E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Walton New
Mobile Version

বজ্রপাত প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন সতর্কতা 

২০২৪ মে ২৮ ১৫:২৪:৩১
বজ্রপাত প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন সতর্কতা 

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ


ঝড় বৃষ্টির সময় একটি সাধারণ ঘটনা হল বজ্রপাত বা বিদ্যুৎ চমকানো। উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি আর গুড়গুড়ে শব্দের বজ্রপাত বেশ ভীতিকর পরিস্থিতির জন্ম দেয়। তবে বৃষ্টি না হলেও অনেক সময় আকাশে প্রচণ্ড মেঘ জমে এমন বজ্রপাত শুরু হতে পারে। মূলত বজ্রপাত হল মেঘের বৈদ্যুতিক চার্জিত অঞ্চল থেকে হঠাৎ  চার্জ নিঃসরণ। এই চার্জ নিঃসরণ মূলত মেঘ ও ভূমির মধ্যকার বা পাশাপাশি দুই মেঘের মধ্যকার চার্জের তারতম্যের কারণে হয়ে থাকে। 

বজ্রপাত কীভাবে হয়?

প্রচণ্ড গরমে চারপাশ যখন উত্তপ্ত, তখন এক পশলা বৃষ্টি স্বস্তি এনে দেয়। আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালে তীব্র গরম থাকে। এ সময়ে মাঝে মাঝে দেখা মেলে কালবৈশাখী ঝড়ের। ঝড় বা বৃষ্টি ছাড়াও বজ্রপাত খুব সাধারণ এক ঘটনা। গ্রীষ্ম-বর্ষায় আকাশে মেঘ জমলেই শুরু হয় গুরু ডাক। মেঘ আরেকটু ঘনিয়ে এলে শুরু হয় বজ্রপাত। কিন্তু ঠিক কীভাবে বজ্রপাতের ঘটনাটি ঘটে?

বজ্রঝড় বা বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের শুরুটা হয় বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে। পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে উপবৃত্তাকার পথে। নিজ অক্ষের ওপরও ঘুরছে প্রতিমুহূর্তে। এসব ঘূর্ণনের ফলে দেখা যায়, বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় পৃথিবীর কিছু এলাকায় সূর্যের আলো তুলনামূলক বেশি সময় ধরে পড়ে। অর্থাৎ দিনের দৈর্ঘ্য বড় হয়।

বেশি মাত্রায় সূর্যের তাপ ভূ-পৃষ্ঠে পড়ায় পৃথিবীপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়। উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে বায়ুতে। উষ্ণ, আর্দ্র বায়ুর ঘনত্ব ঠান্ডা বাতাসের চেয়ে বেশি হওয়ায় দ্রুত ওপরে উঠে যায়। ঠান্ডা, শুষ্ক বাতাস পড়ে থাকে নীচে।

ওপরে ওঠার সময় বাতাসের জলীয়বাষ্প ধীরে ধীরে আরও ঠান্ডা হয়ে পরিণত হয় পানির ফোঁটায়। তৈরি হয় মেঘ। এই পানির কণাসমৃদ্ধ বাতাস দ্রুত তাপ ছাড়তে থাকে চারপাশে। ফলে, মেঘ ওপরে উঠতে থাকে। মেঘের আশপাশের অংশে শক্তিশালী ও উর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়।

এর প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয় বিশাল বজ্রমেঘ। খাতা-কলমে এ মেঘের নাম ‘কিউমুলাস নিমবাস’। এই মেঘ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উঁচুতে গিয়ে ঠেকতে পারে। এ উচ্চতা পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ক্রমে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে কমতে থাকে। কিন্তু এর বাইরে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা আর কমে না। বাড়তে থাকে। ফলে এখানে এসে অদৃশ্য এক তাপীয় দেয়ালে ঠান্ডা বাতাস ধাক্কা খায়। প্রচুর পরিমাণ মেঘ এখানে এসে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। ঝড়ের মেঘের সাধারণ আকৃতি—নৌকা বা এনভিল আকৃতি গঠন করে এ সময়।

মেঘের মধ্যে যত বেশি জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়, ততই পানির ফোঁটাগুলো একটা আরেকটার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বড় হতে থাকে। ওপরের অংশে তাপমাত্রা কম হওয়ায় সেখানে পানি আরও শীতল হয়। ফলে জমতে থাকে বরফকণা। পানি ও বরফের এসব কণা যথেষ্ট ভারী হলে বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি হিসেবে ঝরতে শুরু করে। তৈরি হয় শীতল বাতাসের এক নিম্নগামী স্রোত। এই বাতাস প্রচণ্ড গতিতে ছড়িয়ে পড়ে ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি অংশে। হঠাৎ করেই পরিবেশের তাপমাত্রা কমে যায়। তীব্র গরম থেকে মেলে স্বস্তি।

ওদিকে মেঘের মধ্যে চলে ইলেকট্রনের খেলা। বায়ুপ্রবাহের কারণে মেঘের অজস্র পানির কণা বরফের কণাগুলোর সঙ্গে ক্রমাগত ঘষা খেতে থাকে। ফলে, পানি ও বরফের কণা থেকে ইলেকট্রন মুক্ত বরফের বড় বড় কণায় চলে যায়।

ওপরের দিকে ভারী ও ঋণাত্মক চার্জের কণা, ইলেকট্রন জড়ো হয়। আর এর বিপরীত, অর্থাৎ নিচের অংশে তৈরি হয় ধনাত্মক চার্জের রাজত্ব। মানে, মেঘের ওপর ও নিচের অংশ জমে বিপরীতধর্মী চার্জ। তৈরি হয় বিভব পার্থক্য। এ পার্থক্য যথেষ্ট পরিমাণ হলে হঠাৎ প্রচণ্ড তড়িৎ প্রবাহিত হয় উচ্চ বিভব থেকে নিম্ন বিভবের দিকে। ফলে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয়। এই তাপ ও তাপের কারণে সৃষ্ট কম্পন থেকেই তৈরি হয় শব্দ ও আলো। নিচ থেকে আমরা এ ঘটনাকে বজ্রপাত বলি। তবে, এটা ইন্ট্রা-ক্লাউড ধরনের বজ্রপাত। অর্থাৎ মেঘেই জন্ম, মেঘের মাঝেই এর ইতি।

মেঘের ঋণাত্মক চার্জ ভূ-পৃষ্ঠের ইলেকট্রনকেও আন্দোলিত করে। ফলে ভূ-পৃষ্ঠে তৈরি হয় ধনাত্মক চার্জ। এখানেও একই ঘটনা। বিপরীত ধর্মী চার্জের কারণে তৈরি হয় বিভব পার্থক্য। পর্যাপ্ত বিভব পার্থক্যের কারণে ঘটে তীব্র তড়িৎ প্রবাহ। এবারে বিভব পার্থক্যের একটা প্রান্ত যেহেতু মাটিতে, তাই বজ্রপাতের মাটি পর্যন্ত আসতে অসুবিধা নেই। মূলত এ ধরনের বজ্রপাতের কারণেই ঘটে প্রাণহানি।

বজ্রপাতের সময় আলো ও শব্দ হওয়ার কারণ

বজ্রপাতের সময় আমরা যে আলো দেখতে পাই তা মূলত এই সরু চ্যানেলের আয়নিত পরমাণু থেকে বিকীর্ণ শক্তির তীব্র আলোক ছটা। এই সরু, আয়নিত ও বিদ্যুৎ পরিবাহী চ্যানেল তৈরীর সময় বায়ুর তাপমাত্রা প্রায় ২৭০০০° c এবং চাপ প্রায় ১০-১০০ গুন পর্যন্ত বেড়ে যায়। কিন্তু এই পুরো ঘটনাটি ঘটে এক সেকেন্ডের কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ে। এ পরিবর্তন আশপাশের বাতাসকে প্রচন্ড গতিতে বিস্ফোরণের মতো সম্প্রসারিত করে। এর ফলে প্রবল শব্দ উৎপন্ন হয়। এই শব্দকেই আমরা বজ্রপাতের শব্দ হিসেবে শুনি।

পৃথিবীর সম্মিলিত চার্জ শূন্য (০) হলেও পৃথিবীর পৃষ্ঠে ও কেন্দ্রে ভিন্ন ভিন্ন চার্জ থাকে বলে ধারণা করা হয়। পৃথিবীর কেন্দ্রে তীব্র চাপ ও তাপ থাকে। আমরা জানি, কোনো পদার্থের পরমাণুতে থাকা ইলেকট্রন তাপ গ্রহণ করে নিম্ন শক্তিস্তর থেকে উচ্চ শক্তিস্তরে যায় এবং তাপ অনেক বেশি হলে তা কক্ষপথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে। ফলে পরমাণুটি ধনাত্মক আধানে পরিণত হয়। পৃথিবীর কেন্দ্রে তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকায় অনুরূপ ঘটে। ফলে পৃথিবীর কেন্দ্র ধনাত্মক চার্জ এবং ভূপৃষ্ঠে বা তার সামান্য নিচে থাকা বস্তুর পরমাণু ওই ইলেকট্রন গ্রহণ করে ঋণাত্মক চার্জ এ পরিনত হয়। এই ঋণাত্মক চার্জ এর সাথে ডিসচার্জ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য মেঘের উপরের পৃষ্ঠের ধনাত্মক চার্জ-ই ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে।

বজ্রপাতের শক্তি

ভূমি থেকে ৩ মাইল দূরত্বের বজ্রপাত ১ বিলিয়ন থেকে ১০ বিলিয়ন জুল শক্তি উৎপন্ন করে। বৈদ্যুতিক শক্তি পরিমাপক একক ‘কিলোওয়াট/ আওয়ার’। এ হিসেবে এ শক্তি ২৭,৮৪০ কিলোওয়াট/আওয়ার।

বাংলাদেশে একটি পরিবার গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১০০-১৫০ ইউনিট (কিলোওয়াট-আওয়ার) বিদ্যুৎ ব্যাবহার করে। তার মানে একটি বজ্রপাতের বিদ্যুৎ শক্তি জমা করতে পারলে একটি পরিবার ১৮৫ মাস বা, প্রায় ১৫ বছর বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ ব্যাবহার করতে পারবেন।

চাইলে আপনিও বজ্রপাতকে ট্র্যাপে ফেলে বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ ব্যাবহারের সুযোগ লুফে নিতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে বজ্রপাত ঘায়েল করতে আপনি সময় পাবেন এক সেকেন্ডেরও কম। কারণ, বজ্রপাতের পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে। তবে বসে নেই বিজ্ঞানীরা। বজ্রপাত থেকে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ তড়িৎ শক্তিকে ধারণ করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের বিষয়ে বিজ্ঞানীরা উৎসাহী হয়ে উঠেছেন এবং তা বাস্তবায়িত করে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আমাদের দেশে বজ্রপাতের শিকার মানুষদের বড় অংশ কৃষক, যারা সবার মুখে অন্ন তুলে দিতে মাঠে যান। আর সেখানেই মরে পড়ে থাকেন। অথচ বিশেষজ্ঞরা সব সময়ই বলে আসছে- এসময় ঝড়-বৃষ্টিতে ঘরে থাকার বিকল্প নেই। আমাদের দেশের সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

বাংলাদেশে বজ্রপাত নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের মতে, বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান। বাংলাদেশের একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর আর্দ্র বাতাস আসছে। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা, কিছু দূরেই হিমালয় রয়েছে, যেখান থেকে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। এই দুই বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

বাংলাদেশের আকাশে বজ্রপাতের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ কী?

গত এক দশকে বজ্রপতে দেশে ২ হাজার ৯০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।এছাড়া গত তিনমাসে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১০০ জনের। ২০১৪ সালে ১৭০ জন, ২০১৫ সালে ২২৬, ২০১৬ সালে ৩৯১, ২০১৭ সালে ৩০৭, ২০১৮ সালে ৩৫৯, ২০১৯ সালে ১৯৮, ২০২০ সালে ২৫৫, ২০২১ সালে ৩১৪, ২০২২ সালে ৩৪৬ এবং ২০২৩ সালে ৩৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বজ্রের অপঘাতে।বজ্রপাতে মৃত্যুর এ সংখ্যা এসময়ের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘটে যাওয়া এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। এছাড়া বজ্রপাতে আহত হয়ে বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের পক্ষাঘাত, দুর্বলতা, মাথাঘোরা, স্মৃতিশক্তি এবং যৌনশক্তি হ্রাসের মতো উপসর্গ নিয়ে বাঁচতে হয়।আর স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিবাহিত হলেও বাংলাদেশে বজ্রপাতের সংখ্যা নিরূপণ করা বা গতিপ্রকৃতি বোঝার কোনো যন্ত্র নেই। তবে ফিনল্যান্ডের ভাইসেলা ইনকরপোরেশন তাদের ‘জিএলডি ৩৬০’ স্যাটেলাইট থেকে গ্লোবাল লাইটিং সিস্টেম অনুসরণ করে সারাবিশ্বের বজ্রপাতের পরিমাপ করে।

তাদের গত ছয় বছরের তথ্য অনুসারে, প্রতি বছর বাংলাদেশের আকাশসীমায় গড়ে ৭ লাখ ৮৬ হাজার বজ্রপাত হচ্ছে। এরমধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ বা দুই লাখের বেশি বজ্রপাত আকাশ থেকে মাটিতে পতিত হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বরিশাল, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি। এছাড়া শরীয়তপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী ও কুমিল্লায় বজ্রপাতে মৃত্যু বেড়েছে।

বাংলাদেশের ওপর বজ্রপাতের ঘটনাগুলোর সাময়িক পরিবর্তন

বাংলাদেশে মোট বজ্রপাতের ৭০ শতাংশই হয় এপ্রিল, মে ও জুন মাসে। মৌসুমি বায়ু দেশের আকাশে আসার আগের দুই মাস এপ্রিল ও মে মাসে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে এর প্রকোপ থাকে বেশি। বর্ষায় তীব্রতা বাড়ে সুনামগঞ্জ, রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রামে। শীতে বেশি আক্রান্ত হয় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট।

বজ্রপাতের সময় করণীয়

_ বজ্রপাত একটি কমিউনিটি স্বাস্থ্য সমস্যা। বজ্রপাতে শরীরে বৈদ্যুতিক শক হয়। এতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় হার্ট এবং ব্রেইন। অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং অনেকেই অবশ হয়ে যেতে পারে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ হয়ে যেতে পারে প্যারালাইজড। যারা মারা যান, তার চেয়ে কয়েকগুণ জটিলতায় ভোগেনে বেঁচে যাওয়ারা।

_ কেউ যখন বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে, তাকে বাঁচানোর জন্য প্রাথমিক কিছু বিষয় করা যেতে পারে। যদি শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, তাকে সিপিআর চালিয়ে রাখতে হবে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

_ বজ্রপাত প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় কী করা যাবে আর যাবে না তা গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে-ঘাটে, নদীতে-পানিতে, বাইরে যারা কাজ করেন, বিশেষ করে যারা গ্রামে কৃষিকাজ করেন, তারা বজ্রপাতে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে হবে।

_ যারা বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং বেঁচে গেছেন, তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন- বিদ্যুৎ স্পর্শ দেখেছেন, কিন্তু শব্দ শুনেননি। এছাড়াও তাদের কানে শুনতে সমস্যা হয়; পর্দা ফেটে যেতে পারে।

_ বজ্রপাতে অনেকেরই বধির হয়ে যাওয়াসহ চোখের সমস্যা হতে পারে। ব্রেনে রক্তক্ষরণ হতে পারে। হাড় ভেঙে যেতে পারে। মাথার তালু ভেঙে যেতে। মাংসপেশি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে তাদের কিডনি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

বজ্রপাতের সময় সতর্কতা

১। বজ্রপাতের সময় সবচেয়ে নিরাপদ হল কোন দালান বা পাকা ভবনের নিচে আশ্রয় নেওয়া। ঘন ঘন বজ্রপাতের সময় কোনভাবেই ঘর থেকে বাইরে যাওয়া উচিত নয়।

২। বজ্রপাতের সময় কখনোই বাইরে বা খোলা জায়গায় থাকা উচিত নয়। খোলা ও উঁচু জায়গায় বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই এমন অবস্থা দেখা দিলে খোলা বা উঁচু স্থান থেকে সরে আসুন এবং নিরাপদ কোন স্থানে আশ্রয় নিন।

৩। বজ্রপাতের সময় আমরা অনেকেই গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া কে বেশি নিরাপদ ভেবে থাকি এবং আমরা এ পতিস্থিতিকে নিরাপদ ভেবে থাকি যা কিনা মোটেও সঠিক নয়। নিরাপদ থাকতে হলে সবসময় বিদ্যুৎ লাইন ও উঁচু গাছপালা থেকে দূরে থাকা উচিত। এসব জায়গায় বজ্রপাতের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। বিশেষ করে বড় কোন খোলা জায়গায় গাছ থাকলে সেখানে বজ্রপাতের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে । তাই এসব স্থানে আশ্রয় নেওয়া একদমই উচিত নয়।

৪। গাড়ির ভেতরে থাকা অবস্থায় বজ্র ঝড় শুরু হলে বাইরে বের হওয়া উচিত নয়। কারণ গাড়ির চাকায় ব্যাবহৃত টায়ার বিদ্যুৎ অপিরিবাহি অর্থাৎ বিদ্যুৎ পরিবহন করে না। এটি গাড়িকে ভূমি থেকে আলাদা করে রাখে। এতে করে বজ্রপাতের সময় গাড়ির মধ্য দিয়ে ভূমিতে আধান প্রবাহের কোন পথ তৈরি হয় না। তবে নিকটে যদি কোন কংক্রিটের ছাউনি থাকে তাহলে গাড়িতে না থেকে সেখানে আশ্রয় নেওয়াই ভাল। ঘন ঘন বজ্রপাতের সময় গাড়িতে না থাকাই ভাল। তবে মোটেও টিন বা লোহার কোন ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। আর খেয়াল রাখবেন গাড়ি থেকে নেমে ঐ স্থানে যেতে যেন আপনাকে পাঁচ কদমের বেশি ফেলতে না হয়। আপনাকে যদি গাড়িতেই থাকতে হয় তাহলে বেশ কিছু সতর্কতা মেনে চলা উচিত। পায়ে জুতা খুলে রাখলে দ্রুত জুতা পড়ে নিতে হবে। বেশি ভাল হয় পা সিটের উপর তুলে বসলে। খেয়াল রাখবেন কোন ভাবেই যেন শরিল গাড়ীর বডি বা ধাতব কোন কিছু স্পর্শ না করে থাকে। মনের ভুলেও গাড়ির কাচে হাত দেবেন না।

৫। ঘরে থাকলে কখনোই জানালার আছে থাকবেন না। ভাল করে জানালা বন্ধ রাখুন এবং জানালা থেকে যথেষ্ট দূরে থাকুন।

৬। বজ্রপাতের সময় ঘরে থাকলে আরও কিছু জরুরী বিষয়ে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। কোথাও কোন ধাতব বস্তু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় সিঁড়ির রেলিং, বাড়ির ধাতব কল, ধাতব পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। টিভি কেবল, ল্যান্ড লাইন টেলিফোন ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না। বজ্রপাতের সময় এগুলো স্পর্শ করা থেকে আহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

৭। বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রপাতি সম্পর্কে আমাদের বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। এসব যন্ত্রপাতিকে বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগ-বিহীন করে রাখাই ভাল। ঝড় ও বজ্রপাতের শঙ্কা দেখা দিলে এসব যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে দিন। ফ্রিজ, টিভি, কম্পিউটার সহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া অবস্থায় থাকলে বজ্রপাতে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে এবং এ থেকে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ করা থাকলেও হাত দিয়ে ধরবেন না।

৮। বজ্রপাতের সময় আমরা অনেকেই ভয় পেয়ে কানে আঙুল দিয়ে চেপে ধরি। এটি কিন্তু বেশ ভাল একটি অভ্যাস। বজ্রপাতের প্রচণ্ড শব্দ আপনার শ্রবণ শক্তি নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। কাজেই ব্যাপারটি অনেকের কাছে উদ্ভট ঠেকলেও আপনাকে সুরক্ষা দেবে।

৯। বজ্রপাতের সময় পানি থেকে সর্বদা দূরে থাকুন। পানি খুব ভালো বিদ্যুৎ পরিবাহী হওয়ায় বজ্রপাতের সময় পানিতে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। বজ্রপাতের সময় আপনি যদি ছোট কোন পুকুরে সাঁতার কাটেন বা জলাবদ্ধ স্থানে থাকেন তাহলে সেখান থেকে উঠে আসুন।

১০। যে স্থানে আপনিই উঁচু এমন কোন স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেবেন না। বজ্রপাতের সময় কোন খোলা জায়গা যেমন ধানক্ষেত বা বড় মাঠে থাকলে তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে বসে পড়ুন। বাড়িতে কোন উঁচু স্থান যেমন বাড়ির ছা্দে থাকলে দ্রুত সেখান থেকে নেমে যান।

১১। যদি নিরুপায় হয়ে কোন খোলা জায়গায় থাকতে হয় তাহলে নিচু হয়ে বসে পড়ুন। তবে মনের ভুলেও শুয়ে পড়বেন না। যদি কয়েকজন থাকেন তাহলে পরস্পর দূরে থাকুন এবং প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে সরে যান। কখনোই সবাই একসাথে জড়ো হয়ে থাকবেন না।

১২। অনেকসময় বজ্রপাতের পূর্বে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়।বিদ্যুতের প্রভাবে আপনার চুল খাড়া হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও ত্বক শিরশির করা বা বিদ্যুৎ অনুভূত করার মত ঘটনা ঘটতে পারে। আবার অনেকসময় আশপাশে থাকা কোন ধাতব পদার্থ কাঁপতে পারে। এমন পরিস্থিতি বা কোন প্রকার লক্ষণ পেলে সাবধান হয়ে যেতে হবে। মনে রাখবেন, এমন লক্ষণ প্রকাশ পেলে বুঝে নিয়ে হবে আপনার সন্নিকটেই বজ্রপাত হবে। দ্রুত সতর্ক হোন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিরাপদ স্থানে চলে যান।

১৩। গ্রামে অনেকেরই কাঁচা ঘর থাকে। এরকম ঘরে থাকার সময় সরাসরি মাটির উপর না থেকে বিছানার উপর উঠে বসে থাকুন। কোন কারণে যদি মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাহলে রাবারের জুতা পড়ুন। চামড়ার জুতা পড়ে বা খালি পায়ে থাকলে বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকে। এ সময় বিদ্যুৎ অপরিবাহী রাবারের জুতা সবচেয়ে নিরাপদ।

১৪। বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা পেতে আপনার বাড়িকে সুরক্ষিত করুন। এজন্য বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়ার সময় আর্থিং সংযুক্ত রড বাড়িতে স্থাপন করতে হবে। দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ নিয়ে সঠিকভাবে আর্থিং সংযোগ দিতে হবে। ভুলপদ্ধতি অবলম্বন বজ্রপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

১৫। বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যাক্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মারা যান। তবে কেউ কেউ আহত হয়েও থাকেন। কেউ আহত হলে বৈদ্যুতিক শকে আহতদের মতো করেই চিকিৎসা করতে হবে। তবে সবচেয়ে ভাল হয় দ্রুত চিকিৎসক ডেকে চিকিৎসা করালে। প্রয়োজন হলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। বজ্রাহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন আছে কি না তৎক্ষণাৎ পরিক্ষা করতে হবে এবং না থাকলে আনার জন্য প্রয়োজনীয় চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমাতে সরকারের পাশাপাশি সচেতন হতে হবে জনগণকেও। ঝড়-বৃষ্টির সময় বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি বজ্রপাত প্রতিরোধের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে। আর বেশি করে তালগাছসহ বিভিন্ন গাছপালা লাগাতে হবে। তাহলে অনেকাংশে কমে আসবে বজ্রপাতে মৃত্যু।

লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

পাঠকের মতামত:

১৭ জুন ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test