বিশ্ব মহাসাগর দিবস ও সমুদ্রের টেকসই ব্যবস্থাপনা
ওয়াজেদুর রহমান কনক
পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ জলরাশি নিয়ে গঠিত আমাদের এই নীল গ্রহের প্রাণস্পন্দন মূলত সমুদ্রের লোনা পানির অতল গহ্বর থেকেই উৎসারিত হয়। ৮ জুন, বিশ্ব মহাসাগর দিবস (World Oceans Day) নিছক একটি ক্যালেন্ডারিক তারিখ নয়; এটি আমাদের গ্রহের ফুসফুস ও বিশালকার বাফার জোন হিসেবে সমুদ্রের অপরিহার্যতাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি বৈশ্বিক আহ্বান। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ এবং মানবসভ্যতার অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের চাবিকাঠি যে মহাসাগরগুলোর হাতে নিহিত, তা আজ নানাভাবে সংকটাপন্ন। এই দিবসের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে মহাসাগরের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা পুনর্বিন্যাস এবং টেকসই ব্যবহারের এক নতুন দর্শনের সন্ধানে।
জলবায়ু বিজ্ঞানের ভাষায়, মহাসাগরগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় 'কার্বন সিঙ্ক' হিসেবে কাজ করে। বায়ুমণ্ডলে নির্গত অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় ২৫ শতাংশ সমুদ্র শোষণ করে নেয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের তীব্রতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু এই অতি-শোষণের ফলে সমুদ্রের পানি ক্রমাগত অম্লীয় (Ocean Acidification) হয়ে উঠছে, যা প্রবাল প্রাচীর (Coral Reefs) ও ক্যালসিয়াম কার্বনেট নির্ভর সামুদ্রিক প্রাণীদের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্যানেল (IPCC)-এর তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যা উপকূলীয় নিম্নভূমি এবং বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলের অস্তিত্বকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে। মহাসাগর কেবল পানি নয়, এটি এমন এক জটিল থার্মোডাইনামিক সিস্টেম যা মেরু অঞ্চলের বরফ গলা এবং বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষা করে।
মহাসাগর মানবজাতির জন্য প্রোটিনের প্রধান উৎস। বিশ্বব্যাপী বিলিয়ন মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রাণিজ আমিষের একটি বড় অংশ আসে সমুদ্র থেকে। কিন্তু 'ওভারফিশিং' বা মাত্রাতিরিক্ত মাছ আহরণ ও অনিয়ন্ত্রিত ট্রলার ব্যবহারের ফলে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল আজ ভেঙে পড়ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাছের ভাণ্ডার বর্তমানে টেকসই মাত্রার নিচে নেমে গেছে। মহাসাগর দিবসের তাৎপর্য হলো এই তথ্যের আলোকে মৎস্য আহরণে একটি বৈজ্ঞানিক ও টেকসই কাঠামো গড়ে তোলা। এছাড়া, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ বা ব্লু-ইকোনমির অন্যান্য উপাদানগুলো আগামী দিনের খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, যা আমাদের প্রথাগত কৃষি অর্থনীতির পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
সামুদ্রিক দূষণের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক বর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে প্রধান উদ্বেগের কারণ। প্রতি বছর প্রায় ৮ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সমুদ্রে গিয়ে মিশছে, যা মাছের মাধ্যমে পুনরায় আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। এছাড়া তেল নিঃসরণ এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য সমুদ্রের বাস্তুসংস্থানকে বিষিয়ে তুলছে। এই দিবসের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরির মূল উদ্দেশ্য হলো 'শূন্য বর্জ্য নীতি' বা জিরো-ওয়েস্ট কালচার গড়ে তোলা। নীল অর্থনীতির (Blue Economy) ধারণাটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
মহাসাগরকে কেবল বর্জ্য ফেলার স্থান হিসেবে না দেখে, একে একটি বিশাল অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে জাহাজ চলাচল, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি (যেমন—জোয়ার-ভাটা বিদ্যুৎ) এবং সামুদ্রিক বায়োটেকনোলজির সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। বিশ্ব মহাসাগর দিবসের তাৎপর্য অনুধাবনের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার প্রসার।
মহাসাগরগুলো অত্যন্ত বিশাল ও রহস্যময় হওয়ায় এর বাস্তুসংস্থান সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনো সীমিত। সমুদ্র গবেষণার জন্য রোবোটিক প্রযুক্তি এবং স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহারের মাধ্যমে সমুদ্রের স্বাস্থ্যের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো জরুরি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (UNCLOS) মেনে সামুদ্রিক অঞ্চলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা (Marine Protected Areas) ঘোষণা করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, বঙ্গোপসাগর কেবল একটি নৌপথ নয়, বরং আমাদের উন্নয়নের একটি বড় অংশীদার। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বা সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমুদ্রের জলজ উচ্চতা ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা সম্ভব। গবেষণাগারের জ্ঞানকে তৃণমূল পর্যায়ে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারলেই কেবল এই দিবসটির প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে।
পরিশেষে, মহাসাগর দিবসের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—মহাসাগর থেকে কেবল আহরণ নয়, বরং তার রক্ষণাবেক্ষণ। আমরা যে গ্রহের বাসিন্দা, তার অস্তিত্ব মহাসাগরের সুস্থতার ওপর নির্ভর করে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-14: Life Below Water) অর্জনের জন্য আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও দূরদর্শী। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ যেন আমাদের জীবনের গ্লানি ধুয়ে ফেলে একটি সমৃদ্ধ ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে, সেই লক্ষ্যে আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসই হোক এই মহাসাগর দিবসের শ্রেষ্ঠ উপহার।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
পাঠকের মতামত:
- সন্তানের ভরণপোষণ মা-বাবার তালাক-বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়
- জর্ডানের বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের
- অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনা
- মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা হামলায় তিন নৌকা বোঝাই পাক সৈন্য নিহত হয়
- ‘সড়কে ইজিবাইক বন্ধ করলে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে’
- সালথায় তিন ব্যবসায়ীকে জরিমানা
- সাতক্ষীরা মেডিকেলে আউটসোসিং কর্মচারি নিয়োগে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, প্রতিবাদে বিক্ষোভ
- নীলডুমুর ১৭ বিজিবির উদ্যোগে অসহায়, দুস্থ ও মাঝে বন্যার্তদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ
- সাতক্ষীরায় পেশাজীবী চালকদের দক্ষতা ও সচেতনতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন
- তালায় জামায়াত নেতার নেতৃত্বে কৃষকের মৎস্য ঘের লুট
- ফরিদপুরে ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক’ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন
- শ্যামনগরে তিন বেকারিকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রী ধ্বংস
- স্কুলের পরিত্যক্ত ভবন ভাঙার সময় ছাদ ধসে ৬ শ্রমিক আহত
- কানাইপুরের তিনটি বেকারিতে ‘টাস্কফোর্স’র মোবাইল কোর্ট অভিযান
- বড়াইগ্রামে একসঙ্গে জন্ম নেওয়া তিন বোনই পেয়েছে প্রাথমিক বৃত্তি
- ৬৯'র স্মৃতি কথায় পঞ্চগড়ের রাজপথ
- পরীক্ষা শেষে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মিছিল
- ঈশ্বরদীতে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার ২০
- কাশিয়ানীতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল
- গোপালগঞ্জ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার উদ্বোধন
- ভ্রাম্যমাণ আদালতে মাদক ব্যবসায়ীকে ছয় মাসের কারাদণ্ড
- নিরাপত্তা, পরিচালনা ও স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা নিয়ে এনপিসিবিএলের এমডির ব্যাখ্যা
- কাপাসিয়ায় বিনামূল্যে সবজি বীজ ও সার সহায়তা প্রদান
- গোপালগঞ্জে প্রায় ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
- রথযাত্রা: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাঙালির অদম্য আধ্যাত্মিক যাত্রা
- ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনাকালিন খেলাধুলা পরিচালনা করবো’
- ‘জাতির ঐক্য বজায় রাখতে কেউ যেন বিভেদের পথে না যায়’
- গাইবান্ধায় তাওহীদভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীদের অধিকার বিষয়ক আলোচনা সভা
- ধ্বংসের পথে কালের সাক্ষী রাজা রাম মন্দির
- ভূঞাপুরে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক শফিউদ্দিনের স্মারকগ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব
- ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি পাঠাগারের কমিটি গঠন
- ইতিহাস গড়ে দেশে ফিরলেন ওয়াসফিয়া নাজরীন
- জামালপুরে পতাকা উত্তোলন দিবসে দুই মুক্তিযোদ্ধা ও এক সাংবাদিককে সম্মাননা
- পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুলে দক্ষতা ও আবিষ্কার প্রতিযোগিতা
- চাষী
- বরগুনায় অর্ধশতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ
- টুনিরহাট গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে পৌঁছালো টুস্টার বোদা
- কাজাখস্তানে ব্যাপক সহিংসতা, সেনা পাঠাচ্ছে প্রতিবেশীরা
- আবারও ফোবানা পুরুস্কার পেলেন বাংলা প্রেস সম্পাদক ছাবেদ সাথী
- বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পলাশবাড়ীতে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ পালিত
- দুই নাম্বারি চক্করের পলিটিক্স আর চলবে না : ফুয়াদ
- নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক কর্মকর্তাদের মিলনমেলা ছিনতাই
- ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’র শুরুটা আশা জাগানিয়া
- গ্রিসে বাংলাদেশিদের জন্য রন্ধন শিল্পের উপর মৌলিক প্রশিক্ষণ
- বাংলাদেশের সিডস ফর দ্য ফিউচার দল বিশ্বসেরা দশে
-1.gif)







