E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Walton New
Mobile Version

মরা নদের গল্প

২০২৪ মে ১৯ ১৫:০৪:২৫
মরা নদের গল্প

শেখ ইমন, শৈলকুপা : ‘এইখানে এক নদী ছিল, জানল না তো কেউ’। কণ্ঠশিল্পী পথিক নবীর এই গান শোনেননি এমন মানুষ এদেশে কমই আছেন। গানটি কাল্পনিক অর্থে গেয়ে থাকলেও কণ্ঠশিল্পীর কল্পনাই যেন সত্যি হয়েছে ঝিনাইদহের শৈলকুপার একসময়ের খরস্রোতা ‘কুমার নদে’। পানির অভাবে শুকিয়ে সুবিশাল নদ এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে একসময় বিশাল নদ ছিল। অথচ নিকট অতীতেও সারা বছর না হলেও দু-চার মাস পানি বুকে ধারণ করতো এই নদ। সেসব এখন শুধুই লেখার গল্প। এখনকার গল্প হলো- নদ আছে, পানি নেই। তবে কথায় আছে, নদ-নদী মরলেও তার রেখা থাকে। সেই রেখাচিত্রটি আছে বৈকি।

কোথায় হাঁটুপানি, আবার কোথাও বুকপানি। তার উপর আবার কচুরীপানার আস্তর। বেশিরভাগ স্থানে খননের অভাবে পলি জমে ভরাট হয়েছে তলদেশ। সেই ভরাট নদীর বুকে চাষাবাদ করছে মানুষ। যতদূর চোখ যায় শুধুই বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত। মাঝ দিয়ে কিছুটা পানিপ্রবাহ। কোথাও বোনা হয়েছে পাট। শুধু তা-ই নয়, গাড়াগঞ্জ এলাকায় নদের জায়গায় করা হয়েছে পুকুর-ইটভাটাও। কে বলবে, কয়েক বছর আগেও এখান দিয়েই বয়ে যেত ¯্রােতঃস্বিনী নদ কুমার। পানি শূন্যতার সুযোগে স্থানীয়রা বিভিন্নভাবে নদ দখল করছেন। ফলে বাঁধাগ্রস্থ হয়েছে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ।

কুমার নদে মাছ ধরে একসময় শৈলকুপা শহরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায়ের শত শত মানুষ নদের মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। তবে নদের নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় একদিকে হারিয়ে যেতে বসেছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। অন্যদিকে জীবিকা হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে জেলে সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ।

জানা যায়, কুমার নদটি চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার ডাউকি ইউনিয়নের প্রবহমান মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। এরপর মাগুরা সদর উপজেলার পৌরসভা পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে নবগঙ্গা নদীতে পতিত হয়েছে। ১৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কুমার নদের পানির প্রধান উৎস ছিল মাথাভাঙ্গা। চুয়াডাঙ্গা জেলার হাটবোয়ালিয়াতে কুমারের উৎসমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপরও কুমার নদ কালী,ডাকুয়া ও সাগরখালী নদীর মাধ্যমে প্রবাহ পেত। কালী ও ডাকুয়া পানি পেত গড়াই থেকে। কিন্তু জি কে প্রকল্প বাস্তবায়নকালে এ দুটি নদীর উৎসমুখও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে মরে গেছে এই কুমার নদ।

একসময় এই কুমার নদে লঞ্চ, স্টিমারসহ নানান ধরনের নৌযান চলাচল করতো। তখন এটাই ছিল এই এলাকার মানুষের কাছে প্রধান নৌরুট। সেই কুমার নদটিই এখন বিলুপ্তির দারপ্রান্তে।

নাসির মিয়া নামে এক বৃদ্ধ জানান, একসময় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল এই নদ। নৌকায় করে মানুষ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতো। নানারকম পণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে তা হারিয়ে গেছে। নদও ছোট হয়ে গেছে। নদ বললে ভ’ল হবে,দেখলে মনে হয় মরা খাল। কোথাও কোথাও পানি শুকিয়ে হাটুপানিতে ঠেকেছে। দখল,দুষণ,আর পলি জমে ভরাট হয়েছে তলদেশ। নদটি পু:খনন করার দাবিও জানান এই বৃদ্ধ।

দামুকদিয়া গ্রামের জেলে চঞ্চল বলেন,কুমার নদে এখন আর মাছও পাওয়া যায় না, কারণ নদীতে পানি নেই। আমাদের দাবি, নদ খনন ও দুই তীরে যারা অবৈধভাবে স্থাপনা গড়ে তুলেছে তাদের উচ্ছেদ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হোক।

কৃষক মন্নু মোল্লা বলেন, কুমার নদে পানি না থাকায় এলাকার কৃষকরা নদের বুকজুড়ে ফসলের আবাদ করেন। গবাদি পশুর চারণ ক্ষেত্রও বলা যায়। পানি না থাকায় নদের বুকে অগভীর নলক’প বসিয়ে চলে ধান চাষ।

তৌহিদুল ইসলাম (কুটি) বলেন, পানি না থাকায় এ নদ তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। সেচসহ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভ’গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করায় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এখনই সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করে পুনঃখনন না করলে কুমার নদ তার ঐতিহ্য হারিয়ে মরুকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতে পারে।

ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম জানান,‘খনন না করায় কুমার নদে পানি প্রবাহ থাকছে না। এমন অবস্থা বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। ইতোমধ্যে নদ-নদী খননের ব্যাপারে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। বাজেট আসলেই খননকাজ শুরু করা হবে।

(এসই/এএস/মে ১৯, ২০২৪)

পাঠকের মতামত:

২৫ জুন ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test