E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

জোর দেওয়া হউক বাজেট বাস্তবায়নে  

২০২২ জুন ৩০ ১৭:৫০:৩৮
জোর দেওয়া হউক বাজেট বাস্তবায়নে  

প্রভাষক নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার


বাজেট শব্দটি আমাদের সকলের নিকট পরিচিত। বিশেষ করে যখনই জুন মাস আসে তখনই এ নিয়ে চলে আলোচনা। বাজেট বিষয়টি নিয়ে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের তেমন একটা আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না। তবে এর ফলাফল থেকে কোন শ্রেণিই বাদ যায় না। আমাদের দেশে বাজেট আসলেই প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মনে একটা আতংক বিরাজ করে কোন পন্যের দাম বাড়ছে। গ্রামের মানুষের মাঝে এটা একটা ধারণা হয়েছে বাজেট মানেই দাম বৃদ্ধি। বেশ কয়েক বছরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শক্তিশালী হওয়ায় এর প্রচারণাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে মানুষের আলোচনা সমালোচনা করার জায়গা। 

এ বছরের বাজেটকে টানাটানির বাজেট, মূল্যস্ফীতি,ধনিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার বাজেট, লুপাটের দলিল, কর চাপানোর বাজেট, বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং, ব্যবসাবান্ধব, উচ্চাভিলাষী, নতুন প্রতিশ্রুতিহীন, ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো, অনেক অসঙ্গতি কিংবা সময়োপযোগী ও কল্যাণমুখী বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিভিন্ন দিক খেকে বিভিন্ন ব্যক্তি। সমস্যাটা হলো ভিন্ন জায়গায়। বাজেটে যে প্রভাবটুকু সাধারণ জনগণের উপর আসার কথা তার চেয়ে বেশি আসে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারনে যার নিয়ন্ত্রণ সরকারের পক্ষে করা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে বাজেট একটি আতংকের নাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে সাধারণ জনতার কাছে। গত ৯ জুন মহান জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২২-২৩ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন।

করোনাকালীন ও সম্প্রতি চলমান যুদ্ধকে সামনে রেখে ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকার একটা বিশাল অংকের বাজেট উপস্থাপন করেছেন। যার মধ্যে আয় ৪,৩৬,২৭১ কোটি টাকা ও ঘাটতি ২,৪৫,০৭৬ কোটি টাকা। ঘাটতি বাজেট সম্বনয় করার কথা বলা হয়েছে অনুদান, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে। প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্ধের মধ্যে ১৪.৭% শিক্ষা প্রযুক্তি, ১১.৯% সুদ, পরিবহন ও যোগাযোগ ১১.৮%, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন ৬.৬%, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ৩.৯%. স্বাস্থ্য ৫.৪ %, কৃষি ৩,৮%, প্রতিরক্ষা ৫.০%, জনপ্রশাসন ৭.৩%, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ ৪.৯%, জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ৪.৪%, গৃহায়ন ১.০%, বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্ম ০.৮%, শিল্প ও অর্থনৈতিক সার্ভিস ০.৬%, পেনশন ৪.৬%, ভর্তুকি ও প্রণোদনা ৮.৪ % ও বিবিধ ব্যয় ৪.৯% খাতে। প্রতি বছরই বাজেটে নতুন কিছু চমক থাকে।

এবারের বাজেট বিশ্লেষণে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি হলো পাচারের টাকা ফেরত আনলে দায়মুক্তি। প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী বিদেশে অবস্থিত যেকোনো সম্পদের ওপর কর পরিশোধ করা হলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ যেকোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করবে না। বিদেশে অর্জিত স্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে আনা না হলে এর ওপর ১৫ শতাংশ, বিদেশে থাকা অস্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে আনা না হলে ১০ শতাংশ ও বাংলাদেশে পাঠানো নগদ অর্থের ওপর ৭ শতাংশ হারে করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ সুবিধা ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। মূল কথা হলো এটি এক বছরের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এ প্রস্তাবটি দিয়ে দেশে কি পরিমাণ টাকা ফেরত আসবে তা ভাবনার বিষয় ? সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশে পাচারকৃত ফেরত আনার একটি কৌশল হতে পারে এটা। কিন্তু এ প্রস্তাবের ফলে পাচারকারীরা আরো উৎসাহী হতেও পারে। সময়ই বলে দিবে এ উদ্যোগ কতটুকু স্বার্থক হয়। সত্যিকার অর্থে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে বাজেট বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জ তারপরও দূর্নীতি একটা বড় সমস্যা। বর্তমান পৃথিবী এগিয়ে চলছে খাদ্য সংকটের দিকে সে ক্ষেত্রে কৃষি আমাদের মূল ভরসার জায়গা।

সরকার সে ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। চলতি বছরে বরাদ্ধ ছিল ১৮ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা যা প্রস্তাবিত বাজেটে বৃদ্ধি করে প্রস্তাব করা হয়েছে ২৪ হাজার ২২৪ কেটি টাকা। এ বাজেট সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে কৃষির অবস্থান আরো সুসংহত হবে এটা নিশ্চিত। আমাদের মনে রাখতে হবে কৃষি প্রধান এদেশের জিডিপির মূল জায়গা হচ্ছে কৃষি এবং বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে বাজেটের পূর্নাঙ্গ ব্যবহার করে কৃষি কাজকে আরো জোড়দার করতে হবে।

আমাদের মতো নি¤œ আয়ের দেশে দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করা মানুষগুলোর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ৫ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বরাদ্ধ করা হয়েছে যা অত্যন্ত ইতিবাচক। সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করা নি¤œ আয়ের মানুষগুলো বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখবে এবং সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয়গুলো এগিয়ে যাবে একধাপ। স্বাস্থ্য খাতের বাজেটে যে পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন ছিল সে পরিমাণে বৃদ্ধি করা হয়নি। ৪ হাজার ১৩২ টাকা বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে সরকারী স্বাস্থ্য সেবার উপর প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নির্ভর হয়ে পড়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা এই যে এ খাতে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব দেখেছে এদেশের জনগণ। তাই এবারের বাজেটের বরাদ্ধকৃত টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচনে ওয়ার্ল্ড এডুকেশন ফোরাম এডুকেশন ২০৩০-এর এজেন্ডা ঘোষণা করে যেখানে সদস্য দেশগুলোকে বাজেটের ১৫-২০% বা জিডিপির ৪-৬% শিক্ষা খাতে ব্যয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও এসডিজির চতুর্থ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিক্ষার প্রতি বরাদ্ধ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ বাজেটে শিক্ষা খাতে সে পরিমাণ বরাদ্ধ রাখা হয়নি।

বিশেষ করে শিক্ষার নতুন করিকুলাম বাস্তবায়ন ও করোনা পরবর্তী শিক্ষার ভেঙ্গেপড়া অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা নেই। প্রতিবার বাজেট এলেই যে জিনিষটা নিয়ে কথা বলা হয় কিন্তু সে পরিমাণ কাজে আসে না তাহলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। আমরা যত কথাই বলি না কেন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা না গেলে অর্থনৈতিক উন্নতি যেমন সম্ভব নয় তেমনি সামাজিক বিশৃংখলা রোধ করাও সম্ভব নয়। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে।

বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হলে সরকারকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে দেশের যুব সমাজের বিপথে যাওয়া রোধ হবে। আরেকটি বিষয় সকলের অন্তরালেই থেকে যায় তাহলো বিনোদন ও সংস্কৃতি খাত। খুর একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি কোন সময়ই কিন্তু এখাতে বিনিয়োগ করে সংস্কৃতিপ্রেমি জাতি হিসেবে আমাদের গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল। এবারের বাজেটে এ খাতে চলতি বছর থেকে মাত্র ২৭৪ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে প্রস্তাব করা হয়েছে। এখাতকে আরো অগ্রসর করার ক্ষেত্রে বাজেট বাড়িয়ে সুনজর দেওয়া প্রয়োজন।

কারন এ খাত থেকে বাংলাদেশের যথেষ্ট পরিমাণে আয় করা সম্ভব। বর্তমান সময়ে বাজেটের মূল সমস্যাটা হলো মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা এবং করোনার কারনে ভঙ্গুর অর্থনীতি। এসব বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সত্যিকার অর্থে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন যেকোন সরকারের পক্ষেই কঠিন। এক্ষেত্রে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ সরকারের দূরদর্শীতা প্রমাণ করে। এটুকু বলা যায় যা হয়েছে তা ভালোই হয়েছে কেবল বাজেটে উত্থাপিত খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে অতিক্রম করে সরকার বাজেট বাস্তবায়নে জোড় দিবে এটাই সকলের প্রত্যাশা।

লেখক : শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

০৭ আগস্ট ২০২২

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test