E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

গণমাধ্যমে লেখালেখি: পেশাগত নীতি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০৩ ১৮:০৪:১৯
গণমাধ্যমে লেখালেখি: পেশাগত নীতি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ

ড. মাহরুফ চৌধুরী


একটি দেশের গণমাধ্যম কেবল সংবাদ পরিবেশনের একটি যান্ত্রিক মাধ্যম নয়; এটি সমাজের দর্পণ, রাষ্ট্রচিন্তার বাহক এবং নাগরিক চেতনা ও মূল্যবোধ নির্মাণের এক অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই কারণেই গণমাধ্যমকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ‘তৃতীয় স্তম্ভ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যে স্তম্ভ রাষ্ট্রের নির্বাহী ও আইন প্রণয়নকারী ক্ষমতার পাশাপাশি নিরপেক্ষ সত্তা হিসেবে জনস্বার্থ রক্ষা এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে গণমাধ্যম জনমত গঠন, সত্য উন্মোচন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভূমিকা পালন করেছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা যেমন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বর্তমান সময়েও তা প্রশ্নাতীত। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক পেশাজীবীর, বিশেষ করে সাংবাদিক, সম্পাদক, কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে কলাম লেখক পর্যন্ত সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও সৌজন্যবোধ চর্চা করা একটি নৈতিক দায়। কারণ গণমাধ্যমে ব্যক্তিগত আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি সরাসরি প্রভাব ফেলে জনচিন্তা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক মূল্যবোধের ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের বাস্তবতায় এই পেশাগত চরিত্র ও নৈতিক চর্চা এখনো ব্যতিক্রম, নিয়মনীতি হয়ে ওঠেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণমাধ্যম একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার বদলে ক্ষমতা, সুবিধা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঘেরাটোপে আবদ্ধ এক অপরিণত পেশার জগতে পরিণত হয়েছে।

এখানে কোনো ব্যক্তিবিশেষকে অভিযুক্ত করা, আক্রমণ করা কিংবা খাটো করার উদ্দেশ্য নেই। বরং সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণে গণমাধ্যমের যে নিরন্তর ও অপরিহার্য ভূমিকা, সেই ভূমিকাকে গভীরভাবে স্বীকার করেই কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতার প্রশ্নগুলো সামনে আনার একটি আন্তরিক প্রয়াস মাত্র। সমালোচনার লক্ষ্য এখানে ব্যক্তি নয়, বরং কাঠামো, সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ যেগুলো শক্তিশালী না হলে গণমাধ্যম তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে না ও জনমনে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। লেখক হিসেবে নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য লেখকদের কাছ থেকে শোনা তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই নিবন্ধে গণমাধ্যমে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত কিছু মৌলিক সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এসব সমস্যা একদিকে লেখকদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে লেখালেখির পরিবেশ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত মান আরও সুসংহত ও বলিষ্ঠ করার প্রয়োজনীয়তার কথাই এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকীয় পর্ষদে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশে এই লেখার মূল আবেদন। পত্রপত্রিকার পক্ষ থেকে লেখকদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন, পেশাগত সৌজন্য বজায় রাখা এবং দায়িত্বশীল আচরণের গুরুত্ব নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেওয়া। কারণ সম্পাদকীয় সংস্কৃতিই নির্ধারণ করে একটি সংবাদমাধ্যম কতটা নৈতিক, কতটা মানবিক এবং কতটা গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী।

প্রথমত, লেখকদের সঙ্গে সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষের সৌজন্যবোধ ও পেশাগত শিষ্টাচারের ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়। একজন লেখক যখন কোনো সংবাদপত্রে লেখা পাঠান বা ই-মেইলের মাধ্যমে সম্পাদকীয় দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন সেই লেখার প্রাপ্তি স্বীকার করা ন্যূনতম পেশাগত দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। এটি কোনো অতিরিক্ত সৌজন্য নয়, বরং আধুনিক পেশাগত যোগাযোগের একটি স্বীকৃত নীতি। সাধারণত প্রতিটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান প্রাপ্তির দিন কর্মদিবসের মধ্যে সেই চিঠি বা ইমেইলের উত্তর প্রদান করে থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা এই সাধারণ শিষ্টাচারটুকুও নিয়মিতভাবে অনুসরণ করেন না। একজন লেখকের ন্যায্য প্রত্যাশা থাকে তার লেখা গ্রহণ করা হয়েছে কি না, সেটি প্রকাশযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে কি না, কিংবা আদৌ তা পড়া হয়েছে কি না- এই ন্যূনতম তথ্য জানার। যদি লেখা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে আনুমানিক কবে নাগাদ তা প্রকাশিত হতে পারে, সেই ধারণা দেওয়া পেশাগত স্বচ্ছতারই অংশ। আবার লেখা প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট অনলাইন লিংক কিংবা ই-পেপারের কপি লেখককে পাঠানো কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়; এটি পেশাগত সৌজন্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের স্বাভাবিক পরিধির মধ্যেই পড়ে। একইভাবে, কোনো পত্রিকার ই-ভার্সন যদি সাবস্ক্রিপশন ছাড়া পাঠযোগ্য না হয়, সেক্ষেত্রে লেখককে একটি কপি সরবরাহ করা অনুগ্রহ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ লেখক এখানে বাইরের কেউ নন; তার শ্রম, চিন্তা ও মেধার মাধ্যমেই পত্রিকার কনটেন্ট সমৃদ্ধ হয়। যোগাযোগ-মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এমন ন্যূনতম স্বীকৃতির অভাব লেখক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

দ্বিতীয়ত, লেখকের লেখায় সম্পাদনার নামে অতিরিক্ত বা অযাচিত হস্তক্ষেপ একটি গুরুতর নৈতিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়। গণমাধ্যমের নীতিমালার অংশ হিসেবে বানান, শব্দচয়ন কিংবা বাক্যগঠনের ত্রুটি সংশোধন করা সম্পাদকীয় দায়দায়িত্বের স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অংশ এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বরং এই ধরনের সম্পাদনাই একটি পত্রিকার পেশাগত মানের উৎকর্ষ সাধন এবং তাকে দৃশ্যমান করে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এসব সীমার বাইরে গিয়ে লেখার অংশ বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেটেছেটে ফেলা তথা বক্তব্য, কাঠামো বা অন্তর্নিহিত অর্থে প্রভাব পড়ে এমন কোনো পরিবর্তন, সংকোচন কিংবা সংযোজন করা হয়, অথচ তা প্রকাশের আগে লেখককে অবহিত করা হয় না। এটা সম্পূর্ণ পেশাগত নীতির পরিপন্থী, অনৈতিক, বেআইনি ও লেখকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং পত্রিকা কর্তৃপক্ষের স্বৈরাচারী মনোবৃত্তির বহির্প্রকাশ। মনে রাখা জরুরি, একটি লেখা কেবল কিছু শব্দ বা বাক্যের যান্ত্রিক সমষ্টি নয়; এটি লেখকের চিন্তা, শ্রম, মেধা, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে লেখার বিষয়বস্তু, দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনের নৈতিক ও আইনি দায়ভারও বহন করেন লেখক নিজেই। সে কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন ও নীতিমালায় লেখকের এই অধিকারকে কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কোনো লেখায় লেখকের সম্মতি ছাড়া মৌলিক পরিবর্তন আনা শুধু অনৈতিকই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা বিদ্যমান আইনি কাঠামোরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অতএব, লেখকের অনুমতি বা অন্তত অবহিতকরণ ছাড়া লেখার বক্তব্যগত পরিবর্তন করা মানে ব্যক্তিগত লেখককে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে পেশাগত নীতিনৈতিকতা, সম্পাদকীয় স্বচ্ছতা এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই খাটো করা। একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমে সম্পাদক ও লেখকের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহযোগিতামূলক ও সম্মাননির্ভর যেখানে সম্পাদনা হবে মানোন্নয়নের উপায়, কর্তৃত্ব আরোপের অস্ত্র নয়। কোন লেখা না ছাপার অধিকার পত্রিকা কর্তৃপক্ষের অবশ্যই থাকবে, কিন্তু লেখকের কোন লেখাকে অনুমতি বা সম্মতি ছাড়া নিজেদের ইচ্ছে মত পরিবর্তন করে প্রকাশ করার অধিকার কোন সংবাদপত্রের নেই।

তৃতীয়ত, লেখকের সম্মানী বা পারিশ্রমিক প্রদানের প্রশ্নটি এখনও আমাদের দেশের গণমাধ্যম জগতে এক ধরনের উপেক্ষিত ও অনানুষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, বহু গণমাধ্যম মালিকের বিরুদ্ধেই নিয়মিতভাবে সময়মতো বেতন-ভাতা পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে যা আমাদের সংবাদপত্র জগতের একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। তা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিক, সম্পাদক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁদের শ্রম, সময় ও মেধার বিনিময়ে পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। এই স্বীকৃত বাস্তবতার আলোকে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে যে লেখকেরা সেই পত্রিকার জন্য নিয়মিতভাবে লেখা পাঠান, কনটেন্ট সমৃদ্ধ করেন এবং পাঠক তৈরিতে ভূমিকা রাখেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই নীতির ব্যতিক্রম কেন ঘটবে? লেখালেখি কোনো শখের কাজ মাত্র নয়; এটি সময়, শ্রম, মনন ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি পেশাগত কর্মকাণ্ড। এর জন্য প্রচুর সময়, শ্রম ও মেধা ব্যয় করতে হয়। সুতরাং লেখকের পারিশ্রমিক প্রদান বা সময়মতো তা পরিশোধ করা কোনো দয়া বা সদিচ্ছার বিষয় নয়; এটি একটি স্পষ্ট নৈতিক ও পেশাগত দায়। লেখক তাঁর কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়া সেটা তাঁর অধিকার। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বিনা পারিশ্রমিকে বা বিলম্বিত পারিশ্রমিকে শ্রম গ্রহণ করা একধরনের কাঠামোগত বৈষম্যকেই স্বাভাবিক করে তোলে।

এখানে দর্শনের এক সর্বজনস্বীকৃত নৈতিক নীতির কথা স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক ‘সোনালী নীতি’ (গোল্ডেন রোল) আমি অন্যের কাছ থেকে যে আচরণ প্রত্যাশা করি, আমি নিজে কি সেই আচরণই অন্যের প্রতি করছি? একজন পেশাজীবী হিসেবে এই প্রশ্নটি প্রতিদিন নিজেকে করা সাংবাদিক ও সম্পাদকদের নৈতিক দায়িত্ব। স্বৈরাচারমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ কায়েম করতে হলে পেশাজীবীদেরও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। নিজেরা বৈষম্যমূলক ও স্বৈরাচারী আচরণ করে অন্যের কাছ থেকে ন্যায্য ও অস্বৈরাচারী আচরণ আপনি কিভাবে আশা করেন? কারণ গণমাধ্যমে নৈতিকতা কেবল প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়; তা প্রতিফলিত হয় পেশাগত আচরণ, শ্রমের মূল্যায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বোধের মধ্য দিয়েও। এ লেখায় তুলে ধরা কথাগুলো হয়ত অনেকেরই পছন্দ হবে না এবং লেখাটিও হয়ত প্রকাশিত হবে না। কিন্তু যারা অন্তত পড়বেন, তাদের যদি বোধোদয় হয়, তবে সেটাই হবে এ লেখায় সময়, শ্রম ও মেধা ব্যয়ের স্বার্থকতা।

মূলত, আমরা যে সমাজ কল্পনা করি এবং যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি, সেই মূল্যবোধ যদি আমাদের নিজ নিজ আচার-আচরণ, পেশাগত চরিত্র ও নৈতিক চর্চার ভেতরে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা অন্যের কাছে কিংবা বৃহত্তর সমাজের কাছে প্রত্যাশা করাই অবাস্তব। ব্যক্তিগত ও পেশাগত আচরণের সঙ্গে ঘোষিত আদর্শের এই বিচ্ছিন্নতাই রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের অন্যতম মৌলিক সংকট। দর্শনের ভাষায়, নৈতিকতা কেবল বক্তব্য বা ঘোষণায় নয়, বরং দৈনন্দিন অনুশীলনের মধ্য দিয়েই তার সত্যতা প্রমাণিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই ওঠে আপনি যদি একজন সাংবাদিক বা সম্পাদক হিসেবে লেখক, সহকর্মী কিংবা পেশাগত অংশীদারের প্রতি এই ধরনের আচরণ করেন, তবে একজন রাজনীতিবিদ, প্রশাসক বা সাধারণ নাগরিকের কাছ থেকে ভিন্ন আচরণ কীভাবে প্রত্যাশা করা যায়? গণমাধ্যমের পেশাজীবীরা সমাজের কাছে প্রত্যাশিত সমাজের যে নৈতিক মানদণ্ড হাজির করেন, বাস্তবে নিজেরাই যদি সেই মানদণ্ড অনুসরণ না করেন, তবে গণমাধ্যমের নৈতিক কর্তৃত্ব অনিবার্যভাবেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। অতএব, গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক পেশাজীবীর দায়িত্ব কেবল লেখা প্রকাশ বা সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং মানবিক ‘সোনালী নীতি’ তথা ‘আপনি আচরি ধর্ম, অপরে শিখাও’, পেশাগত সৌজন্য ও নৈতিক নীতিমালা মেনে চলার মাধ্যমেই তারা একটি কল্যাণমুখী, ন্যায়ভিত্তিক এবং দায়িত্বশীল সমাজ নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। কারণ গণমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি শব্দে নয়, বরং সেই শব্দের পেছনে থাকা নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতায় নিহিত।

প্রকৃতপক্ষে, আমরা যে সমাজ কল্পনা করি বা যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি, সেই মূল্যবোধ যদি আমাদের নিজেদের আচার-আচরণ, পেশাগত চরিত্র ও নৈতিক চর্চার ভেতরে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা অন্যের কাছে কিংবা বৃহত্তর সমাজের কাছে প্রত্যাশা করাই অবাস্তব। নৈতিকতা কখনোই কেবল দাবি বা উপদেশের বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের অনুশীলনের মধ্য দিয়েই অর্থবহ হয়ে ওঠে। তাই প্রতিটি পেশাজীবীর বিশেষ করে গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্তদের মানবিক ‘সোনালি নীতি’র পাশাপাশি নিজ নিজ পেশাগত নীতিনৈতিকতা আন্তরিকভাবে অনুসরণ করা অপরিহার্য। একটি কাঙ্ক্ষিত কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণ কোনো একক গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়; এটি সম্মিলিত নৈতিক অনুশীলনের ফল। সেই অনুশীলনের সূচনা হওয়া উচিত নিজের জায়গা থেকে। নিজ নিজ দায়িত্বের ক্ষেত্রে যদি আমরা পেশাদারিত্ব, সৌজন্য ও নৈতিকতার চর্চা নিশ্চিত করতে পারি, তবেই আমাদের গণমাধ্যমগুলো সত্যিকার অর্থে সমাজ ও রাষ্ট্রের অব্যাহত নির্মাণের অগ্রদূত হিসেবে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম হবে।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

পাঠকের মতামত:

১৬ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test