E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

নারী শ্রমিক বিদেশে পাঠাতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো জরুরি

২০২২ জানুয়ারি ১৬ ১৭:৩৯:১৬
নারী শ্রমিক বিদেশে পাঠাতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো জরুরি

প্রভাষক নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার


বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্য দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে বর্তমান সময়ে এ কথা না মানার কোন সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে এ দেশের অর্থনৈতিক খাতকে শক্তিশালী করতে যে কয়েকটি খাত সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে তার মধ্যে অন্যতম প্রবাসীদের আয়। যেখাতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এগিয়ে আসছে। এ থেকে যেমন কমছে বেকারত্ব তেমনি অর্জিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। অভাবের সংসারে আলো জ্বালানোর লক্ষে প্রতিবছরই বিপুল সংখ্যক শ্রমিক রোজগারের সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। এর মধ্যে অন্যতম বাজার হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। প্রতিনিয়তই অর্থ আসছে এসব দেশ থেকে।

দেশে চলতি অর্থ বছরে ( জুলাই- নভেম্বর) পর্যন্ত ব্যাংকিং চ্যানেলে এসেছে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গুলি থেকেই এসেছে এ অর্থের ৫৪ দশমিক ২৪ শতাংশ। চলতি অর্থ বছরে প্রবাসী আয় পাঠানোর শীর্ষে থাকা ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রম বাজার সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কুয়েত, আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, ওমান, ইতালি ও বাহরাইন। এ দশটি দেশের মধ্যে ৬টি মধ্যপ্রাচ্যের। তাই এসব দেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের আরো গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। একদিকে যেমন শ্রম বাজার ধরে রাখতে হবে অন্যদিকে শ্রমিকদের সুবিধা অসুবিধার কথাগুলোও বিশেষভাবে বিবেচনায় আনতে হবে সরকারকে। একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশায় সহায় সম্বল বিক্রি করে বিদেশের টাকা জোগাড় করতে দেখা যাচ্ছে অনেককেই।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব রিক্রুট এজেন্সি (বায়রা)র তথ্য মতে বর্তমানে প্রায় ৫ লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। প্রতিমাসে তারা প্রায় ৭৫০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার মতো আয় করছেন। যেহেতু এদের বেশির ভাগই গৃহকর্মী তাই তাদের টাকা পাঠানোর হারটাও বেশি। সেখান থেকে এ আশার মৃত্যু ঘাঁর ফলে বেঁচে থাকা কষ্ট সাধ্য হয়ে যাচ্ছে প্রত্যেকটি পরিবারের। সম্প্রতি যে বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে এসেছে তা হলো মধ্যপ্রাচ্যের নারী শ্রমিক। তথ্য বলছে গত ৫ বছরে এদেশ থেকে সৌদি আরব গেছে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৭৪ জন শ্রমিক। কিন্তু এসব শ্রমিক ঐখানে যাওয়ার পর তাদের দিনবদলের পরিবর্তে কি ঘটছে তা দেখার দায়িত্ব এদেশের সরকারের। কারন বেশির ভাগ পরিবারই তাদের সাথে যোগাযোগ পর্যন্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এদের সাথে শারীরিক- মানসিক নিপীড়ন- নির্যাতন করা হচ্ছে কি না এসব সমন্ধে খোঁজ খবর নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ তথ্য হলো এসময়ের মধ্যে ১৯৮ জন নারী লাশ হয়ে ফিরেছেন। কিন্তু কাজের সন্ধানে গিয়ে কেন এ লাশ হয়ে ফিরে আসা ? এমনকি অনেক নারী শ্রমিকরা গর্ভে সন্তান নিয়ে দেশে ফিরে আসছেন বলেও জানা যায়।

বিদেশে নারীকর্মীরা আপৎতকালীন সেবা পেতে নেই কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণ। পাচ্ছে না কোনো আইনি আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ। এসব বাস্তবতায় নারী শ্রমিকদের বিদেশ পাঠানো দিনেদিনে ভয়ানক হয়ে উঠছে। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী গত ৫ বছরে সৌদি আরব থেকেই ফিরে এসেছে প্রায় ২৪ হাজার নারী শ্রমিক। সরকারের পক্ষ থেকে এ হিসাবটা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। সমস্যাটা হলো যারা ফিরে এসেছে তারা কেউ স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসেনি। বিভিন্ন নির্যাতনের স্বীকার হয়ে ফিরে এসেছে আশার অপমৃত্যু নিয়ে। বিদেশ থেকে ফিরে এসে অর্থনৈতিকভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তার চেয়ে বেশি হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে সামাজিকভাবে। আর শারিরিক ক্ষতিগ্রস্থতাতো রয়েছেই। ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের ভাষ্যমতে শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতনসহ ঠিকমতো খাবার না দেওয়া, চুক্তি অনুযায়ী বেতন না পাওয়া নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করানোর মতো অভিযোগ রয়েছে।

গত বছর প্রকাশিত রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্স ইফনিট (রামরু)র সমীক্ষা মতে, পরিবারের ভাগ্য বদলাতে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে কর্মস্থলে ৩৫ শতাংশ নারী কর্মী শারীরিকভাবে ৫২ শতাংশ মানসিকভাবে এবং ১১ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এইযে বিভিন্ন অত্যাচার হচ্ছে তার বেশির ভাগই নারীকর্মীরা প্রকাশ করতে চায় না কারন দেশে ফিরে আসার পর সামাজিকভাবে হেনস্থা হওয়ার ভয়ে। ১৯৯১ সাল থেকে সৌদি আরবে নারী শ্রমিকদের যাওয়া শুরু হলেও ব্যাপকভাবে যাওয়া শুরু হয় ২০১৫ সাল থেকে। কারন সৌদি সরকারের অনুরোধে সেখানে নারীকর্মী পাঠানোর বিষয়ে ২০১৫ সালে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। জানা যায় ঐ সময় বেশ কয়েকটি দেশ নির্যাতনের কারনে তাদের দেশ থেকে নারী শ্রমিক সৌদিতে পাঠানো বন্ধ করে দেয়। হয়তো সৌদি সরকারের চাপের ফলে বাংলাদেশ সরকার সম্মতি দেয় দেশের স্বার্থে। যেহেতেু আমরাও প্রচুর পরিমাণে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছিনা সে কারণে বিদেশে শ্রমিক পাঠানো আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। শ্রমিক যেহেতু পাঠাতে হবে তাই তাদের ভালো মন্দের দিকটায় বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেসব দেশে নারী শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে সেসব দেশে আমাদের দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিরা সঠিকভাবে এসব শ্রমিকদের দেখাশুনা করতে পারছে না বিভিন্ন কারণে। যার ফলে এসব শ্রমিকরা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে।

যেসব শর্তে এসব নারীদের বিদেশ পাঠানো হচ্ছে তাদের সেসব শর্ত সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না তা দেখাশুনার ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমাদের মিশন গুলোকে আরো কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। যেসব নারী শ্রমিকরা বিদেশে যাচ্ছে তাদের শিক্ষা কম থাকায় কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ শ্রমিকই যাচ্ছে গ্রামের দালালদের মাধ্যমে। যারা যাচ্ছে তারা জানেও না তাদের কাজ কি হবে ? বেতন সম্পর্কে দেওয়া হয় মিথ্যা তথ্য। যার ফলে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সমস্যাটা হলো যারা এসব নারীদের বিদেশে বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে পাঠাচ্ছে তারা অপরাধ করেও থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সরকারের পক্ষ থেকে সঠিকভাবে এদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। এমনকি যারা নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরেছেন তাদেরকে নির্বাসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। যেসব এজেন্ট বাংলাদেশ থেকে শ্রমিকদের বিদেশ পাঠাচ্ছে তাদেরকে সঠিকভাবে বিধি নিষেধ মানতে বাধ্য করাতে পারছেনা সরকার। সাধারণ মানুষের মাঝে রয়েছে সচেতনতার অভাব। সবচেয়ে ঝামেলা হলো যারা গ্রামেগঞ্জে এসব লোক সংগ্রহ করে থাকে তাদের নেই কোন এজেন্ট আইডি এবং লেনদেনেরও সঠিক কোন পদ্ধতি বা নিয়ম নেই। যার ফলে অনেক দালালরা অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে লেনদেনের ক্ষেত্রে অনেকক্ষেত্রেই তৈরি হচ্ছে ঝামেলা ।

আমাদের মনে রাখতে হবে নারী শ্রমিকদের বিদেশ পাঠানো হচ্ছে এবং যেসব কারণে ফিরে আসছে তা অত্যন্ত খারাপ নজির। এর ফলে পুরুষ শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রেও নতুন করে প্রভাব পড়তে পারে। জি টু জি পদ্ধতিতে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রেও চলে এজেন্টদের বিরোধিতা। এসব কারণে তৈরি হয় সিন্ডিকেট এবং নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তাদের হাতে। যেখানে যে পদ্ধতিতে লোক পাঠানো ভালো হয় সে পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে সরকারকে। সম্প্রতি মালয়েশিয়া সরকারের সাথে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের একটি চুক্তি হয়েছে এটাকে কেন্দ্র করে দালালরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যার ফলে প্রতারণার শিকার হয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ।

সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের এ বড় খাতটির দিকে যথেষ্ট পরিমাণ নজর দেওয়া প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক শ্রমিক বান্ধন আইন তৈরি করে যথাযথ প্রযোগ ঘটানো প্রয়োজন। আর সবচেয়ে বেশি যে দিকটায় আরো তদারকির প্রয়োজন তা হলো বিদেশে দক্ষ শ্রমিক প্রেরণ। তাহলে আয় যেমন বাড়বে তেমনি বৃদ্ধি পাবে শ্রমিকের চাহিদা। তাহলে এদেশের শ্রমিকরা তাদের দক্ষতা দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জায়গা করে নিতে পারবে এতে করে বিভিন্ন নির্যাতন বন্ধেও একটা প্রভাব পড়বে। মোট কথা সরকারকে শ্রমিক বান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে।


লেখক :শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

২৯ মে ২০২২

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test