E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Technomedia Limited
Mobile Version

শিরোনাম:

৯ ডিসেম্বর নেত্রকোণা মুক্ত দিবস 

‘মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাকবাহিনী ময়মনসিংহের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে’

২০২২ ডিসেম্বর ০৬ ১৮:৪০:৪৮
‘মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাকবাহিনী ময়মনসিংহের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে’

তুষার বাবু, নেত্রকোণা : ডিসেম্বরের ৯ তারিখ নেত্রকোণা মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের এইদিনে পাক-হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে শত্রুমুক্ত হয় তৎকালীন মহাকুমা নেত্রকোনা। এই প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও ৯ ডিসেম্বর পালিত হচ্ছে নেত্রকোণা মুক্ত দিবস। এ উপলক্ষে জেলায় দিনব্যাপী বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রম রয়েছে। ৩ ডিসেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর জেলার দূর্গাপুর উপজেলায় লাগাতার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ডিসেম্বরের ৭ তারিখ থেকে পাক-হানাদার বাহিনী প্রায় প্রতিটি উপজেলা থেকেই পালাতে শুরু করে।

ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই তৎকালীন নেত্রকোণা মহাকুমার বিভিন্ন স্থানে খন্ড খন্ড যুদ্ধ এক নাগাড়ে চলছিলো। ১ ডিসেম্বর মোহনগঞ্জ থানার বড়তলী গ্রামে পাক-হানাদার আর্মির উপর মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করেছিলেন। সে আক্রমণে ৩৫জন পাক সেনা নিহত হয়। পরদিন ২ ডিসেম্বর পাকবাহিনী বড়তলী গ্রামে অগ্নিসংযোগ করে অনেক ঘরবাড়ি ভষ্ম করে দিয়েছিলো। ৩ ডিসেম্বর ঝাঞ্জাইল বিরিশিরি রাস্তায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর একটি ট্রাকের উপর আক্রমণ করে। সে সময় ৬ জন পাকসেনা নিহত হয়।

৩ ডিসেম্বর দূর্গাপুরের বিজয়পুরে পাকসেনাদের ক্যাম্পের উপর মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে আক্রমণ করেন। সে আক্রমণ একনাগাড়ে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। সেদিন পাকবাহিনী বিজয়পুর থেকে পালিয়ে দূর্গাপুর চলে আসে। মুক্তিযোদ্দারা বিজয়পুর ক্যাম্প দখল করে নেয়। একে একে মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর বাংকারগুলোতে চার্জ করতে শুরু করেন। এক পর্যাপ্ত পাকবাহিনীর পোঁতা একটি মাইন বিস্ফোরণ ঘটে। এতে নেত্রকোণার ওসমান গণি তালুকদার গুরুতর আহত হন। ৭ ডিসেম্বর পাকবাহিনীরা দূর্গাপুর থেকে পালিয়ে যায়। স্বাধীন হয় দূর্গাপুর। ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে একে একে নেত্রকোণার সব কয়টি থানাই মুক্ত হয়ে যায়। পাকবাহিনীরা অনান্য থানা থেকে সরে এসে নেত্রকোণা শহরে আশ্রয় নেয়। নেত্রকোণাকে মুক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধারা মরিয়া হয়ে ওঠেন। ৮ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন চৌহানের পরামর্শে মুক্তিযোদ্ধারা নেত্রকোনা শহর আক্রমনের পরিকল্পনা গ্রহন করে।

সেদিনের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদর উপজেলার সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আইয়ূব আলী জানান, "সেদিন আমরা তিনটি দলে ভাগ হয়ে নেত্রকোণায় শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করি। সদরের রাজুরবাজার অঞ্চল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্ব দেন বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আশরাফ আলী খান খসরু। জেলার আটপাড়া থানা অঞ্চল ৮ তারিখেই হানাদার মুক্ত হওয়ায় সেখানকার মুক্তিযোদ্ধারাও যোগদেন শহরের মালনী রোড এলাকা থেকে। তাদের নেতৃত্ব দেন খাঁ'র বাংলা এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারুল হক খান। এই দুই দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমাগত আক্রমণে পাক বাহিনী বর্তমান বি.এ.ডি.সি ফার্ম এলাকা দিয়ে ময়মনসিংহের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। সে সময় ফার্মের ভেতর আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা প্রায় শ'তিনেক মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাকবাহিনী শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়। এই যুদ্ধের পরই নেত্রকোণা সর্বাত্মক ভাবে শত্রুমুক্ত হয়ে পরে। বি.এ.ডি.সি ফার্ম এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্ব দেন মুক্তিযুদ্ধ কালীন 'টাইগার কোম্পানি'র প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সিদ্দিক আহমেদ।"

এই যুদ্ধে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা আবু খাঁ, আব্দুস সাত্তার ও আব্দুর রশিদ। মারাত্মক আহত হয়েছিলেন নেতৃত্বদানকারী মুক্তিযোদ্ধা আবু সিদ্দিক আহমেদ। ৮ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে পাকবাহিনী পূর্বধলা থেকে পালিয়ে যায়। ৯ ডিসেম্বর বেলা ১১ টায় গৌরীপুর থেকে ট্রেনযোগে ময়মনসিংহ থেকে পাকবাহিনী পুনরায় প্রবেশের চেষ্টা করলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধে ট্রেনটি পূর্বধলা বাজার সংলগ্ন ব্রীজটি অতিক্রম করতে পারেনি। সেখান থেকে পালিয়ে যাবার সময় পাকবাহিনী 'পাবই রেলব্রীজ'টি ভেঙে দিয়ে যায়। ৯ ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত নেত্রকোণার বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়া পাক- আর্মিরা সড়কপথে পালিয়ে যাচ্ছিলো। সেসময় চট্টগ্রামের পটিয়ার মুক্তিযোদ্ধা সুধীর বড়ুয়া সন্ধ্যায় পোশাকবিহীন অবস্থায় পলায়নপর পাক আর্মির একটি গাড়িকে সহযোদ্ধাদের মনে করে উল্লাসিত হয়ে হাত মেলাতে গেলে পাক বাহিনী তাকে গুলি করে হত্যা করে। শহীদ সুধীর বড়ুয়াকে শ্যামগঞ্জ রেলওয়ে মাঠের উত্তর পাশে সমাহিত করা হয়। জানামতে তিনিই নেত্রকোণা জেলায় মুক্তিযুদ্ধে সর্বশেষ শহীদ।

তথ্যসূত্র গবেষণায় দেখা গেছে, নেত্রকোণায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটা অনন্য। নেত্রকোণার স্বাধীনচেতা জনগোষ্ঠী ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের সারাংশ শুনেই অনুধাবণ করতে পেরেছিলেন স্বাধীনতার জন্য তাদের যুদ্ধে যেতে হবে। এ ছাড়াও 'বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সে'র বিভিন্ন সদস্যের বিভিন্ন বীর সদস্যদের জন্মভূমি হওয়ায় নেত্রকোণায় মুক্তিযুদ্ধোদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় অনেক দ্রুতই। নেত্রকোণা শহর সহ থানা ও গ্রামগুলোর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবান মানুষগুলোও নীতি-নির্ধারণের কাজ শুরু করে দেন। ৩মার্চ ছাত্রলীগের মিছিল ছাড়াও ২৩ মার্চ নেত্রকোণা শহরের মোক্তারপাড়া মাঠে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে ভষ্ম করা হয় এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয়।

২৫ মার্চ কালোরাত্রিতে ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনের প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিজ দায়িত্বে নিয়ে পাক বাহিনীর সাথে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ শুরু করা প্রথম প্রতিরোধযোদ্ধাদের মধ্যে অন্যতম নেত্রকোণার সূর্য সন্তান তৎকালীন পুলিশ বাহিনীর বাঙালী সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা রইছ উদ্দিন খান। ২৬ মার্চ সকাল নাগাদ ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন পাক- হানাদার বাহিনীর দখলে চলে গেলে স্বাধীনতার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে তিনি রাজারবাগ ত্যাগ করে মার্চ মাসেই পায়ে হেঁটে নেত্রকোণায় চলে আসেন। পরবর্তীতে ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক কর্ণেল আবু তাহের (বীর উত্তম) অধীনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান সহ বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।

২৭ মার্চ নেত্রকোণা আওয়ামী লীগ অফিসে "নেত্রকোণা সংগ্রাম কমিটি" গঠিত হয়। শহরের জনতা হোটেল, সমতা বেকারি, চৌধুরী স্টল,জলযোগ রেস্তোরাঁ ও কলেজ ক্যান্টিন থেকে পুলিশ প্রশাসনকে স্থানীয় যুবকরা আটক করে ফেলে। সেদিনই পুলিশ প্রশাসনের অস্ত্রাগার থেকে স্থানীয় জনতা ৩০০'র অধিক রাইফেল সংগ্রহ করে। নেত্রকোণা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়টি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী যুদ্ধশিবির হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

অপরদিকে মার্চ মাসের শেষার্ধেই জারিয়া হাইস্কুল মাঠে মনির উদ্দিন সরকারের নেতৃত্বেও একটি প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালিত হচ্ছিল। দূর্গাপুর সীমান্ত থেকে ইপিআর এর সুবেদার আজিজুল হক ৫ টি রাইফেল নিয়ে এসে প্রায় ২'শতাধিক যুবককে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেন। এপ্রিল মাসেন প্রথম পক্ষকাল পর্যন্ত সে প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালিত হয়েছিলো। ২৩ এপ্রিল সকাল ৯টায় নেত্রকোণা শহরের উপর পাকিস্তানিদেন দুটি সুরমা রং'এর যুদ্ধবিমান গুলি বর্ষণ করে চলে যায়। এতে নেত্রকোণার সাধারণ মানুষ সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। প্রশিক্ষণ শিবিরের ইপিআর সদস্যরা বিষয়টি অনুধাবন করে বিমান বিধ্বংসী অস্ত্র ছাড়াই রাইফেল দিয়ে বিমানের দিকে গুলি ছুঁড়ে সাধারণ মানুষকে সাহসের সঞ্চার করতে থাকেন। ২৯ এপ্রিল সর্বপ্রথম নেত্রকোণা শহর ও পূর্বধলা থানায়, এবং পরদিন দূর্গাপুর সহ খালিয়াজুড়ি ব্যাতিত সকল থানা সদরে তাদের প্রবেশ কার্য সমাপ্ত ও সেতু সমূহের প্বার্শে বাংকার ও ক্যাম্প স্থাপন করে। শুরু হয় নেত্রকোণায় পাক হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি ও সম্মুখ যুদ্ধ।

নেত্রকোণার রণাঙ্গনে তৎকালীন মহাকুমার ৫০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, নেত্রকোণার মুক্তিযোদ্ধারা শুধুমাত্র নেত্রকোণাতেই যুদ্ধ করে শহীদ হননি। দেশের বিভিন্ন জেলার রণাঙ্গনে নেত্রকোণার মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণার প্রায় তিন হাজার মুক্তিযোদ্ধা ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সেসকল মুক্তিযোদ্ধাদের কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের ইতিহাস অনেকেরই অজানা। এ জেলার অসংখ্য ব্যাক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য বাড়ি ত্যাগ করেছেন। যুদ্ধ শেষে অনেকেরই বাড়ি ফেরা হয়নি। কোথায় প্রশিক্ষণ নিয়ে কোন যুদ্ধে অংশ নিয়ে তাঁরা জীবন দিয়েছেন তার খবর আজো অজানা। অনেকে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে প্রবেশের পূর্বেই পাকবাহিনী কিঙবা রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

নেত্রকোণার খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ

বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব কর্ণেল আবু-তাহের, বীর উত্তম। বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব শাখাওয়াত হোসেন বাহার, বীর প্রতিক। বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, বীর প্রতিক। বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আবু ইউসুফ, বীর প্রতিক। বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব খলিলুর রহমান খান খসরু, বীর প্রতিক। বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব হেলালুজ্জামান (পান্না), বীর প্রতিক। বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মোঃ মোসলেহ উদ্দিন, বীর প্রতিক।

তথ্যসূত্র গবেষণায় মতে এ জেলায় মোট বধ্যভূমির সংখ্যা অন্ততঃ ১৭টি। এর মাঝে সাতপাই, মোক্তাপাড়া, ত্রিমোহনী, পাটপট্টি সহ দূর্গাপুর, পূর্বধলা সহ আরও অনেক গুলো বধ্যভূমিতে প্রাণ হারিয়েছেন অগণিত নিরস্ত্র মানুষ। নেত্রকোনার সকল মানুষ তাদের সকলকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বরণ করেন।

ছবিঃ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধে ২৫ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইনে অংশগ্রহণকারী পুলিশ, নেত্রকোণা জেলার সূর্য সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব রইছ উদ্দিন খান।

(টিব/এসপি/ডিসেম্বর ০৬, ২০২২)

পাঠকের মতামত:

২৯ জানুয়ারি ২০২৩

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test