E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Technomedia Limited
Mobile Version

দেশ উন্নত হচ্ছে : সভ্যতায় পিছি যাচ্ছে

২০২৪ ফেব্রুয়ারি ২৫ ১৮:২৯:০৯
দেশ উন্নত হচ্ছে : সভ্যতায় পিছি যাচ্ছে

মীর আব্দুল আলীম


জাতীয় প্রেস ক্লাব ভিআইপি লাউঞ্জে নারায়ণগঞ্জ জেলা সমিতি আয়োজিত জাতীয় সাহিত্য উৎসবে আমার আমন্ত্রণে ২২ ফেব্রুয়ারী ভারতে ৫১জন কবি সাহিত্যিক যোগ দিয়েছিলেন। আামার বন্ধুবর কথা সাহিত্যিক দিলীপ রায়, ড. রামপ্রসাদ বিশ্বাস এবং ভারতের প্রখ্যাত আনন্দ প্রকাশনের করর্ণধার বন্ধু নিগামানন্দ বাবুকে অনুষ্ঠানের আগে পড়ে পদ্মা সেতু আর পূর্বাচলে নিয়ে গিয়েছিলাম। রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের গড়া সংগঠনের সিনিয়র ভাই প্রেসিডেন্ট শ্রদ্ধাভাজন ড. রামপ্রসাদ বিশ্বাস এসব দিে তো চিৎকার করে বলছিলেন- ‘এতো দেখি স্বর্গে এলাম’। প্রিয় বন্ধু নিগামানন্দ বাবু আমার আমন্ত্রণে প্রথম বাংলাদেশে এসেছেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি ভারত থেকে বাংলাদেশে ঘুরে যাওয়া মানুষের মুখ থেকে শুনেছেন- বাংলাদেশ নাকি ভারতে গ্রামগঞ্জের মতো। তিনি বলছিলেন এতো দেখছি সব উল্টে। বাংলাদেশের আধুনিকতা আর পাশ্চাত্যের ছোঁয়া দেখে অভিভুত হন তিনি। রাতের পূর্বাচলের সড়কে দেখে দিলীপ রায় বরছিলেন-“এটা বাংলাদেশ” ভারতেতো এমন সুন্দর সড়ক নেই। ২৪ তারিখে যেদিন ভারতে ফিরে যাচ্ছিলেন সবার মুলে একই কথা বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতায়ও মুগ্ধ তারা, দেশের উন্নয়নে উৎফুল্ল্য।

সত্যিই দেশ এগুচ্ছে। পরিচ্ছন্ন হচ্ছে আগের চেয়ে। জাতীয় দৈনিকেও এমন শিরোনাম দেখি মাঝে মাঝে- "আগের চেয়ে আজকের বাংলাদেশের মধ্যে বিরাট ব্যবধান'। কথাটা কিন্তু নিরেট সত্য। এ সময়ে আমাদের জীবন যাত্রার মান বেড়েছে, আমাদের সঙ্গতি বেড়েছে। বাংলাদেশ এখন আর হেনরি কিসিঞ্জারের 'তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। স্বপ্নের মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, উড়াল সেতু, এক্সপ্রেস সড়ক হয়েছে, পদ্মা সেতু হয়েছে বাংলাদেশের গাঁটের টাকায়। এটা চাট্টিখানি কথা নয়। কক্সবাজারের সর্বাধুনিক বিমানবন্দর হচ্ছে তা কিনা বিশ্বের প্রথম সমুদ্রের পানি ছুঁয়ে ওঠানামা করবে বিমান। কক্সবাজারে পাহাড় পথ বেয়ে ট্রেন চলে গেছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হচ্ছে অনেকটা সিঙ্গাপুরের আদলে, ৩০০ ফিট রাস্তা হয়েছে দুবাইয়ের আদলে আরও কত কি। বিশ্ব অর্থনীতি মন্দায় বাংলাদেশ কিছুটা হোচোঁট খেয়েছে। রিজার্ভে টান পড়েছে তবে বিদেশী ষড়যন্ত্র আর অপপ্রচার রোধ করতে পারলে আবার ঘুরে দাঁড়াবেই বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

পুরোটাই সত্য। এও সত্য, আমরা সভ্যতায় পিছিয়ে আছি। সভ্য এখনও হতে পারিনি আমরা। আমাদের রূপ বদলেছে, মানুষের ভেতরটা এখনও বদলায়নি। তাই কথায় কথায় ধর্ষিত হয় আমাদের নারী। জেল, জুলুম, ভেজাল, অন্যের জমির লুণ্ঠন সবই হচ্ছে সমান তালে। এগুলো বন্ধ হলে সোনার বাংলাদেশ হবে দেশটা। এখনও আমরা আইন মানি না, কথায় কথায় ঘুষ-দুর্নীতি করি, খাদ্যে ভেজাল দিই। সড়কে কথায় কথায় মানুষ মরে। বিষ মিশ্রিত খাবার খেয়ে মানুষ জটিল কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়। বিষাক্ত খাবার খেয়ে স্ট্রোক, হৃদরোগ আর ক্যান্সারে অকালমৃত্যর দিকে এগুচ্ছি আমরা। আগে যারা তিন বেলা খাবার পেত না এখন তারা মোটামুটি স্বচ্ছল। সবারই সঙ্গতি বেড়েছে। স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে বাংলাদেশ উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য অনেক দেশেই ছুটে গেছি। তা প্রায় ৩৫/৩৬টি দেশ হবে। যেসব দেশকে খুব দরিদ্র ভাবতাম তারা আমাদের চেয়ে সভ্যতায় অনেক বেশি এগিয়ে। ভুটানে যাইনি এই ভেবে পাহাড় আর গরিব দেশে কি দেখব, আর শিখবই বা কি? আমার পরিচালনাধীন আল-রাফি হাসপাতাল লি:-এর পরিচালক এবং ডাক্তারদের নিয়ে গত বছর এক অনুষ্ঠানে মায়ানমার যাই। আমরা ৮ লাখ মানুষের দেশ থেকে অনেক কিছু শিখলাম। মানুষ সভ্য হতে পুলিশ প্রশাসনের দরকার হয় না। ৪৬,৫০০ বর্গকিলোমিটার দেশের মানুষ আইন মেনে চলে। নিজ চোখে যা দেখলাম তাই লিখছি। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ভুটান একটি বিচ্ছিন্ন দেশ ছিল। ১৯৬০-এর দশকে ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে দেশটি একটি সভ্য রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে শুরু করে।

তবে এখনও এটি বিশ্বের সবচেয়ে অনুন্নত দেশগুলোর একটি। অনুন্নত একটি দেশ নিয়েই কথা বলছি আমি। হাসপাতালের ডাক্তার এবং পরিচালকদের নিয়ে মাত্র পাঁচ দিন ছিলাম। এ অল্প সময়েই নিজেকে সুস্থ অনুভব করছিলাম। খাবারের ভীতি ছিল না। ভেজাল দিতে ওরা বোধ হয় শিখেনি। নিম্নমানের হোটেলগুলো আমাদের পাঁচ তারকা হোটেলের মতো পরিচ্ছন্ন। ফল-ফলাদি খেলেই বুঝা যায় ভালো কিছু খাচ্ছি। দরিদ্র দেশটির মানুষগুলো পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করে। পোশাকাশাক দামি না হলেও আধুনিকতার ছাপ। সব চেয়ে বড় কথা ওরা আইন ভাঙে না কখনো। ঐ দেশে চুরি ডাকাতি নেই। যদি থাকতো মাইলকে মাইল পাহাড়ি নির্জন পথে আমরাই ডাকাতের কবলে পড়তাম। রাস্তায় ৫ দিনে পুলিশ দেখেছি একজন মাত্র। রাস্তার আইন ওরা শতভাগ মানে। তাই দুর্গম পথেও দুর্ঘটনা নেই বললেই চলে।

আমাদের বহনকারী ট্যুরিস্ট বাসটি নির্দিষ্ট জায়গাতেই থামছিল। আমরা কোনো দর্শনীয় জায়গা পেলে নামতে চাইলেও বলছিল, এখানে থামার নিয়ম নেই। ত্রিসীমানায় কেউ নেই, তবুও নিজ থেকেই ড্রাইভার নিয়ম মেনে চলছে। কখনো মোবাইল ফোন ধরার প্রয়োজন হলে গাড়ি থামিয়ে কথা শেষ করে তবেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি। পথচারীর চেয়েও ড্রাইভারগণ অনেক বেশি সচেতন। পথচারী পথ পাড় হবে বুঝতে পেরে বহু আগে থেকেই গাড়ি থামিয়ে বসে থাকে ড্রাইভার। এমন নিয়ম কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, জাপানে দেখেছি। বোধ করি তার চেয়েও গরিব দেশটিতে ড্রাইভাররা অনেক বেশি সচেতন মনে হয়েছে আমার। এখানে সিসি ক্যামেরা পুলিশ নজরদারি নেই, আইন না মানলেও দেখার কেউ নেই, তবুও ওরা আইন মানছে। ওরা সভ্য তাই সড়কে নিরাপত্তা বেশি। পাঁচ দিন সড়কে নির্ভয়ে চলেছি। ভীতি ছিল না। আমাদের ফুটপাথ দিয়ে চলতেও ভয় পাই, কখন গাড়ি গায়ে উঠে যায়। যখন দেশের বাইরে যাই, ফেরার রাতে দুঃস্বপ্নরা আমাকে পেয়ে বসে। ২৫ মে ২০১৯, ঘড়িতে তখন ৩টা বাজে, রাত ৩টা। আমার মনে হচ্ছে, কেউ আমাকে তাড়া করছে, ভীষণ ভয় দেখাচ্ছে।

আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি চিৎকার করতে, দৌড়ে পালাতে। কিন্তু কোনো এক অজানা শক্তি আমাকে তিল পরিমাণ নড়তে দিচ্ছে না। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম নিয়ে চিৎকার করে উঠে বসলাম। যে দেশেই যাই, প্রতিবারই দেশে ফেরার রাতে এ জাতীয় একই চিত্র, একই আতঙ্ক! এ আতঙ্কের অবশ্য কারণ আছে। দেশের বাইরে সভ্য মানুষ, সভ্য রাই দেখে সারাক্ষণ আমি ভাবনায় পড়ে যাই। ভাবি ওরা এমন কেন? আর আমরাই বা কেন এমন? সর্বশেষ লায়ন্স ক্লাবের বাংলাদেশ দলের সাথে মায়ানমারের ইয়াংগুনে যাই গত ২০১৮ এর ২২ মার্চে। অনেক ধনী রাষ্ট্রে যাবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। কিন্তু মায়ানমারের মতো দরিদ্র একটি রাষ্ট্রে এসে ওদের সভ্যতা আর আমাদের সভ্যতার তফাৎ দেখে বেশ লজ্জাবোধ হলো আমার। হতবাকতো হয়েছিই। মায়ানমার সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুব একটা ভালো নয়। ধর্মের বিষয়ে তো নয়ই। বার্মা বা মায়ানমার মানেই দরিদ্র একটি রাষ্ট্র।

মুসলমানদের নির্যাতনের ব্যাপারেও তাদের আছে অনেক বদনাম। সে দেশের সেনারা অনেক নিষ্ঠুরতা চালিয়ে মুসলমানদের ওরা হত্যা করেছে। যা সারা বিশ্বে ঘূর্ণিত। এ রাষ্ট্রের ব্যাপারে আমাদের বাজে অভিজ্ঞতা আছে। আর যাই হোক, ওরা আইনের প্রতি অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল স্বাস্থ্য সচেতন এবং দেশপ্রেমিক মনে হয়েছে আমার। এখানে এসে বুঝলাম আইন মানতে, আর সভ্য হতে অর্থের প্রয়োজন পড়ে না। ভালো কিছুর গুণকীর্তন করতেই হয়। মায়ানমারের ভালো কিছু থাকলে সেটা নিয়ে। আলোচনা করতেই পারি। মন্দটা না হয় ওদের কাছেই থাক। ওদের ভালো। কিছু যা আছে, যা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি তা নিয়েই এ লেখায়। আলোকপাত করবো আজ।

মায়ানমারের রাস্তায় ডিভাইডার নেই বললেই চলে। সাদা দাগ দিয়ে চলার পথ নির্দিষ্ট করা। রাস্তায় ট্রাফিকও নেই খুব একটা। অবাক করা কথা, ৫ দিনের যাত্রায় একটিবারও কাউকে নিজ দাগ অতিক্রম করতে দেখলাম না। আমরা যেখানে পারলে ইটপাথরের ডিভাইডার উল্টেপাল্টে চলতে অভ্যস্ত, সেখানে ওরা দাগও অতিক্রম করে না। একদিকে এক কিলেমিটার ট্রাফিক জ্যাম চলে গেছে। অন্যদিকে ধেয়ে চলছে গাড়ি। ডিভাইডার নেই তবুও কেউ কারও জায়গায় যাচ্ছে না। আমাদের দেশে ডিভাইডার দিয়ে যেখানে রক্ষা নেই সেখানে সাদা দাগই তাদের জন্য যথেষ্ট। ওভারটেকিং কিংবা হর্ন বাজানো দরকার না পড়লে কেউ করে না সাধারণত। দিনে এমন, দেখি রাতে ওরা কি করে? ইয়াংগুনের ৫ তারকা হোটেলের রুম থেকে গভীর রাতে রাস্তার দৃশ্য দেখতে জানালার পাশে গিয়ে বসলাম। গভীর রাতেও কাউকে দাগ অতিক্রম করতে দেখিনি । লেইন পরিবর্তন করতে গেলেও রাতেও ১/২ কিলোমিটার ঘুরে তবে অন্য লেইনে যায় গাড়িগুলো।

সৌদি আরব, চীন, সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, কোরিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশেই এ অবস্থা লক্ষ্য করেছি। ভাবি আমরা কেন ওদের কাছ থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না? আমাদের রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন তারা তো এসব দেশে আসেন। রাষ্ট্রের খরচায় ওনারা বিদেশে আসেন। প্রশ্ন হলো তারা কি এসব দেখেন না? শিখেনই না বা কেন? মন্দভাগ্য আমাদের। আমাদের লোকজন শেখেও না, শিখায়ও না। শিখলে আর শিখালে আমাদের রাষ্ট্রের পরিবহণ ব্যবস্থাও এমন হতো না কখনই । আইন করলেই হয় না। আইন প্রয়োগ করে শিখাতে হয়। ইয়াংগুনের অধিবাসীদের সাথে কথা বলে যতদূর জেনেছি, পরিবহণ ব্যবস্থা এমন করতে রাষ্ট্রযন্ত্র খুব নিষ্ঠুর ছিল। যারা আইন মানতো না তাদের কঠোর শাস্তি দিয়ে সত্য করা হয়েছে।

সভ্য হতে বাধ্য করে তবেই সভ্য করা হয়েছে। আর একবার কেউ সভ্য হয়ে গেলে, অসভ্য হতে বিবেকে বাধ সাধে। বলতে গেলে ওদেরকে সভ্য হওয়ানো হয়েছে। আমাদের যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে আমার কাছে অন্যসব মন্ত্রীদের চেয়ে একটু ভিন্ন মনে হয়। দেখি তিনি মাঝে মাঝে রাস্তায় নামেন। হুঙ্কার দেন। যদিও তার হুঙ্কার কাজে আসছে না। আসলে আমাদের সড়ক এখনও এতো অনিরাপদ থাকতো না। আমি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই- 'আমরা সভ্য নই, আপনি আমাদের সভ্য হতে বাধ্য করুন। কঠোর হোন। আমি বিশ্বাস করি আপনি চাইলে তা পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো ছোট পদ নয় যে, ইচ্ছা পূরণ হবে না। ইচ্ছা করতে হবে, নিষ্ঠুর হতে হবে, তবেই

আমাদের সভ্য বানাতে পারবেন আপনি। অনেক বদ অভ্যাস আছে আমার। কোনো দেশে গেলে রাতে ঘুরে ঘুরে শহর গ্রাম দেখি। প্রচন্ড শীত মাইনাস ৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা। শীতে যবুথবু, তবুও দিন শেষে রাতেও ঘুরেছি। নিরাপদ মনে করেছি তাই রাতে ঘুরতে ভয় হয়নি। নির্জন পাহাড়ি পথে কেউ থামিয়ে আমাদের অর্থকড়ি ছিনতাই করতে আসেনি। যেবার ইয়াংগুন গিয়েছি, রাতের ইয়াংগুন দেখবো বলে রাত ১২টায় আমার বড়ভাই (ফুফাতো) সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির অন্যতম পরিচালক লায়ন শামিম মাহাবুবকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। বিদেশ বাড়িতে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে তিনি শঙ্কিত ছিলেন। আমার ভেতরে ভয় নেই। কারণ যদি ভালো করে নাই দেখলাম, পাঠকের জন্য কি লিখবো। লিখার তাড়নায় আমি অনেক বেশি সাহসী হলাম। ইয়াংগুনে রাতেও টেক্সি পর্যাপ্ত। দিনে তো পানি পাস্তার মতো। রাস্তায় কোথাও গাড়ি পার্কিং করে না কেউ, করলেই জরিমানা।

আমরা ইয়াংগুনে বিমানবন্দরে আসার সময় কিছুটা সময় অপেক্ষা করাতেই গাইডকে জরিমানা গুণতে হয়েছে। যা বলছিলাম রাতেও ট্যাক্সির জন্য খুব একটা অপেক্ষা করতে হলো না আমাদের। মিনিট দুই মাত্র। রাত বারটা মানেই সেখানে অনেক রাত। কারণ মায়ানমারের অধিবাসীরা রাতের খাবার ৭টার মধ্যেই সেরে নেয়। সকালের নাস্তাও সকাল ৭টায় শেষ হয়। আমাদের তাই করতে হয়েছে প্রতিদিন। না করলে নাস্তা কিংবা ডিনার সম্ভব ছিল না। টেক্সি নিয়ে রাতে পই পই করে ঘুরেছি আমরা। দেখেছি রাতের ইয়াংগুন। সবাই নিশ্চিন্তে চলছে। ছিনতাই কিংবা প্রতারিত হবার ভয় নেই। দিনে ট্রাফিক চোখে না পড়লেও রাতে পুলিশ দেখেছি পর্যাপ্ত।

যতদিন ছিলাম লায়ন্স ক্লাবের প্রোগ্রাম শেষে হোটেলে ফিরে ডিনার এবং কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে রাতে ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। অল্প সময়ের জন্য গিয়েছি সেখানে, তাই রাতের সময়টাও নষ্ট করতে চাইনি আমি। ফাঁকি দিলে ভালো কিছু লেখা হবে না। তাই সময় কাজে লাগানো আরকি। এদেশে রাতে ঘুরে বেড়ানো দুষ্কর হয় বৈকি! কক্সবাজার সী বীচে রাতে ছিনতাইয়ের খবর জানতে পারি। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় তো রাত ১০টার পর ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। রাতে শহর কিংবা গ্রামে একা চলা দায়। মাস্তান ছিনতাইকারীদের ভয়। কি জানি কি হয়। আমাদের দেশটা কিন্তু অর্থনীতিতে অনেক এগিয়েছে। দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। সভ্যতায় এগোয়নি বরং পিছিয়েছি।

লজ্জা লাগে আমরা সৎ নই, ঘুষখোর। বেতন বাড়ে চরিত্র ভালো হয় না। প্রধানমন্ত্রীকে ঘুষের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিতে হয়। ভেজাল খাদ্য রোধে নির্দেশ দিতে হয়। সড়ক নিরাপদ করতে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে কেন বলতে হবে। আমাদের কি কোনো দায়- দায়িত্ব নেই। মন্ত্রী, আমলা, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কি করেন? নাকে তেল দিয়ে ঘুমান? আমরা কখনই ভাবি না আমরা সভ্য হলেই দেশটা সভ্য হয়।

বিদ্যুতের অভাবনীয় সাফল্য এবং শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, একটি বাড়ি একটি খামার, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার তিন বছর ধরে রয়েছে ৭ শতাংশের ওপরে। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অনেক প্রভাবশালী দেশকে ছাড়িয়ে যাবে । এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, যা নিয়ে দেশের নীতিনির্ধারকসহ বিভিন্ন মহল স্বাভাবিকভাবেই বেশ উচ্ছ্বসিত। কিন্তু উচ্ছ্বসিত নই সভ্যতায়। খাবারে ভেজাল বাড়ছে, সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে, দুর্নীতি বাড়ছে। আগে পুলিশকে ২/৫শ টাকা দিলে চলত। পরে হাজার, লাখ ছাড়িয়ে কোটির অংকে ঘুষ লেনদেন হয়। ভূমি অফিসে, সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ম করে, কাজ অনুসারে প্রকারভেদে নানা অংকের ঘুষের লেনদেন চলে।

হাসপাতালে দুর্নীতি চলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি। কোথায় নেই দুর্নীতি? এক প্রধানমন্ত্রী একা কি দুর্নীতি রোধ করতে পারবেন? দেশটা আমাদের সবার, আসুন আমরা সবাই মিলে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি ।
সিন্ডিকেটের কবলে আটকে আছে দেশ। আর এ কারনে দ্রব্যমুল্য উদ্ধগতি বলতেই হয় গরিব, মধ্যবিত্ত কেউ আর ভালো নেই, সুখে নেই। সম্প্রতি ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ‘ চাল তেলসহ সকল পণ্যেও দাম উর্দ্ধমুখী : জীবনের চাকা ঘোরাতে পারছে না নিম্ন আয়ের মানুষ’ এমন শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের নানা কথা লেখা আছে প্রতিবেদনটিতে। ‘কেমন আছেন?’ প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে রিক্সা চালক মিজানের সাফ কথা, ‘বালা নাইক্কা’। রিক্সার চাকাতো ভালই চলছে, আমরাও তো ভাড়া ঠিকঠাক মতই দিচ্ছি বলতেই- ছন্দে ছন্দে একদমে রিক্সা চালকের উত্তর- ‘চাল-তেল, আটা-ময়দার দাম আকাশ ছোঁয়া, কী কইরা ঘুরাই জীবনের চাকা।’ সেদিন কঠিন সত্য কথা বললেন- রমনার চা বিক্রেতা সাইফুল। ‘বালা থাহনের কোনো পথই খোলা নাই। পর্তেকদিন চরকির মতন ঘুইরা চা বিক্রি কইরা যা আয় অয় তা দিয়া জীবনের চাকা ঘোরাইতে পারি না ‘ দ্রব্যমূল্য নিয়ে এমন অভিযোগই এখন সবার।

অসভ্যতার একটা সীমা থাকা চাই। দেশে ফ্রেশ বিষমুক্ত খাবার নাই। প্রতিনিয়তই খাবারের সাথে বিষ আমাদের পেটে পরছে। আমরার খাবার খাব, আর সেই খাবার হবে বিশুদ্ধ; বিশুদ্ধ খাবার নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। এটাতো আমাদের অধিকার। আমরা কি বিশুদ্ধ খাবার পাচ্ছি? মাছে, ভাতে, আমে, জামে, কোথায় নেই বিষ? ক’দিন আগে এক বিখ্যাত কলামিষ্ট তার লেখায় লিখেছিলেন- “আমরা প্রতি জনে; প্রতি ক্ষনে; জেনে শুনে করেছি বিষ পান।” প্রতি দিন আমরা যে খাবার খাচ্ছি তাতে কোন এক মাত্রায় বিষ মেশানো আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। খাদ্যে ভেজালের শাস্তি ৭ থেকে ১৪ বছর কারাদন্ড। ক’জনকে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। বোধ করি একজনকেও না। তাই ভেজালকারবারীরা ভেজাল মিশাতে সাহস পাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে খাদ্যে ভেজাল নেই বললেই চলে। আমাদের পাশের দেশ ভারত, ভুটানেও ভোক্তা অধিকার আইন খুবই কর্যকর। সেসব দেশে খাদ্যে ভেজাল প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তিও হয়। আর ভেজাল পণ্য বাজার থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। বাংলাদেশে ভেজার খাদ্যের কঠোর আইন আছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ঠিকভাবে ফলোআপ করে না। লোক দেখানো অভিযানও চলে মাঝেমাঝে। কেউ ধরা পড়লে আইনে ফাঁকফোঁকড়ে আবার বেরিয়ে যায়। শাস্তি হয় না। তাই তারা ভেজাল মেশাতে সাহস পায়। কঠিন শাস্তি দরকার।

এদিকে গত ১০ বছরে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস পাওয়ায় বেড়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। ইতোমধ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে প্রথম কৌশল হিসেবে বড় আকারের ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা- ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ। স্বাধীনতার সময়ে আমাদের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ছিল। সে অবস্থা থেকে এক ধরণের টেকসই ভিত্তি তৈরি করা গেছে বর্তমান অর্থনীতিতে। যার ফলে আমাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক তৈরি হয়েছে। যেমন প্রবৃদ্ধির মাত্রাগুলো একটি গতি ধরে এগিয়েছে।

স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরে আমাদের চাওয়ার জায়গাটায় একটি পরিবর্তন এসেছে। এখন কেবল সভ্য হতে হবে আমাদের। সর্বশেষ এটাই বলা যায়, আমাদের সকল ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে। যার যার কাজ তাকেই করতে হবে। দুর্নীতিকে না বলতে হবে। পরিবেশ সচেতন হতে হবে। খাদ্যে সচেতন হতে হবে। যোগাযোগ, বিশেষ করে ট্রাফিক আইন মানার বিষয়টিতেও আমাদের অনেক শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিতেও আমাদের সজাগ হতে হবে। ঐ যে বললাম আমাদের সকলকে সভ্য হতে হবে। তবেই সোনার বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক হবো আমরা।

লেখক : সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।

পাঠকের মতামত:

২১ এপ্রিল ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test