E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

মুখস্থ বনাম দক্ষতা: আগামীর বৈশ্বিক প্রস্তুতি

২০২৬ জুলাই ২১ ১৭:৩৫:১৭
মুখস্থ বনাম দক্ষতা: আগামীর বৈশ্বিক প্রস্তুতি

ওয়াজেদুর রহমান কনক


একবিংশ শতাব্দীর এই চতুর্থ দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের দ্রুত বিকাশ বিশ্ব অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। বর্তমান যুগে কেবল তথ্য মুখস্থ করে মনে রাখার সনাতন ক্ষমতা (Information Retention) ক্যারিয়ারে কোনো প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিচ্ছে না; বরং "কী জানি" তার চেয়ে "কী করতে পারি" এবং কত দ্রুত নতুন প্রযুক্তি শিখতে পারি—তা-ই প্রগতির মূল চালিকাশক্তি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মতো বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক রিপোর্টগুলো স্পষ্ট করছে যে, আধুনিক কর্মক্ষেত্রে এখন বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা ও জটিল সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতাগুলোই সবচেয়ে বেশি জরুরি। অথচ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও মুখস্থ বিদ্যার আধিপত্য চলায় সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র "যোগ্যতার অমিল" (Skills Mismatch), যা জিপিএ-৫ সমৃদ্ধ বিপুলসংখ্যক সার্টিফিকেটধারী বেকার তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংক ও ইউনেস্কোর সূচকগুলো আমাদের এই কাঠামোগত দুর্বলতা এবং লার্নিং পোভার্টির ভয়াবহ চিত্রই তুলে ধরে। এই সংকট থেকে উত্তরণে পরীক্ষাকেন্দ্রিক কৈশিক জট ও শিল্প-একাডেমিয়ার সংযোগহীনতা দূর করা জরুরি। শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন, শিক্ষকদের মেন্টরশিপের রূপান্তর এবং প্রজেক্ট-ভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে বাস্তবমুখী দক্ষতায় দক্ষ করে তুলতে হবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের প্রকৃত সুফল পেতে হলে আমাদের শিক্ষাদর্শনে আমূল পরিবর্তন এনে তরুণদের বৈশ্বিক নাগরিক ও সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

একবিংশ শতাব্দীর এই চতুর্থ দশকে বিশ্ব অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে এমন এক আমূল পরিবর্তন ঘটছে, যেখানে তথ্য মুখস্থ করে মনে রাখার ক্ষমতা আর কাউকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যাডভান্সড অটোমেশন এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের এই বৈপ্লবিক যুগে মানুষ "কী জানে" তার চেয়ে "কী করতে পারি" এবং "কত দ্রুত নতুন দক্ষতা শিখতে পারি" তথা লার্নাবিলিটিই মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে সনাতন মুখস্থ বিদ্যা বা রোট লার্নিং এবং দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষার দ্বান্দ্বিকতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা ও কাঠামোগত সংকটকে প্রবলভাবে সামনে এনেছে। ঐতিহাসিকভাবে, শিল্প বিপ্লবের যুগে ফ্যাক্টরি শ্রমিক তৈরির উদ্দেশ্যে যে শিক্ষা ব্যবস্থার পত্তন হয়েছিল, তা ছিল স্রেফ মানুষের স্মৃতিশক্তি ও নির্দেশাবলী হুবহু পালনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের 'ফিউচার অব জবস রিপোর্ট' আমাদের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, আধুনিক কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শীর্ষ দশটি দক্ষতার মধ্যে প্রধানতম হলো বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা এবং জটিল সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রধান সমস্যা হলো যোগ্যতার অমিল বা স্কিলস মিসম্যাচ, যেখানে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়লেও শিল্প খাতের চাহিদার সাথে তাদের বাস্তব দক্ষতার দূরত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রচলিত এই মুখস্থ-নির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের সাময়িকভাবে পরীক্ষায় জিপিএ-৫ বা ভালো সিজিপিএ এনে দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের এক অনিশ্চিত কর্মসংস্থানহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাংকের মানব পুঁজি সূচক অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগের তুলনায় উৎপাদনশীল মানব পুঁজির রূপান্তর হার মাত্র ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ, যার অর্থ একজন শিশু বিদ্যালয়ে যে মূল্যবান সময় ব্যয় করছে, তার অর্ধেকই বাস্তব জীবনের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে কোনো কাজে আসছে না। একই সাথে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যমতে, এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার যেখানে প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, সেখানে শিল্প মালিকরা প্রতিনিয়ত দক্ষ মিড-লেভেল ম্যানেজার বা টেকনিক্যাল এক্সপার্টের তীব্র অভাবে ভুগছেন। মুখস্থ বিদ্যার এই ভয়াবহ উপজাত হিসেবে ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট এক আশঙ্কাজনক লার্নিং পোভার্টির চিত্র তুলে ধরে সতর্ক করেছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই ১০ বছর বয়সের মধ্যে একটি সাধারণ পাঠ্য অংশ পড়ে বুঝতে কিংবা সরল অংক নিজে সমাধান করতে সক্ষম হয় না।

দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষায় পূর্ণাঙ্গ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে প্রধান কিছু অন্তরায় বা সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো শত বছরের পুরোনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন কাঠামোর কৈশিক জট, যেখানে শিক্ষকরা এখনও সিলেবাস শেষ করা এবং শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন কমন পাওয়ার বৃত্তে বন্দী হয়ে আছে। এর পাশাপাশি রয়েছে অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের চরম অভাব, কারণ দক্ষতা-ভিত্তিক কারিকুলামের জন্য যে ধরনের ল্যাবরেটরি, প্রজেক্ট-ভিত্তিক লার্নিং এবং উচ্চমানের মেন্টরশিপ প্রয়োজন, তা আমাদের সিংহভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত এবং শিক্ষকরা নিজেরাই আধুনিক প্যাডাগজি বা শিক্ষণবিজ্ঞানে অভ্যস্ত নন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগহীনতা, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিলেবাস ও ল্যাবরেটরিগুলো শিল্পের বর্তমান প্রযুক্তির চেয়ে অন্তত এক দশক পিছিয়ে রয়েছে।

তবে এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, রূপান্তরের সম্ভাবনা ও আমাদের প্রস্তুতি একেবারে শূন্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন এবং কারিগরি শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ একটি ইতিবাচক সূচনা তৈরি করেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির জন্য একটি চতুর্মুখী কৌশলগত কাঠামো বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি, যেখানে প্রথম স্তম্ভ হিসেবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্মৃতিরক্ষার পরীক্ষার বদলে প্রজেক্ট, প্রেজেন্টেশন ও বাস্তব সমস্যা সমাধানভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করে ক্রিটিক্যাল থিংকিং ও টিমওয়ার্কের বিকাশ ঘটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি সংযোগের মাধ্যমে ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা এবং কারিকুলাম প্রণয়নে শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে গ্র্যাজুয়েটদের সরাসরি কর্মসংস্থান উপযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক উন্নয়নের লক্ষ্যে নিয়মিত পেডাগজিক্যাল ও প্রযুক্তিগত আপস্কিলিং প্রোগ্রাম চালু করে মুখস্থ করানোর প্রথাগত অভ্যাস থেকে শিক্ষকদের মেন্টরশিপে রূপান্তর করতে হবে। সর্বশেষে, দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে তরুণদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে আজীবন শিক্ষার অংশ হিসেবে মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালিং ও শর্ট সার্টিফিকেট কোর্সের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, মুখস্থ বিদ্যা ও দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষার এই লড়াই আসলে অতীত বনাম ভবিষ্যতের লড়াই। আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের প্রকৃত সুফল পেতে হলে তরুণ প্রজন্মকে কেবল ডিগ্রিধারী ও সার্টিফিকেটধারী হিসেবে গড়ে তুললে চলবে না, বরং তাদের বৈশ্বিক নাগরিক এবং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে। যুগের চাহিদায় আমাদের বর্তমান প্রস্তুতি এখনও প্রাথমিক স্তরে থাকলেও সঠিক অর্থায়ন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং শিক্ষাদর্শনের আমূল পরিবর্তনই পারে এই জাতীয় সংকটকে বৈশ্বিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

১৭ আগস্ট ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test