E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

রণাঙ্গনের কথা

২০২২ জানুয়ারি ১৫ ১৫:৩৬:৫৭
রণাঙ্গনের কথা

দেবেশ সান্যাল


বাঙালি জাতির গৌরবময় অর্জনগুলির মধ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এজন্য আমি নিজেকে ভাগ্যবান ও ধন্য মনে করি। আর দু’বছর পর জন্ম হলে আমার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার সৌভাগ্য হতো না। আমি মুক্তিযোদ্ধা দেবেশ চন্দ্র সান্যাল, পিতা- দ্বিজেন্দ্র নাথ সান্যাল, মাতা, নীলিমা রাণী সান্যাল। আমার জন্ম ১৯৫৪ সালের ২৬ নভেম্বর। গ্রাম ও ডাকঘর- রতন কান্দি, ইউনিয়ন পরিষদ- হাবিবুল্লাহ নগর, উপজেলা- শাহজাদপুর, জেলা- সিরাজগঞ্জ।

আমি ভারতীয় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। আমার এফ এফ নং-৪৭৪২। গেজেট নং-১৬৭৯। আমি মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে সাড়া দিয়ে জীবনপণ মহানমুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ২৩ জুলাই’৭১ শাহজাদপুর প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এ্যাডভোকেট জনাব মোঃ আব্দুর রহমান সাহেবের সাথে ভারতে গিয়েছিলাম। বিভিন্ন প্রাথমিক মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শেষে শিলিগুড়ি জেলার পানিঘাটা নামক ট্রেনিং সেন্টারে হায়ার ট্রেনিং হয়। ট্রেনিং শেষে আমাদের ৭ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়াটার রেশনিং মানিও পকেট এ্যালাউন্সের টাকা দেওয়া হয়। তরঙ্গপুর নিয়ে আসা হয়। তরঙ্গপুর থেকে আমাদের নামে নামে অস্ত্র ইস্যু করা হয়। রেশনিং মানিও পকেট এ্যালাউন্সের টাকা দেওয়া হয়। তরঙ্গপুর বাজার থেকে আমি একটি শ্রীশ্রী চন্ডি গ্রন্থ,একটি পতাকা ও ৪ ব্যান্ডের রেডিও ক্রয় করে ছিলাম। একই এলাকার রাস্তাঘাট চেনা ১০ জন এফএফ এর সমন্বয়ে একটি গ্রুপ করা হয়। তখন আমাদের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন লেঃ কর্ণেল কাজী নুরুজ্জামান।

আমাদের লাল গোলা সাব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী। আমাদের গ্রুপ কমান্ডার নিযুক্ত হন বেলকুচি উপজেলার তামাই গ্রামের এম.এ মান্নান। ডেপুটি কমান্ডার নিযুক্ত হন শাহজাদপুর উপজেলার জামিরতা গ্রামের বাবু রবীন্দ্র নাথ বাগ্চী। আমরা অস্ত্র ও গোলা বারুদ নিয়ে ৬ সেপ্টেম্বর’৭১ দেশের অভ্যন্তরে আসি। দেশের অভ্যন্তরে এসে গ্রামে গ্রামে থাকতে থাকলাম। স্বাধীনতা বিরোধী দের বুঝাতে থাকলাম রাতে পাকি হানাদার/রাজাকার ক্যাম্পের কাছে গিয়ে দু একটা ফায়ার করে হানাদারদের আতঙ্কিত করতাম। আমারা পালাক্রমে আমাদের অবস্থান পাহারা দিতাম। প্রতিরাতে কমান্ডার স্যার আমাদের কে পাসওয়ার্ড দিতেন। প্রতিদিন সকালে আমরা অস্ত্রে ফুল থ্রু মারতাম এবং পরিষ্কার করতাম। আমরা একই শেলটারে এক রাতের বেশি অবস্থান করতাম না। তখন দেশের অধিকাংশ মানুষ ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে। জনগণ অনেক কষ্ট করে ও ঝুঁকি নিয়ে আমাদের আশ্রয় ও থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। দেশের অভ্যন্তরে এসে আমরা পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদর ও আল শামসদের বিরুদ্ধে ৪টি গেরিলা/সম্মুখ যুদ্ধ ও এ্যাম্বুস করেছি। যুদ্ধ ও এ্যাম্বুস গুলো হলো-

বেলকুচি থানা আক্রমণ যুদ্ধ: বেলকুচি সিরাজগঞ্জ জেলার একটি উল্লেখযোগ্য থানা। এই থানা আক্রমণ যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম.এ মান্নান স্যার। ৩ নভেম্বর’৭১ কমান্ডার স্যারের ও আরো ৩জনের রেকিতে একযোগে বেলকুচি থানা ও মুসলিমলীগ নেতা মোঃ আব্দুল মতিনের বাড়ি আক্রমন করলাম। সন্ধ্যায় বানিয়া গাতি শেল্টারে কমান্ডার স্যার বিস্তারিত ব্রিফ করলেন। আমাদের দুই গ্রুপে ভাগ করে দিলেন। সিদ্ধান্ত হলো কমান্ডার স্যারের নেতৃত্বে বড় গ্রুপটি থানা আক্রমন করবে। অন্য গ্রুপটি রবীন্দ্র নাথ বাগ্চীর নেতৃত্বে মতিন সাহেবের বাড়ি আক্রমন করে মতিন সাহেবকে ধরে আনবে। আমি কমান্ডার স্যারের গ্রুপে থেকে থানা আক্রমন যুদ্ধে অংশ নিলাম। রাত ৯ টায় বানিয়া গাতি থেকে যাত্রা করলাম। থানার কাছে গিয়ে দু গ্রুপ টার্গের উদ্দেশ্যে ভাগ হলাম। রাত ১২টায় একযোগে আক্রমনের সিদ্ধান্ত। পরিকল্পনা মোতাবেক থানার পশ্চিম পাশ দিয়ে স্ক্রোলিং করে থানার সামনে যেতেই সেন্ট্রি দেখে ফেললো। হুইসেল বাঁজিয়ে থানার সবাইকে জানিয়ে দিয়ে আমাদের কে লক্ষ্য করে গুলি করলো। আমাদের কমান্ডার স্যার কমান্ড করে ফায়ার ওপেন করলেন। আমরা সবাই একযোগে গুলি করলাম। এক ঘণ্টা ব্যাপি যুদ্ধ চললো। থানার বিহারী পুলিশ ও রাজাকার থানার পিছনদিক দিয়ে পালিয়ে সোহাগপুর নদীতে থাকা একটি লঞ্চে চড়ে যমুনার মধ্যে গেল। থানার সেন্ট্রি গুলি করা বন্ধ করে দুই হাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণ করলো।

আমরা থানার ভিতরে ঢুকে পড়লাম। থানার মধ্যে গিয়ে দেখি ৩জন পুলিশ ও ২ জন রাজাকার গুলিতে মারা গেছে। সেন্ট্রি সহ থানার দু’জন রাজাকারকে জ্যান্ত হাত বেঁধে ধরে নিয়ে এলাম। ভোর হয়ে গেল। মতিন সাহেবের বাড়ি আক্রমন করা দলটিও এলো। মতিন সাহেব পালিয়ে গেছে। তাকে ধরা সম্ভব হয় নাই। থানার আশেপাশে দোকান ও বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়ালো। বিজয়ী হয়ে চলে এলাম। পরদিন সিরাজগঞ্জ থেকে শতাধিক পাকি হানাদার এসে থানার আশে পাশে আগুন দিয়েছিল এবং মানুষদের নির্যাতন করেছিল।

কালিয়া হরিপুর যুদ্ধ : কালিয়া হরিপুর স্টেশন সংলগ্ন ব্রীজ পাহাড়ারত রাজাকার ক্যাম্প এ্যাম্বুস। কালিয়া হরিপুর সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ থানার একটি রেলওয়ে স্টেশন। এই এ্যাম্বুসের নেতৃত্বে ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার জনাব এম.এ মান্নান স্যার। ৯ নভেম্বর’৭১ আমাদের গ্রুপের ঝাঐল গ্রামের সিরাজগঞ্জের এম,এন, এ জনাব মোঃ মোতাহার হোসেন তালুকদারের ভায়রা আওয়ামীলীগ নেতা জনাব মোঃ আব্দুল হামিদ তালুকদারের রেকির ভিত্তিতে কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ষ্টেশন সংলগ্ন ব্রীজ পাহাড়ারত রাজাকার ক্যাম্প অ্যাম্বুস করেছিলাম। কমান্ডার স্যার ক্রোলিং করে রেল লাইনে বৈদ্যুতিক মাইন বসিয়ে আসলেন। তথ্য ছিল ঈশ্বরদী থেকে পাকি হানাদার নিয়ে একটি ট্রেন সিরাজগঞ্জ যাবে। কমান্ডার স্যার ট্রেনটি উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করলেন। আমরা ধানক্ষেতের মধ্যে পজিশন অবস্থায় থাকলাম। কামান্ডার স্যারের হাতে মাইনের তার ও ব্যাটারী। টর্চ লাইট ও হ্যারিকেন হাতে পাকি মিলি শিয়া ও রাজাকারেরা টহল দিচ্ছিল। ওদের পায়ে লেগে হঠাৎ আমাদের মাইনের তার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

মাইনটি ওদের নজরে পড়লো। হুইসেল দিয়ে রাজাকারদের লাইং পজিশনে রেডি থাকতে বললো। আমাদের দিকে টর্চ লাইট মেরে মেরে উর্দূতে বকাবকি করতে থাকলো। ইতিমধ্যে ঈশ্বরদী থেকে সিরাজগঞ্জ গামী পাকি হানাদার বাহী ট্রেন এলো। পাকি হানাদারেরা সিগন্যাল দিল। ষ্টেশনে ট্রেনটি থামিয়ে দিল। ট্রেনের পাকি হানাদারেরা অস্ত্র তাক করা অবস্থায় নেমে আমাদেরকে খুঁজতে থাকলো। আমাদের মাইনটি ব্রাষ্ট করা সম্ভব হলো না। পাকি হানাদারদের সংখ্যাধিক্যতায় ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কমান্ডার স্যার উইথড্র হওয়ার কমান্ড করলেন। পরের দিন সিরাজগঞ্জ থেকে পাকি হানাদার ও রাজাকারেরা এসে কালিয়া হরিপুরের অনেক বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং গ্রামের অনেককে ধরে নির্যাতন করেছিল। আমরা কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে ব্রীজ সংলগ্ন রাজাকার ক্যাম্প এ্যাম্বুস থেকে ফিরে এসে তামাই গ্রামে কমান্ডার স্যারের বাড়িতে একত্রিত হই। কমান্ডার স্যারের মা আমাদের জন্য খাবার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। আমরা কমান্ডার স্যারের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর আমাদের সবাইকে বসিয়ে কমান্ডার স্যার ব্রিফ করলেন। স্থানীয় ভাবে ট্রেনিং দেওয়া বেশ কিছু যুবককে আমাদের গ্রুপে ভর্তি করা হয়েছিল। এত বড় প্লাটুন এক শেল্টারে শেল্টার নেওয়া সমস্যা। তাই ডেপুটি কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগ্চী কে কমান্ডার করে আর একটি গ্রুপ করে দিলেন।

কল্যাণপুর যুদ্ধ: কল্যাণপুর সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার একটি গ্রাম। এই যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন ডেপুটি কমান্ডার (কমান্ডার হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত) বাবু রবীন্দ্র নাথ বাগ্চী। কমান্ডার স্যারের নির্দেশে আমরা ১১ জন রবীন্দ্র নাথ বাগ্চীর কমান্ডনাধীন হয়ে হেটে ভোরে বেলকুচি উপজেলার কল্যাণপুর নামক গ্রামে এক বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। ১১ নভেম্বর ’৭১ বাড়ির মালিক আমাদের সকালের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। আমরা সারারাত নিদ্রাহীন থেকেও হেটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সকালের খাবার খেয়ে প্রকাশ্যে পিটি, প্যারেড করলাম। অস্ত্র পরিষ্কার করলাম। অস্ত্রে ফুলতুরী মারলাম। একজন করে ডিউটি করতে থাকলাম। অন্যন্যরা ঘুম বা রেষ্টে থাকলাম। কল্যানপুর একটি নিভৃত গ্রাম। আমাদের ধারনা ছিল এই গ্রামে পাকি হানাদার ও রাজাকার আসবে না। বেলা ১০টার দিকে সেন্ট্রিরত সহযোদ্ধা রতনকুমার দাস দৌড়ে এসে জানালেন আমদের কে ধরার জন্য বেলকুচি থানা থেকে কয়েকজন পাকি হানাদার মিলে শিয়া ও রাজাকার আসছে। বওড়া গ্রামের মধ্য দিয়ে কল্যানপুরের দিকে আসছে। দুইজন পাকিস্তানি দালাল গামছা দিয়ে মুখ বেধে নিয়ে হানাদার ও রাজাকারদের পথ চিনিয়ে নিয়ে আসছে। দূর থেকে অনুমান হলো এই দলে ৫জন মিলেশিয়া ও ৮জন রাজাকার আছে। আমাদের কমান্ডার যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমরা কল্যানপুরে রাস্তার ধারে বাংকারের মত বাঁশ ঝাড়ের মধ্যে পজিশন নিলাম। বাঁশ ঝাড়ের সামনে দিয়ে চলা রাস্তা ধরে ওরা আসছিল।

আমাদের রেঞ্জের মধ্যে আসার সাথে সাথে আমাদের কমান্ডার রবীন্দ্রনাথ বাগ্চী কমান্ড ও ফায়ার ওপেন করলেন। এক লাফে হানাদারেরা রাস্তার উত্তর পার্শ্বে পজিশন নিল। ওরাও আমাদের লক্ষ্য করে গুলি চালালো। আমরাও একযোগে বৃষ্টির মতো গুলি ছাড়তে থাকলাম। গোলাগুলির শব্দ পেয়ে আশে পাশে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ আমাদেরকে সহযোগীতা করার জন্য এগিয়ে এলেন। এক ঘণ্টার অধিক সময় সম্মুখ যুদ্ধ চললো। তারপর পাকি হানাদারেরা লাশ নিয়ে পিছিয়ে গেল। এই যুদ্ধে ১জন মিলেশিয়া ও ১জন রাজাকার মারা গিয়েছিল। যুদ্ধে জয়ী হয়ে আমরা বিজয় উল্লাস করলাম। সকল স্তরের মানুষের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হলো। এক বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করলাম তারপর হেটে দৌলতপুর গ্রামের সহযোদ্ধা মোঃ শামসুল হকের বাড়িতে শেল্টার নিলাম। কয়েক দিন দৌলতপুর, তেঞাশিয়া, খুকনী, বাজিয়ারপাড়া, দরগার চর ও অন্যান্য গ্রামে থাকতে থাকলাম।

ধীতপুর যুদ্ধ: ধীতপুর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার একটি গ্রাম। এই যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন ডেপুটি কমান্ডার (কমান্ডার হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত) বাবু রবীন্দ্র নাথ বাগ্চী। ২৩ নভেম্বর’ ৭১ আমরা শেল্টার নিলাম সৈয়দপুর গ্রামের কালা চক্রবর্ত্তীর বাড়িতে। ২৫ নভেম্বর’ ৭১ সংবাদ পেলাম পাকি হানাদারেরা কৈজুরী হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। টাঙ্গাইলের যুদ্ধে পাকি হানাদারেরা পরাজিত হয়ে লঞ্চে যমুনা নদী পাড় হয়ে মালিপাড়া ক্যাম্পে এসেছে। মালিপাড়া ক্যাম্প থেকে রাস্তা চিনানোর জন্য দুই জন রাজাকারকে সঙ্গে নিয়েছে। আমরা পাকি হানাদারদের আক্রমন করার জন্য ওদের পিছু নিলাম। ওরা ক্ষুদার্থ। কৈজুরী গ্রামের একজনের মুলা ক্ষেত থেকে মুলা খাওয়ার চেষ্টা করলো। ওরা হয়তো জানতো না কাচা মুলা খাওয়া যায় না। ওয়াপদা বাধ ধরে ওরা অগ্রসর হতে লাগলো। আমরাও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অস্ত্র তাক করে ওদের পিছু পিছু হাটতে থাকলাম। ওরা ক্রোধী ধীতপুর নামক স্থানে গিয়ে ওরা আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করে গুলি করলো। আমরা জাম্প করে ওয়াপদা বাধের পশ্চিম দিকে পজিশন নিলাম। ওদের উপর গুলি ছুড়লাম। ওরা ওয়াপদা বাধের পূর্ব পার্শ্বে পজিশন নিল। এক ঘণ্টা ব্যাপি গুলি পাল্টা গুলি চলতে থাকলো। গুলির শব্দে শাহজাদপুর ও বেড়ার বিভিন্ন স্থানে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা দল আমাদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে এলো। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো।

হানাদারেরা গুলি করা বন্ধ করলো। আমরাও অন্ধকারে গুলি করা বন্ধ করলাম। সারারাত আমরা পজিশন অবস্থায় ছিলাম। রাতে ধীতপুর সার গুদাম থেকে মাঝে মাঝে ২/১ টা করে গুলি আসছিল। ওদের গুলির প্রেক্ষিতে আমরা ২/১ টা করে গুলি করছিলাম। ভোরে ফর্সা হলে আমাদের কমান্ডার বরীন্দ্রনাথ বাগ্চী ও বেড়ার কমান্ডার জনাব আমির হোসেন ক্রোলিং করে ধীতপুর সার গুদামে এগিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখতে পেলেন পাকিহানাদারেরা পালিয়ে গেছে। দুজন রাজাকার সারারাত কভারিং ফায়ার করেছে। কমান্ড করে রাজাকার দুজনকে স্যারেন্ডার করালেন। রাজাকার দুজনের নাম ছিল লতিফ ও কালাম। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে নেওয়া হলো। তাদের কাছ থেকে জানা গেল রাত ১১ টার দিকে হানাদারেরা ক্রোলিং করে নিরাপদ দুরত্বে এসে হেঁটে বেড়া নদী পার হয়ে ঢাকা যাবার উদ্দেশ্যে পালিয়েছে। পরে জানা গেল। পাকি হানাদারেরা বেড়া ঘাটে গিয়ে ভেড়াকোলা গ্রামের হলদারের নৌকায় নদী পাড় হয়ে নগরবাড়ি ঘাট হয়ে ঢাকা যাবার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। ধীতপুরের যুদ্ধে বেড়ার আমির হোসেনের গ্রুপের মোঃ আব্দুল খালেক শহীদ হয়েছেন। দুজন পথচারী গোলাগুলির সময়ে গুলি লেগে মারা গিয়েছেন। ধীতপুর যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আমরা জামিরতা হাই স্কুলে ক্যাম্প করে অবস্থান নিয়েছিলাম। জাতির পিতার নির্দেশে অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়িতে এসে লেখা-পড়া শুরু করলাম।

(ডিএস/এসপি/জানুয়ারি ১৫, ২০২২)

পাঠকের মতামত:

২৯ মে ২০২২

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test