E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

শিরোনাম:

জন্মদিনে পংকজ ভট্টাচার্য্যকে অভিনন্দন

২০২০ আগস্ট ০৭ ২২:৫৯:০৩
জন্মদিনে পংকজ ভট্টাচার্য্যকে অভিনন্দন

রণেশ মৈত্র


১৯৭২ সালে স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রথম জাতীয় সম্মেলনে যখন তরুণ পংকজ ভট্টাচার্যের নাম দেশের তৎকালীন দ্বিতীয় বৃহত্তম দল বাংলাদেশ ন্যানাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক পদে প্রস্তাবিত হয়, তখন অজান্তেই স্বত:স্ফুর্ত হাত তালি দিয়ে প্রস্তাবটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলাম। কিন্তু দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা তখনও তৈরী হয় নি। সাক্ষাত পরিচয়ও না।

তবু কেন সমর্থন দিয়েছিলাম? কারণ বিপ্লবী ছাত্র নেতা, তাত্ত্বিক ও বাস্তব কাজে তৎকালীন বৃহৎ ছাত্র সংগঠনকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নকে (অগ্নিঝরা ষাটের দশকে) ঐক্যবদ্ধ রাখার ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা সম্পর্কে জানতাম এবং বয়োকনিষ্ঠ হওয়া সত্বেও, ঐ কারণে তাঁর প্রতি নীরব শ্রদ্ধা মনে মনে পোষণ করতাম। একারণেই পংকজ ভট্টাচার্য্যরে নাম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রস্তাবিত হওয়ার সাথে সাথেই স্বত:স্ফুর্তভাবে করতালি দিয়েছিলাম। এই পদে তিনি একটানা ২১ বছর ধরে সাফল্যের সাথে অধিষ্ঠিত থাকেন।

ঠিক কবে কোন উপলক্ষ্যে কোথায় পংকজ ভট্টাজার্য্যরে সাথে সরাসরি আলাপ হয়েছিল-তা আজও স্মরণ করতে পারছি না। তবে যতদূর মনে পড়ে, ১৯৭৭-৭৮ সালের কোন একদিন হঠাৎ এক লম্বা চিঠি পেলাম যাতে তখনকার ন্যাপের অভ্যন্তরে সৃষ্ট জটিল সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য মতিয়া চৌধুরীসহ তিনি পাবনা আসতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। সাথে সাথে সম্মতি জানাই এবং কয়েকদিনের মধ্যেই দু’জন পাবনা আসেন। তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম সমমনা সাংবাদিক বন্ধু আনোয়ারুল হকের বাসায়।

দিনভর আলাপ আলোচনার পর একদিকে যেমন সকল বিষয়ে তাঁদের সাথে একমত হলাম-তেমনই ব্যক্তিগত নৈকট্যেরও সৃষ্টি হলো। সেই নৈকট্য আজ দীর্ঘ চার দশক ধরে অব্যাহত আছে। শুধু তাই নয়, তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে আরও মজবুত হয়েছে। এর প্রধান কারণ রাজনৈতিক। জাতীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে দফায় দফায় বিভক্তি রচিত হলেও আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিরোধে তৎপর থেকেছি যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সে চেষ্টা পুরোপুরি ফলবতী হয় নি। তবে সেই ঐক্য প্রচেষ্টা আজও আমরা অব্যাহত রেখেছি। পংকজ ভট্টাচার্য্য এই ঐক্য প্রচেষ্টার নায়ক। বিশ্বাস করি, শোষণমুক্ত সাম্প্রদায়িকতামুক্ত দেশ গঠনের ব্রত নিয়ে ১৯৫৭ সালে জুলাইতে যারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমগ্র পাকিস্তানে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলাম-যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম সকল সংকীর্ণতাকে দূরে ঠেলে সেই প্রেরণায় উৎসাহী সবাই ২০২০ সালের মধ্যেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাম আন্দোলনের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবো।

আমরা তো ১৯৫৭ সালেরও আগে ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠনের মধ্যে দিয়ে ঐ মন্ত্রে প্রথম দীক্ষিত হয়েছিলাম। মন্ত্রটি আজ প্রায় অর্ধশত বছর ধরেই সযতনে লালন করে চলেছি। জানি, ন্যাপ এখনও তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। যেমন, ঐক্যন্যাপ, ন্যাপ (মো) ও গণতন্ত্রী পার্টি। কিন্তু তিনটি দলেরই নীতি আদর্শ আজও অভিন্ন। তাই বিশ্বাস করি, তিনটি সংগঠন ও নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা সারা দেশের হাজার হাজার ন্যাপ কর্মী যে মুহুর্তে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এক সংগঠনে পরিণত হবো, সেই মহুর্ত থেকেই এ দেশের পুনরায় প্রগতির ধারা অসাম্প্রদায়িকতার ধারা, সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা প্রাণবন্তু হয়ে উঠবে, বহু মানুষের মনে উৎসাহ জাগাবে এবং তার কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের অপর সকল বাম ও উদারপন্থী গণতান্ত্রিক শক্তিও ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের রাজনীতিতে এবং ব্যাপক জনগণের মধ্যে অনুকূল প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে বলে বিশ্বাস করি।

পংকজ ভট্টাচার্য্য রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নিয়েছেন ১৯৩৯ সালে বিপ্লবী জেলা চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে। তাই ছোটবেলা থেকেই তিনি বিপ্লবী রাজনীতির কাছাকাছি চলে আসেন। যৌবনের শুরুতে রাজনীতির কারণে স্কুল থেকে বহিস্কৃত হয়ে (চট্টগ্রাম কলেজিয়ে স্কুল) ভর্তি হন চট্টগ্রাম মুসলিম স্কুলে। ১৯৫৭ সালে, আইউবী শাসনামলে, যখন সকল মৌলিক অধিকার সামরিক আইনে বাতিল ও ছাত্র-রাজনৈতিক দলগুলি নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার ফলে প্রকাশ্য রাজনীতি ও সংগঠনের কাজ দুরুহ হয়ে পড়েছিল। তাই গোপনেই সব কাজ করতে হতো সেই কঠিন সময়ে তিনি যোগ দেন পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র ইউনিয়নে। ১৯৬২ সালে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৩ তে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রইউনিয়নের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৪-৬৫ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কার্য্যকরী সভাপতির কঠিন দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৬ সালে পংকজ ভট্টাচার্য্য ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। তার আগেই তিনি গোপন কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন ১৯৬০ সালে। ১৯৬৭ সালে তিনি স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারারুদ্ধ হন। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ অভ্যুত্থানেও তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিষ্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠনেও উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন ঐ বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার। পংকজ ভট্টাচার্য ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর কাছে ন্যাপের পক্ষ থেকে অস্ত্র সর্ম্পন করেন।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে মার্কিন সাম্প্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রে ও সি.পি.এস.ইউ এর কিছু ভুল নীতির কারণে সমাজতন্ত্র এক বিপর্য্যয়ের মুখে পড়ে। পরিণতিতে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের বিপর্য্যয় ঘটে। তবে কিউবা, ভিয়েতনাম সহ কতিপয় রাষ্ট্র আজও সমাজতন্ত্র ধরে রেখেছে যার জন্যে কিউবার মহান নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো এবং ভিয়েতনামের বিপ্লবী জননেতা হো চি মিন ও তাঁদের নেতৃত্বাধীন কমিউনিষ্ট পার্টি বিশ্বে নতুন ইতিহাস স্রষ্টা হিসেবে সম্মানিত।

সোভিয়েতের বিপর্য্যয়ের পর পৃথিবীব্যাপী বাম সংগঠনগুলি নানা ধরণের ভাঙ্গনের শিকার হয়। বাংলাদেশ এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিও তার ব্যতিক্রম নয়। বিষয়টি শুধুমাত্র দুঃখজনক তাই নয়-এর ফলে আজ বাংলাদেশের সকল বামশক্তিই এতটাই দুর্বল হয়েছে যে আমরা আসলে যেন জনগণের দৃষ্টির আন্তরালে চলেগিয়েছি। এক ভয়াবহ শূন্যতারও সৃষ্টি হয়েছে। এর সঠিক এবং বাস্তব উপলব্ধি নিয়ে সচেতনভাবেই ঐক্য ন্যাপ অগ্রসর হতে চাইলেও তার একক শক্তিতে তা সম্ভব নয়। সে কারণেই ন্যাপের সকল খন্ডিত অংশের ঐক্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন।

পংকজ ভট্টাচার্য এবং ঐক্য ন্যাপ অবিভাজ্য। তিনিই দলটির প্রধান স্রষ্টা এবং দলের সভাপতি। তাঁর গতিশীল নেতৃত্ব বাম আন্দোলনে বিরাজমান অনৈক্যের কারণে যথাযথভাবে কাজে লাগছে না। এ বেদনা নিয়েই তিনি চলছেন। আমরাও চলছি অমানিশার অবসান ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে।

পংকজ ভট্টাচার্য্য অত্যন্ত সরল মনের মানুষ। কর্মীদের প্রতি তাঁর আচরণ ও দরদ অসাধারণ। যে কোন সহকর্মী বিপদে পড়লে জানামাত্র ছুটে যান তার সমস্যার সাধ্যমত সমাধান করতে।

সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে তার মাধ্যমে সমাজকে প্রগতিমনা, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ও মানবিক করে গড়ে তুলতে শ্রদ্ধেয় অজয় রায়ের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ সামাজিক আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। দেশের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক অজয় রায় প্রমুখকেও তাতে সামিল করেন। দেশের যে কোন স্থানে সংখ্যালঘুরা বা আদিবাসীরা সহিংসতার শিকার হলে-গভীর আন্তরিকতা নিয়ে সমমনাদের সাথে নিয়ে, ঘটনাস্থলগুলিতে ছুটে যাওয়ার ক্ষেত্রে সামান্যতম অবহেলা তাঁর জীবনে কখনো দেখা যায় নি। ঘটনাস্থল থেকে ফিরে এসে সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠান করে ঘটনা, তার কারণ ও সমাধানের ক্ষেত্রে অভিমত তুলে ধরেন। সাম্প্রদায়িক, জাতিগত সহিংসতা, বন্যা ও নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগেও সাধ্যমত সাহায্য সংগ্রহ করে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতেও আদৌ সময়ক্ষেপন করতে তাঁকে দেখা যায় নি।

পংকজ ভট্টাচার্য্য, আমার পরিবারের সদস্যতুল্য। সন্দেহ নেই, রাজনৈতিক কারণেই। আমার মেয়ের চিকিৎসা, আমার চিকিৎসার প্রয়োজনে, ছেলে-মেয়েদের বিয়েতে খবর পেলেই ছুটে এসেছেন।

করোনার কারণে তাঁর ৮১ তম জন্মদিনে কোন বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন তাঁর সহযোদ্ধারা করতে চেয়েও করতে পারেন নি। একটি ক্ষুদ্র আয়োজন হয়েছিল। তবে তাতে আন্তরিকতা শ্রদ্ধ-ভালবাসার ঘাটতি ছিল না।

একটি বেদনাবোধও নিশ্চয় এই আনন্দক্ষণে পংকজ বাবুকে এবং তাঁর সকল সহযোদ্ধাকে তাড়িত করছে। তাঁর প্রিয় সহধর্মিনী রাখী দাস পুরোকায়স্থ বৌদি নেই। এ শূন্যতা অত্যন্ত বেদনাবহ। তবে সইবার শক্তি তাঁর আছে।
পংকজ ভট্টাচার্যকে বিপ্লবী অভিনন্দন।

লেখক : সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ।

পাঠকের মতামত:

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test