E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

পঞ্চাশ থেকে নব্বই দশকে তরুণরা ছিল নির্লোভ-নির্ভয় দেশপ্রেমিক, বর্তমান তরুণদের মাঝে তা নেই!

২০২১ সেপ্টেম্বর ০৭ ১৪:৪৭:০২
পঞ্চাশ থেকে নব্বই দশকে তরুণরা ছিল নির্লোভ-নির্ভয় দেশপ্রেমিক, বর্তমান তরুণদের মাঝে তা নেই!

মাহাবুব রহমান দুর্জয়


“সামাজিক মূল্যবোধ তথা ধৈর্য, উদারতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃষ্টিশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ, পারস্পরিক মমতাবোধ ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলি লোপ পাওয়ার কারণেই সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়; যা বর্তমান সমাজে প্রকট”। লাখো শহিদের তাঁজাপ্রাণের বিনিময়ে অর্জিত একটি নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশ নামটির পেছনে তৎকালীন তরুণদের যে অবদান তা অনস্বীকার্য; বিশেষ করে শুধু ভাষার জন্য যে সংগ্রাম তা মূলত তৎকালীন সময়ে তরুণদের এগিয়ে আসার উচ্ছ্বাসের ঢেউয়ের বহিঃপ্রকাশ। বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা এদেশের তরুণদের হাত ধরেই জয় লাভ করেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এ দেশের ছাত্র আন্দোলন ও গণ-আন্দোলনে তরুণরাই নেতৃত্বে ছিল। আজ হতে অর্ধশতাব্দী আগে বাংলার দামাল ছেলেরা পাক হানাদার ও দোসরদের হাত থেকে দেশকে রাহুগ্রাস মুক্ত করে আমাদের উপহার দিয়েছিলেন স্বাধীন রাষ্ট্র। ইতিহাস শুধু তরুণের পক্ষে সাক্ষী-ই দেয় না, বরং গেয়ে যায় তারুণ্যের জয়গান। তাদের পদধ্বনিতে মুখরিত হয় এই বাংলা। তাদের চেতনা আজ তরুণদের মাঝে অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করছে।

তবে স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যদিয়ে বৈপ্লবিক আন্দোলনের প্রয়োজন অনেকটা ফুরিয়ে গেছে বর্তমানে; শিক্ষার অধিকার, সামাজিক অধিকার, সুস্থ রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ সব ক্ষেত্রে আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কথা ভুলেই যাচ্ছে এখনকার তরুণরা। একমাত্র নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন ছাড়া স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা তেমন কোনো আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করতে পারেনি। আজ এতকাল পর কী দেখছি আমরা? আমাদের দেশে তারুণ্যের দাপুটে অংশকে সুবিধাবাদী রাজনীতিকরা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের জন্য অন্ধকারের গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার পথ দেখাচ্ছে।

দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মোহগ্রস্ত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বেড়েছে। যুক্তিবুদ্ধির রাজনীতি ক্ষমতার রাজনীতিতে এসে নিজের গৌরব হারিয়ে ফেলে। বর্তমান রাজনীতিতে গণতন্ত্র চর্চার চেয়ে পেশীশক্তির চর্চা বেশি হচ্ছে। এ পথে তারুণ্যের একটি সরব অংশ অশুভ রাজনীতিকদের হাতিয়ারে পরিণত হতে দেখা যায়। বেশ কয়েক বছর আগেও জামায়াতে ইসলামী সমর্থক শিবির নামীয় তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রায় সারা দেশে চোরাগোপ্তা বা প্রকাশ্য মিছিল নিয়ে, বিশেষ করে পুলিশের প্রশাসনের উপর হামলে পড়েছিল। গাড়ি ভেঙেছে, আগুন দিয়েছে, মানুষ হত্যা করেছে। সে সময় যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, তাই বিচার বিঘ্নিত করার জন্য তৈরি করতে চেয়েছিল অরাজক অবস্থা। সুস্থ মেধায় ভাবলে এ দেশের বাঙালি তরুণের এ কাজ করার কথা ছিল না। অর্থ আর অস্ত্রশক্তিতে বলীয়ান করে এবং প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা আড়াল করে ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে এদের ‘বাঁচলে গাজি মরলে শহিদ’-এ দীক্ষা দিয়ে জঙ্গি ও অমানবিক বানানো হয়েছে। যে তরুণের সুন্দর আর ন্যায়ের পক্ষে থাকার কথা, দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত হওয়ার কথা তারা ঘোর অন্ধকারে নিপতিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, পাকিস্তানি হানাদারদের বাঙালি হত্যা, সম্পদ ধ্বংসকারী ও নারী ধর্ষণে সহযোগী কতিপয় মানুষকে রক্ষা করতে অধর্ম ও অমানবিক কাজ করেছে। যার যার দলীয় আদর্শ ধারণ করা বা তা বাস্তবায়নে দোষের কিছু নেই সত্য। সংকট তখনই হয়, যখন দলীয় সমর্থনে রাজনীতি চর্চার বদলে দলীয় লাঠিয়ালে পরিণত হয় তারুণ্য। এরা গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ বুঝতে চায় না। এ কারণে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিতে যুক্ত তারুণ্য সাধারণ মানুষের তো নয়ই, নিজ রাজনৈতিক দলের আদর্শেরও সৈনিক হতে পারে না। ঊনিশ-কুড়ি বছর বয়সে একটি ছেলে বা মেয়ের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার হাতে খড়ি হয়। নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সাথে সাথে নিজেও আনুষ্ঠানিক ভাবে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে যায়।

ধীরে ধীরে যত বয়স বাড়ে ততো তার শেখার ও বোঝার পরিধিও বাড়ে। একটা সময় আসবে যখন নিজে থেকেই অনুধাবন করবে সক্রিয়ভাবে সে রাজনীতি করবে কী না। এটা নির্ভর করে দেশের রাজনীতি নিয়ে তার আগ্রহের উপর। এজন্য সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক দলের অংশীদার হতে হলে কী প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হতে হবে, কি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে জ্ঞান অর্জন করতে হবে তা অনুধাবন করবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রচলিত গণতান্ত্রীক মডেলগুলো নিয়ে গবেষণা করবে, নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করবে। বিখ্যাত মণিষীদের জীবনী পড়বে। একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্ব, কর্তব্য ও ক্ষমতার ব্যপ্তি কতটুকু হবে তা নিয়ে পড়াশুনা করবে। আর এভাবেই গড়ে উঠবে টগবগে তরুণ এক নেতা ও নেতৃত্ব। আমরা পাব গণতান্ত্রীক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক দক্ষ কান্ডারী। বর্তমানে তরুণদের বয়স আঠারোর কোঠা পার হওয়ার পূর্বেই নেতা হয়ে যায় কিছু না বুঝেই। অথচ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্রের শিক্ষা শুরু হওয়ার কথাই ছিল এই বয়সে। একটি ছেলে এতো অল্প বয়সে পড়াশুনা বাদ দিয়ে বড় নেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখে, অথচ নেতা হওয়ার জন্য যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা সেটির ধারে কাছেও যায় না সে। তার অনুসারী ১৫-২০ জন ছেলে যখন তাকে বড় ভাই মানবে, সে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মিছিলে নেতৃত্ব দেবে, অন্য দলকে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া করবে, ইট পাটকেল ছুড়বে তখন নিজেকে অনেক বড় নেতা মনে হবে তার। ফলে সে কাউকে হুমকি ধামকি দিতে ভয় করবে না। ভাবখানা এমন; নেতা বলে কথা! কিসের ভয় আবার? বেশি সমস্যা দেখা দিলে লিডার তো আছেনই। এমন পরিস্থিতিতে শহরের নামকরা রাজনৈতিক গ্রুপে নাম লেখিয়ে লিডারের স্নেহধন্য হয়ে পার্টির নির্দেশমত কাজ করাই হয়ে উঠে তার প্রধান রাজনীতি। মিছিল মিটিংয়ে নেতৃত্ব দেয়া, নেতার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা, বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করার চেয়ে তার নেতা ও দলের চাওয়া পাওয়াটা তার কাছে অধিক গুরুত্ব বহন করে। তখন সে সার্ট প্যান্ট ছেড়ে দামী পাঞ্জাবী পায়জামা পরা শুরু করে। জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পায়। এলাকার এমপি/মন্ত্রির স্নেহ ধন্য হয়। তাদের যে কোন রাজনৈতিক কর্মসূচীতে সফর সঙ্গী হয়। এমপি/মন্ত্রির নাম ভাঙ্গিয়ে ধান্দা শুরু করে। বিভিন্ন সরকারী নিয়োগে বড় অংকের টাকার কমিশন খায়। ধীরে ধীরে এলাকায় জনপ্রিয় নেতার তকমা পায়। পাশাপাশি নামে বেনামে অনেক সম্পদ হয়, ব্যাংক ব্যালেন্স হয়। নিজে চেয়ারম্যান/এমপি/মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করে।

আমাদের দেশে রাজনীতিতে কালো টাকার একটি বিশাল প্রভাব আছে বহুকাল ধরেই। হাজার হাজার কোটি টাকা প্রতিবছর এ প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। বড় নেতারা এসব কালো টাকার একটি বড় অংশ নিজেদের আখের গোছানোর জন্য, এমপি/মন্ত্রি হওয়ার জন্য ছাত্র নেতাদের পেছনে খরছ করেন। বিভিন্ন গ্রুপ লিডারকে ডোনেশন দেন যাতে প্রয়োজনের সময় তার সাপোর্ট পাওয়া যায়। যে ছাত্র নেতার পেছনে যত বেশি কর্মী থাকে রাজনীতির ময়দানে তার ফায়দা ততো বেশি হয়। শুনা যায় অনেক সিনিয়র নেতা নিজ এলাকায় পছন্দের ছাত্র নেতাকে পদায়ন করতে প্রয়োজনে লাখ লাখ টাকা খরছ করেন। মামলা-হামলা থেকে রক্ষা করেন। বর্তমোনে আমাদের দেশের তরুণরা পাওয়ার পলিটিক্সের স্বীকার। ছাত্ররা ভুল রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বেকারত্ব। বিশেষ করে একটি ছেলের বয়স যখন সতের-আঠারো বছর হয় তখন তার চলাফেরা করার ক্ষেত্রটি আগের চেয়ে বড় হয়, নিজস্ব একটি জগৎ গড়ে উঠে তার। শারিরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়। বন্ধু-বান্ধবের সাথে মেলামেশা করার অবারিত সুযোগ পায়। ধীরে ধীরে পরিবারের গন্ডি পেরিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে ছেলেটি। চোখে নতুন স্বপ্ন, নতুন উদ্দীপনা দেখা দেয়। এ সময় তার পকেট মানি আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পরিবারও তাকে পূর্ণ সাপোর্ট দিতে পারে না। একরাশ হতাশা ছেলেটিকে ঘিরে রাখে। এসময় অনেক ছেলে পলিটিক্সে নাম লেখায়, নেতার শুভদৃষ্টি পাওয়ার চেষ্টা করে।

অনেকে আবার মাদক চোরাচালানীতে জড়িয়ে পড়ে, কেউ কেউ নিজেও ইয়াবা/ফেন্সিডিলে আসক্ত হয়। উন্নত দেশগুলোতে দেখেছি ষোল বছর বয়স হলেই ছেলে-মেয়েরা পার্ট টাইম কাজ করে। আবার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন হলিডে থাকে তখন ফুলটাইম কাজের সুযোগ পায়। পকেট মানির জন্য তাদেরকে বাবা-মায়ের উপর নির্ভর করতে হয় না। প্রয়োজনে বাবা-মাকেও সহযোগিতা করে তারা। সরকারও দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলো এমনভাবে সুষ্ঠু পরিকল্পনায় গড়ে তুলেছে যাতে তরুণ সমাজ কাজের সুন্দর পরিবেশ পায়, দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পায়। ফলে তাদের শিক্ষা অর্জনটি হয় আনন্দময়। সরকার তরুণদের মানসিকভাবে চাঙা রাখতে অনেক সুযোগ-সুবিধাও গড়ে তুলেছে। এসব দেশগুলোর তরুণরা রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায় না, রাষ্ট্রকে নিয়েও তাদের হতাশা নেই। সময় পেলে তরুণ ও যুবকরা পছন্দমতো খেলাধুলা করে, স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখে। বিভিন্ন বিনোদনমূলক ইভেন্টে অংশ গ্রহণ করে। হলিডেতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ায়। সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের ইচ্ছার উপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেয় না। সে নিজেই বেছে নেয় কী করতে চায়? কিভাবে জীবন পরিচালনা করবে? এসব তরুণ ও যুবকরা কখনো রাষ্ট্র বিরোধী কোন কাজে জড়ায় না। এজন্য রাষ্ট্র ও তাদের ইচ্ছাকে, ভাললাগাকে মূল্যায়ন করে।

একটি দেশের তরুণ সমাজের উপর দেশের ভবিষ্যৎ উন্নতি ও অগ্রগতি নির্ভর করে। তরুণরাই পারে নতুন নতুন উদ্ভাবনী আইডিয়া ও পরিকল্পনা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। নিঃসন্দেহে তরুণরা স্বপ্নবাজ, তরুণরা নির্ভীক, তরুণরা পরিবর্তনের হাতিয়ার, তরুণরা সুন্দরের প্রতীক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমাদের তরুণরা আজ দিশেহারা। তাদের নেই কোন স্বপ্ন, নেই কোন কান্ডারী, নেই কোন পরামর্শক। এমনিতেই ধর্মের বেড়াজালে আমাদের সমাজটা বিভক্ত। তার উপর তরুণ প্রজন্ম এখন রাজনৈতিক দু'টি ধরায় ভাগ হয়ে গেছে। তারা এখন মানুষকে মূল্যায়ন করে দল ও আদর্শের ভিত্তিতে। সহজেই বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে তারা অন্যকে অপমান করে। নেই পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ। আছে সীমাহীন বেকারত্ব, হতাশা আর রাজনৈতিক হামলা-মামলা, পারিবারিক অসচ্ছলতা, নিজের ও পরিবারের জন্য ভাল কিছু করতে না পারার বেদনা। জানি না এ অসুস্থ ধারা থেকে তরুণ ও যুবক সমাজ কবে বেরিয়ে আসবে। যত দ্রুত তরুণরা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের মেধা ও শ্রম ঢেলে দিতে পারবে দেশের মঙ্গল ততো ত্বরান্বিত হবে। সরকারকে এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। পৃথিবীব্যাপী এই তরুণরাই দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছে, এরা দেশের হৃৎপিন্ড। তরুণরাই হল দেশের প্রাণশক্তি। এরাই আগামী দিনের দেশের কান্ডারী। অথচ আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গলদের কারণে তরুণরা হয়েছে ধ্বংসের প্রতীক। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা উল্টালে আমরা দেখতে পাই আমাদের তরুণদের অপকর্মের সুদীর্ঘ তালিকা।

সামাজিক মূল্যবোধ তথা ধৈর্য, উদারতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃষ্টিশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ, পারস্পরিক মমতাবোধ ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলি লোপ পাওয়ার কারণেই সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়; যা বর্তমান সমাজে প্রকট। সামাজিক নিরাপত্তা আজ ভূলুণ্ঠিত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, দেশের সামগ্রিক যে অবক্ষয়ের চিত্র এর থেকে পরিত্রাণের কোনো পথই কী আমাদের খোলা নেই? প্রশ্ন উঠতে পারে, সমাজের স্বাভাবিক ও সুস্থ গতিপ্রবাহ রক্ষা করার দায়িত্ব কার, রাষ্ট্র তথা সরকার, স্থানীয় সরকার, সমাজপতি নাকি সমাজের সচেতন মানুষের? সমাজ পুনর্নির্মাণের দায়িত্বই বা কার? আপতদৃষ্টিতে এসব প্রশ্ন সহজ মনে হলেও এর সমাধান বেশ জটিল। সমাজে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ বসবাস করে, বিচিত্র এদের মানসিকতা ও রুচি। এদের কোনো সমান্তরাল ছাউনির মধ্যে আনা কঠিন। তবে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা, সামাজিক অপরাধ কমিয়ে আনাসহ নানা পদক্ষেপ নিতে হবে সম্মিলিতভাবে। এটা একা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে সম্ভব নয়। সমাজ রক্ষা করা না গেলে পরিবার রক্ষা করা যাবে না, ব্যক্তিকে রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়বে, রাষ্ট্রও হয়ে পড়বে বিশৃঙ্খল।

আজকের তরুণরাই আগামী দিনে দেশ পরিচালনা করবে এবং বড় বড় কাজের নেতৃত্ব দিবে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। এ দেশের কর্মসংস্থানেও তারুণ্যের ভূমিকা রয়েছে অসামান্য। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, তরুণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ভারতে ৩৫ কোটি ৬০ লাখ, চীনে ২৬ কোটি ৯০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় ৬ কোটি ৭০ লাখ, যুক্তরাষ্ট্র ৬ কোটি ৫০ লাখ, পাকিস্তানে ৫ কোটি ৯০ লাখ এবং বাংলাদেশে রয়েছে ৪ কোটি ৭৬ লাখ। এখন থেকে যদি তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরো সুন্দর হবে। তাই দেশ গঠনে তরুণদের চাওয়াকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, ঠিক তেমনি তাদের পর্যাপ্ত সুযোগও দিতে হবে। আজ দেশে লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার তরুণ যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যাদের চাইলে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারে সরকার। এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে তরুণ সমাজকে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তরুণরা যত বেশি পড়ালেখা করছে, তাদের তত বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদনেও এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

দেশে তরুণদের বিশেষত শিক্ষিত তরুণদের এক বৃহদাংশ বেকার জীবনযাপন করছে এবং সেটা বেড়েই চলছে। আজ তরুণদের বড় একটি অংশ এ দেশের প্রতি মমত্ববোধ হারিয়ে ফেলেছে। যে কারণে আগের মতো স্বেচ্ছাশ্রম আর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ তারুণ্য খুবই কম দেখা যায়। তারুণ্যের এই পশ্চাৎপদতার জন্য অনেকটা আমাদের দেশের অপরাজনীতিই দায়ী। তরুণদের রাজনীতি বিমুখতাও এ দেশের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। তরুণদের ওপর চালানো এক জনমত জরিপে দেখা যায়, প্রচলিত এই রাজনীতিকে আমাদের দেশের প্রায় ৬০ ভাগ তরুণ ছেলেমেয়ে পছন্দ করেন না। এ ক্ষেত্রে রাজনীতির নগ্ন রূপকেই তারা দায়ী করেন। তাদের কাছে রাজনীতির সংজ্ঞাটাই হলো ক্ষমতার ভাগাভাগি আর সুবিধাবাদ কেন্দ্রিক দলীয় চর্চা। তারা প্রচলিত রাজনীতিকে এ দেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক বলে উত্থাপন করেন।

তবে আমরা প্রত্যাশার জায়গাটি বাঁচিয়ে রাখতে চাই। যত নষ্ট সময়ই যাক, তবুও আমি মনে করি, তরুণ প্রজন্মই সুন্দরের স্বপ্ন বোনে এবং নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম লালন করে। তারুণ্যের ইচ্ছা আর শক্তি ছাড়া সভ্যতার চাকা ঘুরিয়ে দেওয়া যায় না। এ কারণে আমরা আমাদের প্রত্যাশার জায়গা থেকে বলব, দায়িত্বশীলতার বোধ থেকে এবং সংকীর্ণ স্বার্থবাদী চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের বুকে যদি কিছুটা দেশপ্রেম অবশিষ্ট থাকে; তবে তার সন্ধান করতে চাই। এর খোঁজ পেলে আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে তারুণ্যকে অন্ধকার থেকে বের করে আনা। দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে সুস্থ চিন্তায় বিকশিত হতে তরুণ নেতৃত্ব ও তারুণ্যের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা। ইতিহাস ও ঐতিহ্যচর্চার পরিবেশ তৈরি করা। এ ছাড়া সুবাতাস প্রবাহিত হওয়ার আর কোনো পথ আছে বলে মনে করি না।

লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

পাঠকের মতামত:

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test