অধিক বুদ্ধিজীবীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাঁদের চোখ তোলা লাশ রায়ের বাজার ও মিরপুর বৈধ্য ভূমিতে রেখে আসে।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিকাল ৪.৩১ মিনিট। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক মাহেন্দ্রক্ষণ। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলের জিওসি-ইন-সি লে. জে. এএকে নিয়াজী তার ৯১,৫৪৯ জন সৈন্যসহ বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের পক্ষে ভারতীয় পূর্ব রনাঙ্গনের জিওসি লে. জে. জগজিৎ সিং অরোবার নিকট আত্মসমর্পণ করে দলিলে স্বাক্ষর করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরণের লজ্জাকর পাবলিক আত্মসমর্পণের নজির আর নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। ৩০ লক্ষ শহীদ, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির, ৪ লক্ষ মা-বোনের বিভিন্ন নিপীড়ন ও কোটি মানুষের অন্যান্য ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পর ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানের নিকট বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তি দাবী করে। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বেশ কিচু দেশ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবী করে। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে আটক রাখার কোন অধিকার পাকিস্তানের নেই। ইতোমধ্যে ভুটান, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করে।

অবশেষে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। বঙ্গবন্ধু বৃটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের একটি বিশেষ বিমানে রাওয়ালপিন্ডি থেকে লন্ডন ও নয়াদিল্লী হয়ে ১০ জানুয়ারি ঢাকা বিমানবন্দরে তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। ৯ জানুয়ারি ১৯৭২ লন্ডনে বঙ্গবন্ধু বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার এডওয়ার্ড হীথ এর সাথে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন এবং সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। ১০ জানুয়ারি’৭২ বাংলাদেশে আসার পথে দিল্লী পালাম বিমান বন্দরে যাত্রা বিরতি করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি এবং প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠক করেন এবং এক সংবর্ধনায় যোগদেন এবং বক্তব্য রাখেন। সেদিন ঢাকা ছিল অন্যরকম, বিমান বন্দর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পৌঁছেন এবং বিশাল জনসমাবেশে আবেগপূর্ণ ভাষণ দান করেন। বঙ্গবন্ধু ১১ জানুয়ারি’৭২ অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারি করেন। এই আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। একদিন পর ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৪ ডিসেম্বর’৭২ (১) গণতন্ত্র, (২) সমাজতন্ত্র, (৩) ধর্ম নিরপেক্ষতা ও (৪) বাঙালি জাতীয়তাবাদ মূলনীতি সম্বলিত বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে স্বাক্ষর করেন। ১৬ ডিসেম্বর’৭২ হতে বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকরী হয়।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মত বড় নেতা এই ভূখন্ডে না জন্মালে হয়তো বাংলাদেশ নামে দেশের জন্মই হতো না। তাইতো তিনি বঙ্গবন্ধু থেকে বাঙালিদের জাতির পিতা/জনক হয়েছেন।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধাও সাবেক ব্যাংকার।

পাঠকের মতামত:

৩০ জুন ২০২২

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test