পারিবারিক বন্ধনই হলো আধুনিক সুসভ্য সমাজের মূলভিত্তি
ওয়াজেদুর রহমান কনক
মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো সেই আদিমতম প্রতিষ্ঠান, যা ব্যক্তিকে প্রথম পরিচয়ের সূত্র দেয় এবং সামষ্টিক জীবনের পাঠ শেখায়। এটি কেবল একটি জৈবিক বা আইনি কাঠামো নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ত্যাগ ও সহমর্মিতার এক অনন্য পাঠশালা। সমসাময়িক বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ ও প্রযুক্তিনির্ভর বিচ্ছিন্নতার যুগে এই মৌলিক এককটির গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যক্তির মানসিক প্রশান্তি ও নৈতিক ভিত্তি গঠনে এর কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্র ও সমাজের টেকসই উন্নয়নের জন্য এই নিবিড় বন্ধনটিকে টিকিয়ে রাখা এবং এর অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধের চর্চা অব্যাহত রাখা বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান অপরিহার্যতা।
পারিবারিক কাঠামো কেবল মানব সভ্যতার আদিমতম ভিত্তি নয়, বরং এটি সমসাময়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বজনীন সামাজিক সংহতির প্রধান একক হিসেবে কাজ করে। পনেরো মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে পরিবারের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবর্তনের সাথে সাথে এই মৌলিক কাঠামোর যে বিবর্তন ঘটছে, তার স্বরূপ বিশ্লেষণ করা।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পরিবার হলো একটি জৈবনিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যা ব্যক্তির পরিচয় গঠন এবং সামাজিকীকরণের প্রাথমিক পাঠশালা হিসেবে কাজ করে। আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে পরিবারের সংজ্ঞায়ন ও কার্যাবলিতে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে, তা গবেষণার একটি অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রসারে একান্নবর্তী পরিবারের ক্ষয়িষ্ণু রূপ এবং অণু-পরিবারের আধিপত্য সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাধারায় নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। যেখানে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সমাজে পরিবার ছিল অর্থনৈতিক উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে বর্তমানের শিল্পোন্নত সমাজে পরিবার মূলত একটি আবেগীয় ও মনস্তাত্ত্বিক আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। এই রূপান্তর কেবল কাঠামোগত নয়, বরং এটি মানুষের নৈতিক ও মূল্যবোধের স্তরেও বিশাল প্রভাব ফেলেছে।
একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পরিবারই প্রথম ব্যক্তিমানুষকে নাগরিকত্বের শিক্ষা দেয় এবং সহমর্মিতা, ত্যাগ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বীজ রোপণ করে। আন্তর্জাতিক পরিবার দিবসের প্রেক্ষাপটে যখন আমরা এর গুরুত্ব আলোচনা করি, তখন দেখা যায় যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পরিবারের ভূমিকা অপরিহার্য। বিশেষ করে শিশুদের মানসিক বিকাশ, শিক্ষা ও পুষ্টির নিশ্চয়তা প্রদানে পরিবারের বিকল্প কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনও বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেনি। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং ডিজিটাল বিপ্লবের এই কালে পরিবারগুলো এক নতুন ধরনের বিচ্ছিন্নতার সম্মুখীন হচ্ছে। একই ছাদের নিচে বাস করেও ভার্চুয়াল জগতের প্রভাবে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা ও একাকিত্বের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই সংকটের সমাধানকল্পে পরিবার দিবসের চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে মানবিক বন্ধনের সমন্বয় ঘটানো কতটা জরুরি।
সামাজিক পুঁজি বা সোশ্যাল ক্যাপিটাল বিনির্মাণে পরিবারের অবদান গবেষণার একটি সমৃদ্ধ এলাকা। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিদ্যমান আস্থা ও সহযোগিতা যখন বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই একটি রাষ্ট্র স্থিতিশীলতা অর্জন করে। কিন্তু বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বর্তমানে বহু পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত পরিবার কিংবা কর্মসংস্থানের তাগিদে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দম্পতিদের জীবনপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, পারিবারিক স্থিতিশীলতা সরাসরি বৈশ্বিক রাজনীতির সাথে যুক্ত। আন্তর্জাতিক এই দিবসটি নীতি-নির্ধারকদের এই বার্তা দেয় যে, রাষ্ট্রীয় বাজেটে পরিবারবান্ধব নীতি গ্রহণ করা কেবল একটি সামাজিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম কৌশল। কর্মজীবী পিতামাতার জন্য চাইল্ড কেয়ার সুবিধা, নমনীয় কর্মঘণ্টা এবং পারিবারিক স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে তা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের সামাজিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে।
পরিবার কেবল রক্ত সম্পর্কীয় বন্ধন নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক সংহতির আধার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐতিহ্য, ভাষা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা প্রধান। বর্তমানের বহুমুখী ও বহুবর্ণিল সমাজে পরিবারের গঠনতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। একক অভিভাবকত্বের পরিবার কিংবা পুনর্গঠিত পরিবারগুলোও সমাজের মূলস্রোতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করছে। এই বৈচিত্র্যকে মেনে নিয়ে প্রতিটি পরিবারের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করাই আধুনিক সভ্যতার লক্ষ্য হওয়া উচিত। জ্ঞানের গভীর স্তরে গিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, পরিবারের অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের প্রকৃত ভিত্তি রচিত হয়। নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম-অংশীদারিত্ব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী টেকসই সমতা অর্জন অসম্ভব।
পরিশেষে বলা যায় যে, আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং এটি মানব সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়নের একটি মাধ্যম। পরিবারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধতা কেবল ব্যক্তিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি বিশ্বজনীন দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। বর্তমানের জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে মানুষের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল হলো তার পরিবার। এই প্রতিষ্ঠানের সুস্থতা ও স্থায়িত্বের ওপরই নির্ভর করছে আগামীর পৃথিবীর মানবিকতা ও নৈতিক ভারসাম্য।
সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে পরিবারের বর্তমান সংকটগুলো চিহ্নিত করা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে সেগুলোর সমাধান খোঁজা এখন সময়ের দাবি। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে এবং ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে মানুষের অস্তিত্বের শিকড়কে টিকিয়ে রাখতে পরিবারের গুরুত্ব অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য। পরিবারের বন্ধন যত মজবুত হবে, বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলা করার সক্ষমতা মানবজাতির ততটাই বৃদ্ধি পাবে। তাই আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, উন্নত ও সমৃদ্ধ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে হলে সবার আগে প্রতিটি পরিবারের নিরাপত্তা, শান্তি ও সংহতি নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
পাঠকের মতামত:
- হবুচন্দ্রের আইন
- নেমন্তন্ন
- সুস্থ থাকতে লিফট নয়, ভরসা হোক সিঁড়ি
- সরানো হলো ওবায়দুরকে, নতুন শিল্প সচিব আব্দুন নাসের
- সাতক্ষীরায় শিক্ষার্থীর শ্লীলতাহানির অভিযোগে শিক্ষককে পিটিয়ে জখম
- রাশিয়ায় এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রস্তাব
- ‘উচ্ছৃঙ্খল কথাবার্তা বলে রাজনীতিতে টেকা যায় না’
- গোপালগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১
- গোপালগঞ্জে ইয়াবা ও বিদেশী মদসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার
- সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় হাইকোর্টের রায় স্থগিত
- বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হচ্ছেন সৈয়দ আব্দুল হাদী
- ‘দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণ বিজয় ঘোষণা করবে যুক্তরাষ্ট্র’
- রোমাঞ্চ সঙ্গী করে জয়ের খোঁজে বাংলাদেশ
- এসএমই উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক
- প্রতিরক্ষা খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা আরও বেগবান হবে, আশা বাংলাদেশের
- ‘শর্ত মানলে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন আ’লীগের নেতাকর্মীরা’
- টাঙ্গাইলে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষ, নিহত ৪
- যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য ভারতকে অতিরিক্ত দেড়কোটি ডলার সাহায্য দেয়
- ফরিদপুর আঞ্চলিক বিএসটিআই-এর উদ্যোগে মোবাইল কোর্টে জরিমানা, মামলা
- সাংবাদিক জীতেন বড়ুয়ার মুক্তি ও নিরাপত্তার দাবিতে রাঙ্গামাটিতে গণমাধ্যমকর্মীদের মানববন্ধন
- বগুড়ার আবাসিক হোটেল থেকে সাবেক ইউপি সদস্যের লাশ উদ্ধার
- আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে ভাঙ্গাবাসীর প্রতি ওসির আহ্বান
- দীপেন দেওয়ানকে পুনরায় মন্ত্রী করার দাবিতে রাঙ্গামাটিতে মানববন্ধন স্মারকলিপি
- বিশ্বকাপের উন্মাদনায় জমজমাট পতাকা তৈরির ব্যবসা
- কাপাসিয়ায় বইতে শুরু করেছে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনী হাওয়া
- শ্রীমঙ্গল পৌর যুবদলের পক্ষ থেকে বৃক্ষরোপন কর্মসূচি ও আলোচনা সভা
- শৈলকুপার কানাই-বলাই গ্রুপের লিডার গ্রেফতার, এলাকাবাসীর মিষ্টি বিতরণ
- সেই এমবি অভিযান-১০ লঞ্চটির ঝালকাঠি ত্যাগ
- কুমিল্লায় ট্রেনে কাটা পড়ে তিন যুবকের মৃত্যু
- নবীনগর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান
- ‘ভালো মেয়েদের জন্য রঙিন জীবন না’
- গোপালগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১
- সাবেক মেয়র আইভীর বাড়ির সামনে পুলিশের নজরদারি, সিসি ক্যামেরা স্থাপন
- সাভারে সাংবাদিককে হুমকি ও মারধরের প্রতিবাদে মানববন্ধন
- ঝালকাঠিতে বিচার বিভাগীয় কর্মচারী এসোসিয়েশনের কর্মবিরতি পালন
- সিলেট বিমানবন্দরে ফ্রি ওয়াইফাই-টেলিফোন সেবা চালু
- স্টার সিনেপ্লেক্সে ‘হুমায়ুন আহমেদ সপ্তাহ’
- ১৯ ডিসেম্বর কাশিয়ানী মুক্ত দিবস
- দুর্ঘটনার কবলে জামায়াত নেতাকর্মীদের বহনকারী বাস, নিহত ৩
- ‘দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণ বিজয় ঘোষণা করবে যুক্তরাষ্ট্র’
- চাঁদপুরে ইয়েস কার্ড পেল ৪০ সাঁতারু
- ইউপি সদস্য দয়াল বোনার্জীর অপসারণের দাবিতে খাইছড়া চা বাগানে শ্রমিকদের কর্মবিরতি
- ঢালাও দরপতনে বাজার মূলধন কমলো ১৮০০০ কোটি টাকা
- আগামী রমজানের আগে নির্বাচন চায় জামায়াত
- সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় হাইকোর্টের রায় স্থগিত
-1.gif)







