E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

পথের ধুলো থেকে: পর্ব-৬

সময়-অসময়ের আলোচনায় উঠে আসে নতুন শিরোনাম ‘জনগণ স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা’; দানা বাঁধে নতুন প্রশ্ন, সঠিক মুক্তিযোদ্ধা প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণ নেই কেন?

২০২১ জুলাই ৩০ ১৪:১৩:৫০
সময়-অসময়ের আলোচনায় উঠে আসে নতুন শিরোনাম ‘জনগণ স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা’; দানা বাঁধে নতুন প্রশ্ন, সঠিক মুক্তিযোদ্ধা প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণ নেই কেন?

সাইফুল ইসলাম


বিশ্বব্যাপি করোনা অতিমারীর কারণে সাংগঠনিক তৎপরতা কমিয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখির গুরুত্ব যখন বাড়ানো হয়, তখন এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখী হতে হয় লেখক-সংগঠকদের। স্বাভাবিকভাবেই তা আলোচিত হতে থাকে আগ্রহী সংগঠকদের মধ্যেও। তাছাড়া উৎসাহী সংগঠকেরাও ব্যক্তিগত উদ্যোগে যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকে সাধারণের সঙ্গে। সে অভিজ্ঞতাও আলোচিত হতে থাকে নিজেদের মধ্যে। এতে সংগঠকদের মধ্যে ধারণা গড়ে ওঠে যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধা, জনগণ, রাষ্ট্র-সমাজকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল সবাই, তখন যে সহযোগিতা, সহমর্তিতা বোধ গড়ে উঠেছিল পরস্পরের মধ্যে, ছিটেফোটাও যেন এখন আর তা অবশিষ্ট নেই। এমনকি পরস্পরের বিপরীতে অবস্থান করছে সবাই। মুক্তিযোদ্ধা জনগণতে পাত্তা দেন না, জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের পছন্দ করে না, রাজনৈতিক দলের কর্মীদের অবস্থানতো আরো নিম্নপর্যায়ে।

‘মু্ক্তিযোদ্ধার যুদ্ধস্মৃতি’ লিখতে গিয়ে দেখা যায়, ‘৬৯-এর ছাত্র-আন্দোলনের শুরু থেকে রাজনৈতিক কর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধ কালে ‘মুক্তিযোদ্ধা’কে মুক্তিদাতা ‘রূপকথা নায়ক’ ভাবতে শুরু করে জনগণ। এ সময়ে পরস্পরের মধ্যে শুরু হয় এক ধরণের আদর্শিক লড়াই। সবাই ভাবত, দেশ ও জনগণের জন্য কে কতটুটু বিলিয়ে দিতে পারে? এই আদর্শিক লড়াই এক ধরণের আবেগ তৈরি করে সবার মধ্যে, সহায়তা করে দেশপ্রেমিক হতে। কিন্তু নানা কারণে ‘মুক্তিযোদ্ধা’দের আদর্শিক ভাবে দেশ ও জনগণের ‘মুক্তিদাতা’ হয়ে ওঠার আগেই সমাপ্ত হয় মুক্তিযুদ্ধ। বিজয় পরবর্তী সময়ে ‘বিজয়ের তৃপ্তি’ আর ‘জনগণের মুক্তিদাতা’ হয়ে না উঠতে পারার অতৃপ্তি নিয়ে ঘরে ফিরতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। ফলে অদ্ভূত ভাবে বিকশিত হতে থাকে তাদের মনন জগৎ। বিজয়ের পর হঠাৎ করেই যখন জানা যায় যে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের আর কোনও প্রয়োজন নেই’ তখন তাদের মধ্যে নেমে আসে এক ধরণের হতাশা। নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলা শাসক গোষ্ঠি এক সময় বুঝতে পারে যে, মুক্তিযুদ্ধের কথা না বলে এদেশের জনগণকে শাসন করা অসম্ভব, তখন শুরু হয়

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় ভাবে সন্মান প্রদর্শণ, সন্মানী প্রদান। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় ‘হারিয়ে পাওয়ার চমক।’ দেশ ও জনগণের ‘মুক্তিদাতা’ মুক্তিযোদ্ধারা তখন অনেকেই শুরু করে ‘লোভী’র আচরণ। এটা জনগণ থেকে আরও বিচ্ছিহ্ন করে ফেলে মুক্তিযোদ্ধাদের। তালিকা, কোটা, সন্মানী নিয়ে শুরু হয় নানা খেলা, যা একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের ফেলে দেয় আরও সমালোচনার মুখে। তার ওপরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা, ইতিহাস লেখার সঠিক ধারা গড়ে না ওঠায় এটা হয়ে পড়ে আরও জটিল। ব্যাপক সমালোচনা, সংঘাতের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হয় লেখক-সংগঠকদের। নানা গল্পকথা, কল্পকথা, সঠিক কথা শুনে শুনে অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে থাকে তারা।

‘সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ’ লেখা হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধকে প্রত্যক্ষ করেছেন এমন ব্যক্তিদের স্মৃতিচারনের ওপর ভিত্তি করে। এটা করতে গিয়েও নানা জটিলতার মুখোমুখী হতে হয় লেখক-সংগঠকদের। ‘মুক্তিযোদ্ধা’ একটি ‘লাভজনক পদ’ হয়ে ওঠায় মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার উদ্গ্রীব অনেকেই। ফলে ইনিয়ে বিনিয়ে তিনিও যে ‘মুক্তিযোদ্ধা’- একথা প্রমাণের চেষ্টা করেন। এতেও বাধাগ্রস্থ হয় সঠিক ঘটনা তুলে আনার ক্ষেত্রে। তবে, সাধারণ মানুষের সরলতা অথবা ‘চাতুরি করার ক্ষমতা রপ্ত না থাকায়’ তাদের কাছে পাওয়া যেতে থাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ক্ষেত্রে খুবই প্রয়োজনীয় । যেমন, তৃণমূলের স্বাধীনতা বিরোধীদের অবস্থান, নিপীড়ন, লুটপাটের ঘটনা তাদের বর্ণনায় যত সহজে উঠে আসতে থাকে।

‘শহিদ পরিবার’ শিরোনামে প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়েও নানা অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে থাকে লেখক-সংগঠকেরা। স্বাধীনতা পর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ অথচ বঞ্চিত এই ‘শহিদ পরিবার’। মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বজন হারিয়ে এই পরিবারগুলি হয়ে পড়ে ছিন্নভিন্ন, দিশেহারা। বঙ্গবন্ধু সরকার প্রাথমিক অবস্থায় এদের পূনবার্সনের উদ্যোগ নিলেও নানা কারণে তা এক সময় বিকল হয়ে যায়। এদের কোলে বা পেটে শহিদের সন্তান নিয়ে টিকে থাকতে হয় বাপভাই বা শশুর-ভাসুরের আশ্রিত হয়ে। অনেকে স্বামী হারিয়ে সন্তানদের এতিমখানায় ভর্তি করে আশ্রয় নেন নারী পূনর্বাসক কেন্দ্রে। বলতে গেলে, যাঁদের স্বজনের রক্তে গড়া স্বাধীন রাষ্ট-সমাজ-আত্মীয়স্বজন- কোথাও শহিদ পরিবারের ঠাঁই হয়নি মর্যাদার সঙ্গে। ফলে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক ধরণের স্বাধীন রাষ্ট্র-বিরোধী ক্ষোভও। অনেক পরিবার মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ না হলে তাদের স্বজন হারানো কষ্ট ভোগের ঘটনা ঘটতো না। এই হতাশাকে কাটিয়ে তাদের আশাবাদি করে সঠিক তথ্য বের করে আনা সহজসাধ্য নয় মোটেও। আবার জাতির দৃশ্যমান অংশ লোভের ফাঁদে পা দিয়ে যখন দ্রুত মুনাফা পেতে চাইছে, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের এই দূরূহ কাজ তুলে আনার কর্মী-সংগঠক-লেখক সহজেই মিলবে- এটা ভাবা সহজ নয়। ফলে এখানেও দেখা দেয় একটি আদর্শিক লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তা।

‘মুক্তিযুদ্ধে গ্রাম’ শিরোনামে প্রবীণদের সাক্ষাৎকার নিয়ে লেখা শুরু হয় আরেকটি প্রতিবেদন। সংগঠকদের মনে হতে থাকে, একটি জেলার শত গ্রামের প্রতিবেদন তৈরি করা গেলে সহজেই উঠে আসবে সংশ্লিষ্ট জেলার তৃণমুল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। প্রতিবেদনে উঠে আসতে শুরু করে গ্রামের অবস্থান, গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী এসে থাকলে তার বিবরণ, শহিদের তালিকা, এমনকি পোড়ানোর বাড়ি তালিকাও। তুলে আনা সম্ভব ওই গ্রামে কারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তাদের তালিকাও। এতেও সমস্যা সৃষ্টি করা হয়েছে ইতিমধ্যেই। একদিন এক অবহিতকরণ সভায় এক সিনিয়র মুক্তিযোদ্ধা বলেন- এতে বিপত্তি আসবে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে থেকেই। কারণ, ইতিমধ্যেই অমুক্তিযোদ্ধা অনেককেই ঠাঁই দেওয়া হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায়। আর এটা করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদর সহযোগিতায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনা শুনতে গেলে প্রবীণেরা সঠিক মুক্তিযোদ্ধাদের নামই বলবেন। তালিকাভূক্ত অনেকের নামই তারা বলবে না। আবার অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, যাদের ব্যক্তিগত অনীহা বা যথাযথ সময়ে উদ্যোগ না নেওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তাদের নাম ওঠেনি -তিনি সরকার কতৃক স্বীকৃত নন- ফলে গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সৃষ্টি হবে বিপত্ত্বি। বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হয় লেখক-সংগঠকদের। কিন্তু ধৈর্য্য না হারিয়ে পথ চলতে থাকলে জনগণই পথ বাতলে দেয়। শিয়ালকোল এলাকার একটি গ্রামে এ নিয়ে পড়তে হয় সমস্যায়। তাদের কথা, তাদের গ্রামের দুই জন আছেন, তারা মুক্তিযোদ্ধা। অথচ তালিকাভূক্ত হননি। আবার মুক্তিযুদ্ধে যায়নি এমন মানুষ তালিকাভূক্ত হয়ে ভাতা, নানা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে- এটার মীমাংসার কথা ওঠে? শুরু হয় ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক-বেঠিক তালিকা বিতর্ক।’ একজন মুরুব্বি এর সমাধান দেন। তিনি বলেন- ‘ আমরা গ্রামের মানুষ দেখেছি যে তারা মুক্তিযোদ্ধা, তাহলে তাদের নাম আসবে না কেন? একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম তো গ্রামের তালিকায় থাকাই উচিত! এ আলোচনা থেকে বেড়িয়ে আসে নতুন শব্দ- ‘জনগণ স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা’ আর ‘তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা।’ সহজ হয়ে পড়ে একটি জটিল বিষয়।

করোনার অতিমারীর সময়েও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অব্যাহত থাকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিরক্ষার কাজ। হতে থাকে লেখালেখি, প্রকাশ হতে থাকে স্থানীয় দৈনিক এবং বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টালে। জনগণের মধ্যে থেকে উঠে আসতে শুরু করে কাজ করার নতুন নতুন ধারণা।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক, সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক।

পাঠকের মতামত:

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test