এই বাজেট কার স্বার্থে?
ঋণচক্রের বিষফাঁদে অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতির অগ্নিকুণ্ডে দগ্ধ জনজীবন
মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু
১১ জুন ২০২৬ তারিখে ঘোষিত ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বিশাল সংখ্যাগত সম্প্রসারণের ঘোষণা হলেও, এর অন্তর্নিহিত কাঠামো বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট বাস্তবতা সামনে আসে—এটি প্রবৃদ্ধিনির্ভর নয়, বরং ঘাটতি ও ঋণনির্ভর এক উচ্চচাপযুক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো।
বাজেট ঘোষণায় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে মূল লক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বল কাঠামো মিলিয়ে এটি একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনৈতিক সমীকরণে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের আয় স্থবির, অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় অব্যাহতভাবে বাড়ছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জ্বালানি—সবকিছুই ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি সংকুচিত হচ্ছে, নিম্নআয়ের মানুষ ন্যূনতম জীবনধারণেও হিমশিম খাচ্ছে, আর যুবসমাজ ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার এক গভীর অন্ধকারে অবস্থান করছে।
এই প্রেক্ষাপটে এত বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের প্রশ্ন কেবল অর্থনৈতিক নয়—এটি রাষ্ট্রের সামাজিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এক গুরুতর বাস্তবতা।
বাজেট কাঠামোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর ঘাটতি নির্ভরতা। রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা পূরণে দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সঞ্চয়পত্র এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এই নির্ভরতা স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতিকে সচল রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি গভীর ঋণচক্র তৈরি করে, যেখানে বর্তমান উন্নয়ন ব্যয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর সুদসহ আর্থিক বোঝা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ফলে অর্থনীতির এই কাঠামো ধীরে ধীরে একটি “ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধির ফাঁদে” পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বাড়লেও তার বাস্তব স্থায়িত্ব ও স্বনির্ভরতা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই বাজেটের সবচেয়ে দ্রুত ও সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে। রাজস্ব চাপ, পরোক্ষ করের বিস্তার এবং বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা দ্রব্যমূল্যকে আরও অস্থির ও নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলবে।
ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও দ্রুত বাড়বে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন থেকে কঠিনতর হবে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঞ্চয় সক্ষমতা কার্যত ভেঙে পড়বে, নিম্নআয়ের মানুষের জীবন টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হবে এবং চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় বহু পরিবারের জন্য অপ্রাপ্য হয়ে উঠবে। উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই বড় হোক না কেন, বাস্তবে জনগণের জীবনে স্বস্তির বদলে চাপই বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষি খাতে এই চাপ আরও গভীর ও কাঠামোগত সংকট সৃষ্টি করছে। কৃষক দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হলেও তিনি আজ উৎপাদন ব্যয়ের অসহনীয় চাপে বিপর্যস্ত। ডিজেল, সার, বীজ, সেচ ও শ্রম ব্যয় লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেলেও কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় কৃষক উৎপাদন করেও লোকসানের মুখে পড়ছে।
ফলে কৃষক ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের নির্মম বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, যেখানে মধ্যস্বত্বভোগী চক্র বিপুল মুনাফা অর্জন করছে, অথচ প্রকৃত উৎপাদক কৃষক ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
শ্রমিক শ্রেণির অবস্থাও একই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। গার্মেন্টস, নির্মাণ, পরিবহন ও শিল্প খাতের শ্রমিকরা অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও তাদের প্রকৃত জীবনমান মূল্যস্ফীতির চাপে ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। নামমাত্র আয় বৃদ্ধি পেলেও জীবনযাত্রার ব্যয় সেই বৃদ্ধিকে বহুগুণে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে শ্রমিকের জীবন উন্নয়নের পথে নয়, বরং প্রতিদিন টিকে থাকার কঠিন সংগ্রামে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
যুবসমাজ এই বাজেট কাঠামোর সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এর ফলে বেকারত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, হতাশা ও অনিশ্চয়তা গভীর হচ্ছে, বিদেশমুখী প্রবণতা তীব্র হচ্ছে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য এক গভীর সতর্ক সংকেত।
শিক্ষা খাতেও কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট। দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের জন্য যে মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রয়োজন, তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির প্রতিযোগিতামূলক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাত এই বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান চাপের কেন্দ্রবিন্দু। দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং আস্থাহীনতা ব্যাংক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই অবস্থায় অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে, শিল্প উৎপাদন কমে যায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হ্রাস পায়। ফলে রাষ্ট্রীয় ঋণনীতি শেষ পর্যন্ত বেসরকারি অর্থনীতিকেই চাপে ফেলে দিচ্ছে।
সরকারি দৃষ্টিভঙ্গিতে এই বাজেটকে অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বৃহৎ অর্থনীতির জন্য বৃহৎ বাজেট প্রয়োজন—এটি একটি প্রচলিত যুক্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাজেটের সাফল্য কখনোই এর আকারে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় ব্যয়ের দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রাজস্ব সক্ষমতার বাস্তব অর্জনের ওপর।
এই পুরো কাঠামোর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো দুর্নীতি, অপচয় এবং অদক্ষ বাস্তবায়ন। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে—প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়, মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকে এবং জবাবদিহিতা সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ জনগণের প্রকৃত কল্যাণে পৌঁছায় না।
অর্থনৈতিক চাপ যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন তা কেবল অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সমাজে অস্থিরতা, হতাশা এবং বিভিন্ন অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই বাজেট একটি তীব্র বিতর্ক ও বিভাজনের জন্ম দিয়েছে। উন্নয়ন প্রত্যাশা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত—এই বাজেট কি সত্যিই জনকল্যাণের বাস্তব রূপরেখা, নাকি একটি ঋণনির্ভর উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক কাঠামো, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক গভীর আর্থিক ও সামাজিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
যখন মানুষের আয় কমছে, বাজার অস্থির, কর্মসংস্থান অনিশ্চিত, ব্যাংক খাত দুর্বল এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে—তখন এই বাজেট কাগজে উন্নয়নের প্রতীক হলেও বাস্তবে তা এক গভীর “চাপ, ঋণ ও অনিশ্চয়তার অর্থনৈতিক ফাঁদ” হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সবশেষে বলা যায়—এই বাজেটের প্রকৃত শক্তি তার অঙ্কে নয়, বরং জনগণের জীবনে তার বাস্তব প্রতিফলনে। যদি মানুষের জীবনমান উন্নত না হয়, বৈষম্য বাড়ে এবং ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে যত বড় বাজেটই হোক না কেন, তা জনকল্যাণের প্রকৃত মানদণ্ডে সফল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
লেখক : একজন কবি।
পাঠকের মতামত:
- পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র রুখতে সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে সজাগ থাকার আহ্বান রিজভীর
- ৩০তম জন্মদিনে ৩০০ গাছ লাগালেন চমক
- ফুলপুরে সমাজকল্যাণ পরিষদের অনুদানের চেক বিতরণ
- তালায় পরিবহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে গৃহবধূ নিহত
- বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশে ১১ মৃত্যু, উদযাপন নিয়ন্ত্রণে রিট
- সব সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল
- ঢাকার বাতাসের মান আজ ‘অনেক ভালো’
- রাজধানীতে ডিএমপির অভিযান, ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪২৫
- ভারতকে উড়িয়ে প্রথমবার সিরিজ জিতল ইংল্যান্ড
- রাশিয়ার হামলা থেকে বাঁচতে প্যাট্রিয়ট পাচ্ছে ইউক্রেন
- ‘স্পেনকে হারানো অসম্ভব কিছু নয়’
- বাড়লো সোনা-রুপার দাম
- ভারত-ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি
- বিতর্কের পর নড়াইল-২ আসনের এমপি'র ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদান ফিরছে সরকারি কোষাগারে
- ঈশ্বরদীতে চিত্রা এক্সপ্রেসে কোডিনযুক্ত এসকাফ সিরাপ উদ্ধার, নারী গ্রেপ্তার
- মঈনপুরে মুক্তিযোদ্ধাদল পাকবাহিনীর সৈন্য বোঝাই স্পীডবোটকে এ্যামবুশ করে
- ১৭ বছর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত শিক্ষক, তবুও এমপিও'র বেতন-ভাতা!
- দুর্যোগে ও উন্নয়নে জনগণের পাশে আছে সরকার: দীপেন দেওয়ান
- ঈশ্বরদীতে চিত্রা এক্সপ্রেসে ৪০ বোতল এসকাফ সিরাপসহ নারী গ্রেপ্তার
- আত্মগোপনে থাকা ইউপি চেয়ারম্যান জুবেরী গ্রেপ্তার
- পলাশবাড়ীতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে তুলা চাষের উপকরণ বিতরণ
- পাংশায় হিজাব না পরায় পরীক্ষার্থীকে লাঞ্ছিত
- বড়াইগ্রামে ট্রাকের ধাক্কায় ইজিবাইকের চালকসহ নিহত ৩
- ঢাকায় গ্রেপ্তার সাবেক এমপি নূরকে জামালপুরে নাশকতা মামলায় জেলহাজতে
- তরুণরা হবে কাম্য জনসংখ্যা তৈরির মূল স্বপ্নদ্রষ্টা
- পলাশবাড়ীতে জুলাই শহীদ দিবস পালিত
- পলাশবাড়ীতে দেশীয় মাছ রক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান
- পটুয়াখালীতে সাংবাদিক-রাজনীতিক আব্দুর রশিদের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত
- মহান মুক্তিযুদ্ধে এক কিশোর
- সুন্দরবনে পুণ্যস্নানের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে রাস উৎসব
- ধর্ষণ মামলার আসামি গ্রেফতারের দাবিতে বাদির সংবাদ সম্মেলন
- কাঁচা মরিচ
- ছোট্ট জোবায়েদকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন
- ‘স্পেনকে হারানো অসম্ভব কিছু নয়’
- কুষ্টিয়ায় লালন আঁখড়াবাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার
- পলাশবাড়ীতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘরবাড়ীতে হামলা, আহত ৫
- পটুয়াখালীতে বিভিন্ন আয়োজনে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালিত
- ভোলার তজুমদ্দিনে অভিজ্ঞতা বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
- শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে সংসদে কথা বলার প্রতিশ্রুতি সাংসদ ইকবাল হোসেন অপুর
- রাজধানীতে ডিএমপির অভিযান, ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪২৫
- দিনাজপুরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় চারজন নিহত, আহত ৫
- ১০ ডিসেম্বর নড়াইল মুক্ত দিবস
- গোবিন্দগঞ্জে হাত-পায়ে লোহার শিকল বেড়ি লাগানো যুবকের মরদেহ উদ্ধার
- ‘কোনো বক্তব্য নেই’
- দীঘিনালায় গোলাগুলিতে নিহত ৪
-1.gif)







