E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Technomedia Limited
Mobile Version

ভাষার দূষণ : ফিকে একুশের চেতনা

২০২৪ ফেব্রুয়ারি ১৭ ১৬:১৮:৫৪
ভাষার দূষণ : ফিকে একুশের চেতনা

মীর আব্দুল আলীম


বাংলাদেশে আজ থেকে ৭০ বছর আগে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিটি তৈরি হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই দেশটির রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেবার তৎপরতা শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে পাকিস্থান সরকার বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়া। আগাগোড়াই পাকিস্তান সরকারের মধ্যে বাংলা ভাষা বিরোধী মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশি ইতিহাসবিদদের মতে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল বলেই এ পরিকল্প না দেয় তারা। আর তা টের পায় আপামোর বাংলাভাষাবাসী মানুষ। প্রতিবাদ শুরু হয়। তখন কবিরাও থেমে ছিলেন না। লিখেছেন-

‘মাগো, ওরা বলে সবার কথা কেড়ে নেবে
তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না
বলো মা, তাই কি হয়?’

বাঙ্গালীর মধ্যে বাংলা ভাষা পরিবর্তন না করার অনড় সিদ্ধান্ত হয়। বাঙালির দামাল সন্তানেরা মার কোলে শুয়ে মাতৃভাষার গল্প শোনার ব্যবস্থা করেছে। জোড় প্রতিবাদ হয়। এ জাতি বীরের জাতি। এরা হারতে শেখেনি। সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জিতে যায় বাঙ্গালী। আমরা (বাঙ্গালী) যখনই পথ হারিয়েছি; অনিশ্চয়তার পানে হেঁটে চলেছি তখনই একুশ আমাদের পথ দেখিয়েছে। যুগিয়েছে প্রাপ্তির প্রত্যাশা ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সাহস। একুশ মানে কেবল বাংলা ভাষার প্রপ্তি নয়। এটা স্বাধীন বাংলাদেশের সূতিকাগার। ১৯৫২ সালেই বাংলাদেশের গোড়াপত্তন হয়েছিলো। তাই পাকিস্থানী অসহিষ্ণুতা ও সন্ত্রাসবাদকে বিনাশ করতে একুশের চেতনাকে ক্ষণে নয়, মনে ধারণ করতে হবে সবসময়। তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে।

একুশ আমাদের গৌরবের আত্মমর্যাদাপূর্ণ ত্যাগের স্মৃতিতে ভাস্বর। বাঙালি জাতির আত্মোপলব্ধির উত্তরণ ঘটেছে বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারির সংগ্রামের মাধ্যমে। একুশে ফেব্রুয়ারি বিশেষ কোন দিন নয়, একটি জাতির জীবন্ত ইতিহাস। ৭২ বছর পরেও এ ইতিহাস মৃত নয়, একেবারে জীবন্ত। একুশ একটি তারিখ নয়; একুশ হলো একটি চেতনার বীজমন্ত্র। এই চেতনার পথ ধরে ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচন এবং ১৯৭১-এ আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই গর্বের একুশ হয়েছে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ভাষার জন্য ত্যাগ এটি আন্তর্জাতিকভাবে মার্যাদায় এনেছে বাংলাদেশকে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের ইউনেস্কো এর সাধারণ পরিষদ ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ২৭টি দেশের সমর্থন নিয়ে সর্বসম্মতভাবে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। ইউনেস্কোর প্রস্তাবে বলা হয়, ‘১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্যে বাংলাদেশের অনন্য ত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ এবং ১৯৫২ সালের এ দিনের শহীদদের স্মৃতিকে সারা বিশ্বে স্মরণীয় করে রাখতে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কোর ১৮৮টি সদস্য দেশ এবং ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে উদযাপিত হবে। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় পাঁচ হাজার ভাষা সম্মানিত হল; এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালিত হয়।

বাংলা ভাষা আন্তার্জাতিক মর্যাদা পেলেও আত্নত্যাগে অর্জিত মায়ের ভাষা বহু বছর পেরিয়ে যেন তার সম্মান হারাচ্ছে। একুশের চেতনা যেন আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে আসছে। আমরা যখন ছাত্র তখন ফেব্রুয়ারি এলেই দেখতাম ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’- এই গানটি বেজে উঠত পাড়া-মহল্লায়। তখন চেতনায় গা শিউরে যেত আমাদের। এখন দেখি ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখটাতে শুধু আনুষ্ঠানিকতা চলে। শিক্ষার্থীদের মাঝে আগের সে অনুভূতি যেন কমতে শুরু করেছে। আমরা যখন ছাত্র তখন একুশের র‌্যালি মানেই যেন অন্য এক অনুভূতি। প্রস্তুতি চলত কয়েক দিন ধরে। একুশের সকালের র‌্যালিতে সবাই খালি পায়ে হাজির হতাম। কাউকে সড়কে সেদিন জুতা পরে হাঁটতে দিতাম না আমরা। আমরা একুশের চেতনা মনেপ্রাণে ধারণ করতাম। দিন দিন সেই অনুভূতি যেন ভোঁতা হয়ে আসছে। একুশের চেতনা কমতে শুরু করেছে নতুন প্রজন্মের কাছে। ফেব্রুয়ারি এলেই এখন বাংলা ভাষা নিয়ে হইচই হয়; আবার মার্চেই চলে ভিনদেশি ভাষার চর্চা। মায়ের ভাষাকে বাঁচানোর তাগিদ আসে বছরে এই একটি মাসেই। বর্তমানে একুশে ফেব্রুয়ারি বা ভাষা আন্দোলন স্কুলের পাঠ্যবইয়েই যেন সীমাবদ্ধ। একুশের ভোরেই শুধু অধুনা মানুষের গন্তব্য হয় শহীদ মিনারে।

দেশে বাংলা ভাষার অবমাননা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভুলে ভরা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড, ব্যানার, পোস্টারেও বানানরীতি মানা হচ্ছে না। ভাষা আন্দোলনের ষাট বছর পরও ভুল বানানের ছড়াছড়ি সর্বত্র। যুগের পর যুগ নানাভাবে এ বিষয়ে কথা উঠলেও বাংলার অবমাননা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এমনকি এ-সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের নির্দেশেরও তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। রাজধানীর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই নামকরণ করা হয়েছে বিদেশি ভাষায়। কোথাও আবার বিদেশি শব্দ লেখা হয়েছে বাংলায়। আবার কোথাও অহেতুক বাংলা শব্দকে ইংরেজিতে লেখা হয়েছে। আবার কোথাও-বা বাংলা-ইংরেজির মিশেল আর ভুল বানানের ছড়াছড়ি। ঢাকার প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামফলক লেখা হয়েছে ইংরেজিতে। উত্তরা থেকে শাহবাগ পর্যন্ত শত শত বিপণিবিতান আর দোকানের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়- প্রায় সবই ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড। শহরজুড়ে মোবাইল ফোন কোম্পানির ডিজিটাল বিলবোর্ডগুলোয় ব্যবহার করা হয়েছে ইংরেজি ভাষা। হাউজিং কোম্পানির বিলবোর্ডেরও দশা একই। খাবারের দোকানে বিরিয়ানি না লিখে লেখা হয়েছে ‘বিরানী’, কোথাও লেখা হয়েছে ভর্তার পরিবর্তে ‘ভরতা’ এ রকম অসংখ্য ভুল।

একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশ শিখিয়েছে অন্যায়, অবিচার ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, প্রতিরোধী হতে। অমর একুশের চেতনা আজও অমলিন। সেদিন মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলার তরুণরা মাতৃভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বাজাত্যবোধের যে মশাল প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন, সেই আলো দেশের সীমানা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে। বর্তমানে এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয় বিশ্বের সর্বত্র।

মাতৃভাষার জন্য আত্মদানের এমন নজির বিশ্বে আর নেই। রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে একুশের প্রভাব এতটাই সর্বব্যাপী যে, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। আত্মপরিচয় বিস্মৃত জাতিকে স্বরূপের সন্ধান দিয়েছে মহান একুশ। জাতি হিসেবে একতাবদ্ধ করেছে যেমন, তেমনি জুগিয়েছে অপরিমেয় শক্তি ও সাহস। অদম্য আত্মবিশ্বাসে করেছে বলীয়ান। বাঙালি এই দিনে আবার জেগে ওঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে। গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে সুসংহত করার সুদূর অঙ্গীকারে। শহীদ মিনার মহান ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম ও বীরত্বের প্রতীক। বাংলা ও বাংলাদেশের ইতিহাসে মহান ভাষা শহীদদের স্মৃতি হোক অমর, অক্ষয়, অবিনশ্বর।

নবাবি আমলে বাংলা ভাষার অনেক ভাঙাগড়া হয়েছিল। ঢুকে পড়েছিল ‘কুর্শি’, ‘দরজা’, ‘পেয়ালা’, ‘শরবত’ ইত্যাদি অনেক আরবি, ফার্সি শব্দ। এবার কি বেনো জলের মতো ঢুকে পড়বে হিন্দি, ইংরেজি, ‘জানেমন’, ‘চিপকলি’, ‘মজাক’, ‘নউটাঙ্কি’, ‘ড্রামাবাজি’র মতো শব্দ? স্বদেশে, পরদেশে, প্রবাসে বাঙালিদের মুহূর্তে বদলে যাওয়া মতিগতির সঙ্গে পালটে ফেলা টিভি চ্যানেলের মতো ‘মেড ইজি’ করতে কি বাংলা ভাষা এবার দোর খুলে দেবে অভিধানের? হবে নাকি, নতুন ভাষার নতুন কথার, নতুন নতুন মানে? সংস্কৃতের অপভ্রংশ মাগধী-প্রাকৃত ভাষা থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয় ১০০০-১২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই এই ভাষা এতটাই উন্নত এবং সমৃদ্ধ যে, সাংস্কৃতিক বৈষম্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অগণিত মানুষকে এক সূত্রে বাঁধতে পেরেছিল। গড়ে তুলেছিল বাংলা সংস্কৃতি ও জাতি। কিন্তু মাতৃদুগ্ধসম এমনই এক ভাষাকে যখন বর্জন করার আদেশ এলো তখন সন্তানদের বুকে খুব স্বাভাবিকভাবেই বেজে উঠেছিল বিদ্রোহের দামামা, যা আগুন হয়ে জ্বলে উঠেছিল একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে।

বাংলা ভাষা প্রয়োগে কোথায় যেন এক ধরনের অবহেলা। কোথায় যেন এক ধরনের হীনম্মন্যতা। কেন এমন করা হয়? এসব প্রশ্নের যেন কোনো জবাব নেই। অফিস, বাসা কিংবা রেস্তোরাঁয় বাংলার চেয়ে ইংরেজির প্রয়োগ বেড়েছে। অনুষ্ঠানে, রাস্তায়, গাড়িতে, পার্কে প্রায় সব জায়গাতেই হিন্দি কিংবা অন্য ভাষার গানের এখন জয়জয়কার। কালে কালে এই বুঝলাম যে, বেশির ভাগ বাঙালিই বাংলার চৌহদ্দি পেরোলেই বাংলা ভাষাটাকে পুরোনো ঘরে ফেলে আসা আসবাবের ঝুলধরা তাকের কোণে ঝং ধরা টিনের বাক্সে বন্দি করে আসে। সঙ্গে আনে ‘আমি বাঙালি’ নামক তকমা, যদিও তা হাতির দাঁতের মতো শুধুই বাহারি। বলতেই হয় সারা দেশে আজ বাংলা ভাষার অবমাননা চলছে। অথচ সারা পৃথিবীতে বাংলা এখন ষষ্ঠ ভাষা হিসেবে স্থান পেয়েছে। হাজারো ভাষার মধ্যে পৃথিবীতে আমরা যদি আমাদের ভাষার এই গৌরবজনক অবস্থানকে গুরুত্ব না দিই, তবে তার চেয়ে মর্মবিদারক আর কিছু আছে কি? উনিশ শতকে বাঙালি কৃতী চিকিৎসকরা বাংলা ভাষায় বই লিখেছেন। বিচারকরা বাংলা ভাষায় বিচারের রায় লিখেছেন আর চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনটিও বাংলা ভাষায় লেখেন না। আদালতে নাকি বাংলা ভাষা ব্যবহারটা জুতসই না!

গত তিন দশকে কত কিছুই তো আমাদের সামনে পাল্টাল। আমরা অনেকেই সেই রেকর্ড প্লেয়ার আর রেডিওর মায়া ত্যাগ করে ধরেছি টিভি। ছোটবেলার সেই মুড়ির টিনখ্যাত পাবলিক বাস এখন বিলাসবহুল হয়েছে। ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শীতল হাওয়া। গুলিস্তানের মতো ক্ষত-বিক্ষত সড়কের নিচে এখন পাতাল সড়ক আর মার্কেট গড়ে উঠেছে। কবছর বাদেই হয়তো পাতালে চলবে আধুনা রেলগাড়ি। এত কিছুর পরও কী করে বলি যে বাঙালি বদলায়নি? কে বলে যে বাঙালি পরিবর্তন চায় না? দলে দলে শহর, গ্রাম উজাড় করে এই যে আমরা দেশে, বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছি, কেন? মাত্র বছর কুড়ি আগেও যে ঠোকাঠুকি, চুলোচুলি, ঝগড়াঝাঁটির একান্নবর্তী সংসার ছিল, তা আজ ‘ছোট পরিবার, সুখী পরিবার’ হয়েছে। কেন বড় দোমহলা বাড়ির বিলাসিতা ছেড়ে আজ সবার কাম্য ‘টু বেডরুম, ডাইনিং ও কিচেন’। কেন পুরোনো, প্রাসাদোপম বাড়ি, বাজার ভেঙে চাই অত্যাধুনিক ‘মল’, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। চওড়া রাস্তার বুকে গজিয়ে তুলি উড়ালপুল। এসব কি পরিবর্তন নয়?

এ পরিবর্তনেরও প্রয়োজন আছে। তবে আমূল পরিবর্তন এসেছে ভাষা প্রয়োগেও। কিন্তু এ পরিবর্তন কি আমরা চেয়েছিলাম? আমরা কি চেয়েছিলাম মায়ের ভাষাটাকে বিকৃত করে দিতে; বদলে নিতে?
বর্তমান তরুণ প্রজন্ম বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে উদাসীন। বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে করছে বানান ভুল। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে তরুণ প্রজন্মের পাঠাভ্যাস হ্রাস পেয়েছে। তাই নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করার উদ্যোগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষার রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। আমাদের এই ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। যুগে যুগে কবি, সাহিত্যিকরা এ ভাষায় তাদের লেখনী দ্বারা দেশ ও জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। বাংলা ভাষার গাঁথুনি অত্যন্ত গভীর। গবেষকদের মতে, মাতৃভাষায় শিশুশিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ভাষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন বাংলা ভাষায় চলছে ব্যাপক দূষণ। অর্থাৎ ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ মান বজায় থাকছে না। এভাবে চলতে থাকলে বাংলা ভাষাও একদিন অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে। বাংলা ভাষাচর্চার ক্ষেত্রটি যদি পরিশীলিত না হয় তাহলে আমাদের জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশের মনে কখনও ভাষাপ্রীতি জেগে উঠবে না। মনে রাখা দরকার, নিজ ভাষার যথাযথ প্রায়োগিক দিকের সঙ্গে দেশপ্রেমের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জাতি, রাষ্ট্র ও ভাষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাংলা ভাষা নিয়ে তর্ক বহুদিনের পুরোনো। বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের দুহিতা জেনে অনেকে গৌরব বোধ করেন। অনেকের আবার এ ধরনের জন্মগত সম্পর্ক মেনে নিতে রয়েছে প্রবল আপত্তি। এ তর্ক নতুন করে শুরু করার আগে আসুন আমরা আলোচনা করে ঠিক করি, ‘বাংলা ভাষা’ বা ‘সংস্কৃত ভাষা’ বলতে আমরা কী বুঝব? ‘বাংলা ভাষা’র দুটি সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ রাষ্ট্র, ভারতের বিহার, আসাম ও মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে সর্বজনবোধ্য যে মান উপভাষাটি আছে যাকে সাধারণভাবে ‘মান চলিত বাংলা’ বলা হয়। সেটাকে ‘বাংলা’ বলা যেতে পারে। এ ছাড়া এ অঞ্চলে প্রচলিত বিশেষ কিছু ইন্দো-আর্য্য উপভাষার (যেমন- চট্টগ্রাম, সিলেট, মেদিনীপুর, বীরভূম অঞ্চলে প্রচলিত উপভাষা) সমষ্টিকেও ‘বাংলা ভাষা’ বলা যেতে পারে। ইংরেজি, ফরাসি ইত্যাদি সব ভাষার ক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটা আছে।

তবে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে ইংরেজি বা ফরাসির মতো ভাষার ক্ষেত্রে একাধিক মান ভাষার অস্তিত্ব রয়েছে (যেমন- যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রে আলাদা আলাদা মান ইংরেজি রয়েছে, ফ্রান্স আর কানাডার কুইবেকে রয়েছে আলাদা আলাদা মান ফরাসি)। সুতরাং ‘ইংরেজি’ বা ‘ফরাসি’ বলতে বোঝাবে সেই মান ভাষাগুলোর যেকোনো একটিকে বা একসঙ্গে ইংরেজি বা ফরাসির সবগুলো উপভাষাকে। মোট কথা, বর্তমান পৃথিবীতে ‘ভাষা’ কথাটির অন্তত দুটি আলাদা অর্থ রয়েছে : ১. সর্বজনবোধ্য মান উপভাষা এবং ২. সবগুলো উপভাষার সমষ্টি। সুতরাং ১. ‘বাংলা’ বলতে সর্বজনবোধ্য মান বাংলাকে বোঝাতে পারে আবার ২. সবগুলো আঞ্চলিক বাংলা সমষ্টিকেও ‘বাংলা’ বলা যেতে পারে। কিন্তু তা কোথায়?

একুশের চেতনার জন্ম হয়েছিল এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর বাঙালির প্রতি যে অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠি, ’৫২-র ভাষা আন্দোলন ছিল তারই একটি প্রবল প্রতিবাদ। শাসকের বুলেটও তা থামাতে পারেনি। ১৯৫২ সালের শুরুতে আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। ওই বছর একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ ও সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত হয়। পাকিস্তান সরকার আন্দোলন দমন করার জন্য ১৪৪ ধারা জারির মাধ্যমে জনসমাগম, জনসভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করে দেয়। ছাত্ররা সংগঠিতভাবে ১৪৪ ধারা ভাঙলে পুলিশ গুলি চালায়। শহীদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ নাম না-জানা অনেকে। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে সারা পূর্ব বাংলা। পরদিন সারারাত জেগে শহীদদের স্মরণে গড়া হয় শহীদ মিনার। পুলিশ তা ভেঙে ফেললে আবারও গড়ে ওঠে শহীদ মিনার। এ শহীদ মিনার একুশের শোক, সংগ্রাম ও শপথের প্রতীক। তা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও জাতিচেতনামূলক আন্দোলনের চালিকাকেন্দ্র হয়ে আছে আমাদের জাতীয় জীবনে।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, পরবর্তীতে সামরিক স্বৈরাচার এবং শোষণ বঞ্চনা বিরোধী আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে বাঙালিকে শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে একুশের চেতনা। বাঙালি জাতীয়তাবোধের চেতনা থেকে উৎসারিত সে আন্দোলন ক্রমে রূপ নেয় স্বাধীনতার আন্দোলনে। আর নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে আনে। তাই একুশে ফেব্রুয়ারির যে চেতনা আমাদের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে সাহায্য করেছে, সেই দিনটিকে কেবল আনুষ্ঠানিক নয়, প্রজন্মান্তরে বুকে ধারণ করতে হবে। বাঙালি জাতির নিজস্ব ভূখণ্ড শুধু নয়, স্বাধীন বাংলাদেশ আজ শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির নানা শাখা-প্রশাখায় এগিয়ে চলেছে। আমরা বিশ্বাস করি, এই এগিয়ে চলা অব্যাহত থাকবে এবং বিশ্বসভায় একদিন বাঙালি জাতি গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত হবে। পৃথিবীতে মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার জন্য আত্মাহুতি দেওয়ার ঘটনা বিরল। এ জন্য জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মাতৃভাষার চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি, যা ভাষা আন্দোলনের চেতনার বিপরীত। তবে আদেশ-নির্দেশ দিয়ে সেটি করা সম্ভব বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করেন না। এ জন্য ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেককে উপলব্ধি করতে হবে। পরিভাষা, অভিধানসহ সম্ভাব্য সব উপকরণ সহজলভ্য করার মাধ্যমে ভাষাচর্চার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অকারণে বিদেশি ভাষা ব্যবহারের অপচেষ্টাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, মানুষ মাতৃভাষা ছাড়া অন্যকোনো ভাষা শিখবে না বা চর্চা করবে না। বিশ্বায়নের এই যুগে এমনটি চিন্তা করা যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী, অন্যান্য ভাষাও শিখতে হবে। তবে মাতৃভাষার সুরক্ষা, বিকাশ এবং এর অবাধ অনুশীলনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তা না হলে জাতি হিসেবে ক্রমে আমরা পিছিয়ে পড়ব।

আজ বাঙালি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা শীর্ষস্থানও লাভ করেছে এবং করছে। কিন্তু যে ভাষার নামে তাদের পরিচয় সেই ভাষা তাদের রোজকার জীবনে কোন স্থানে রয়েছে? বিশ্বের দরবারে সে কতটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে? ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ বা তাদের স্বপ্ন আজ কতটা সফল? একুশের চেতনা আজ আমাদের মন কতটা ধরে রাখতে পেরেছে? এই প্রশ্নগুলো আজও সামনে এসে পড়ে! আধুনিক প্রজন্ম বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আজ ইংরেজি ছাড়া কথা বলে না, তাদের পড়াশোনার মাধ্যমও ইংরেজি হলে নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করে। বাংলা ভাষার এ অবহেলার অবসান ঘটুক। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে এটাই আমাদের আকাক্সক্ষা। বাংলা ভাষার চেতনা উজ্জ্বল করে তুলতে সবার উদ্দেশে আহ্বান, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের প্রতি ‘তোমরা বাংলা ভাষাকে জায়গা করে দাও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।’ রাজনীতিকদেরও বাংলা ভাষার ব্যাপারে আরো অনেক বেশি সচেতন হতে হবে; আমাদের অবশ্যই বর্তমান অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাকে এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিতে হবে। আর এটাই হোক ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে আমাদের বিশেষ প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।

পাঠকের মতামত:

১৭ এপ্রিল ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test