Occasion Banner
E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

লুটেরা ধনিক সৃষ্টির বিকৃত উচ্চতায় বাংলাদেশ

২০২১ জুলাই ১৪ ১৫:১৯:১৭
লুটেরা ধনিক সৃষ্টির বিকৃত উচ্চতায় বাংলাদেশ

আবীর আহাদ


আসলেই বাংলাদেশ এমন এক উচ্চতায় চলে গেছে যে, যেখানে অর্থের বিনিময়ে পদপদবী লাভ করে সেখান থেকে শত শত কোটি টাকা কামাই করা যায় ! চরম অসৎ উপায়ে এমনতর অর্থ লুটপাট করলেও তারা ধরাছোঁয়ার উর্দ্ধে থেকেই যায় ! এমন এক উচ্চতায় বাংলাদেশ অবস্থান করছে যে, ১০ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয়মূল্য ১০০ কোটি ১ কোটি টাকার মালামাল ক্রয়মূল্য ১০ কোটি একটা ৫ শত টাকার বালিশ ৬ হাজার টাকা, একটা ১০ হাজার টাকার নারকোল গাছ ৯ লক্ষ টাকা, একটা কম্পিউটার মেরামতে ২৫ লক্ষ টাকা, একটা ২০ হাজার টাকার পর্দা ৩৫ লক্ষ টাকা এমনিভাবে শত হাজার সরকারি ছোট মাঝারি বড় ও মেগা প্রকল্প এবং মালামাল ক্রয় খাতের মূল্য শত/হাজার গুণ বাড়তি ব্যয় দেখিয়ে শত শত হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে এসবের সাথে জড়িতরা রাতারাতি বিরাট ধনিকে পরিণত হচ্ছে !

কীভাবে সরকারি প্রকল্প ও কেনাকাটার মধ্যে সাগরচুরি ঘটে তা আমাদের বুঝে আসে না। কারণ প্রতিটি ছোট মাঝারি বড়ো ও মেগা প্রকল্প ও কেনাকাটা বাস্তবায়ন করার পূর্বে নিরীক্ষাকর্মে অনেকগুলো ঘাট কীভাবে পেরিয়ে আসতে হয়, তার একটা উদাহরণ এখানে দেয়া যেতে পারে।

কোনো প্রকৌশলী অথবা কোনো প্রকৌশলী সংস্থা কর্তৃক প্রস্তুতকৃত সরকারের বিভিন্ন ছোটো মাঝারি বড়ো ও মেগা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, মূল্যায়ন ও মূল্যমান যাচাই করেন পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি (NEC= National Economic Council)। এনইসি সেসব প্রকল্প যাচাই করে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করে পাঠিয়ে দেয় একনেকে (ECNEC = Executive Committee of the National Economic council)। এটাই হলো বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের অনুমোদন পদ্ধতি বলে আমার ধারণা ।

এখন সংগতভাবেই উদাহরণস্বরূপ প্রশ্ন আসে, একটি প্রল্পের মধ্যে যখন একটি বালিশের ক্রয়মূল্য আটাশ হাজার টাকা, বালিশের কভারের ক্রয়মূল্য ছাব্বিশ হাজার টাকা, একটি পর্দার ক্রয়মূল্য পঁয়ত্রিশ হাজার, একটি বইয়ের ক্রয়মূল্য পঁচাশি হাজার টাকা, একটি কম্পিউটার মেরামতের ব্যয়মূল্য পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকা, একটা এক্সরে মেশিন পাঁচ কোটি টাকা ইত্যাদি ইত্যাদি দেখানো হয়, সেগুলো কি NEC ও ECNEC এর কর্তাদের চোখে পড়ে না ?

প্রকল্পসমূহের এসব কল্পনাতীত ব্যয় ও ক্রয় মূল্য যদি এমন অসম্ভব অস্বাভাবিক মনে হয়, তাহলে সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই করার এখতিয়ার অবশ্যই এনইসি'র । চূড়ান্ত অনুমোদনের পূর্বে একনেকেরও নিশ্চয় সেটি যাচাই করা কর্তব্য । দু'টি জাতীয় কমিটির চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে ঐসব প্রকল্পের অসম্ভব অস্বাভাবিক ব্যয় ও ক্রয়মূল্য অনুমোদন লাভ করে তা আমাদের মতো নির্বোধ মানুষের পক্ষে বুঝা খুবই কঠিন । আমাদের মনে হয়, এ দু'টি জাতীয় কমিটির কর্তাব্যক্তিরা এসব প্রকল্পের পরীক্ষা নিরীক্ষা ও যাচাইকর্মে হয় অজ্ঞ, অথবা এসব কমিটিদ্বয়ের মধ্যে অবস্থানকারী কিছু কমিশনখোর প্রকল্প প্রস্তুতকারী/পরিচালক ও কোনো ঠিকাদারদের যোগসাজশে নানান ছলেকলেকৌশলে প্রকল্পগলো অনুমোদন করিয়ে নেন !

সুতরাং ছোটো মাঝারি বড়ো ও মেগা প্রকল্পের অসম্ভব অস্বাভাবিক ব্যয় ও ক্রয়মূল্যের দায়ভার থেকে এনইসি (NEC) ও একনেক (ECNEC) মুক্ত নয় । দেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে যেসব সাগর লুটের ঘটনা ঘটে চলেছে সেসবের জন্য প্রকল্প প্রস্তুতকারী, প্রকল্প পরিচালক, ঠিকাদার এবং এনইসি ও একনেক সমানভাবে দায়ী এতে কোনো সন্দেহ নেই ।

আসলেই বাংলাদেশ এমন এক উচ্চতায় অবস্থান করছে যে, যেখানে বিশ্বের মধ্যে অতি দ্রুততম সময়ে ধনিকশ্রেণীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে । এছাড়া ব্যাঙ্ক ও শেয়ারবাজার লুটসহ অন্যান্য বিভিন্ন খাত থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে । এসব প্রক্রিয়ায় বিগত বেশ কয়েকটি বছর থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়ে বিভিন্ন দেশে চলে গেছে । বিভিন্ন লুটেরা ও মাফিয়াদের লুটকৃত সেসব অর্থ আমেরিকা কানাডা লণ্ডন দুবাই অস্ট্রেলিয়া সিঙ্গাপুর মালায়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ব্যাঙ্ক ও ব্যবসাখাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে বসবাসের জন্যে রাজকীয় বেগমপাড়া ও সেকেণ্ড হোম গড়ে উঠেছে।

এসব দুর্নীতিবাজ লুটেরা ও মাফিয়াদের লুটপাটের কিছু কিছু খবর প্রকাশিত হলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা দুদক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন । অথবা বলা চলে লুটেরাদের সাথে ভাগাভাগির প্রক্রিয়ায় সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে ।

আসলেই বাংলাদেশ এমন একটি উচ্চতায় অবস্থান করছে যে, যেখানে নীতিনৈতিকতার কোনো বালাই নেই । আদর্শ নেই । চেতনা নেই । সততা ও দেশপ্রেম নেই । মেধাবী ও ত্যাগীদের মূল্য নেই । দেশটি টাউট বাটপাঢ় ধড়িবাজ ধান্দাবাজ লুটেরা রাজাকার হাইব্রিড অসৎ ও স্তাবকদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে । এমনকি অর্থের বিনিময়ে, আত্মীয়তা ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় স্বাধীনতার এতোটি বছর পরেও অমুক্তিযোদ্ধা এমনকি রাজাকাররাও মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাচ্ছে; মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকার হয়ে যাচ্ছে !

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের আলোবাতাসে বসবাস করেও স্বাধীনতাবিরোধী ও ধর্মান্ধ অপশক্তি আমাদের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিকে ইসলামবিরোধী কুফরি মতবাদ বলে প্রকাশ্যে কটূক্তিসহ জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকার অবমাননা করে চলেছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের যেন কোনো কিছু করণীয় নেই ! কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের সাথে সরকারকে দহরম মহরম করতে দেখা যায় ! দেশটি যে ক্রমান্বয়ে প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ অপশক্তির কবলে চলে যাচ্ছে, সে-বিষয়েও কারো মাথাব্যথা নেই । সবাই মনে হয় চোখ বন্ধ করে গোগ্রাসে লুটপাট ও চাটাচাটিতে বিভোর !

এমনি এক লুটেরা ধনিক সৃষ্টির বিকৃত উচ্চতায় বাংলাদেশকে নিয়ে গিয়ে যখন একশ্রেণীর বর্ণচোরা রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত ও লুটেরাগোষ্ঠীর মুখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের গালভরা বুলি শুনি, তখন লজ্জা ঘৃণা ক্ষোভ ও অপমানে মরে যেতে ইচ্ছে করে । এসব দুর্নীতিবাজ লুটেরা ও মাফিয়াদের স্বর্গসুখের জন্য আমরা আমাদের সর্বস্ব বিলিয়ে শৌর্য বীর্য ত্যাগ রক্ত ও বীরত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করে এ-দেশটাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি যা ভাবতেই দু:স্বপ্নের মতো আৎকে উঠতে হয় !

লেখক :চেয়ারম্যান, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।

পাঠকের মতামত:

৩১ জুলাই ২০২১

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test