E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Technomedia Limited
Mobile Version

আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবস 

নৈতিকতার অভাবই দুর্নীতি বিস্তারের প্রধান কারণ, চাই পারিবারিক শিক্ষা

২০২৩ ডিসেম্বর ০৮ ১৫:৫০:৪০
নৈতিকতার অভাবই দুর্নীতি বিস্তারের প্রধান কারণ, চাই পারিবারিক শিক্ষা

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ


আগামীকাল শনিবার ৯ ডিসেম্বর ২১ তম আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস ২০২৩। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘উন্নয়ন, শান্তি ও নিরাপত্তার লক্ষ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ’।দিবসটি উপলক্ষে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বার্তা দিতে চায় দুর্নীতি দমন কমিশন। 

বরাবরের মতো এবারও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৮টি বিভাগ, ৬৪টি জেলা এবং ৪৯৫টি উপজেলায় বড় পরিসরে উদযাপন করা হবে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস।

একই সঙ্গে দেশে সকল সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ, সরকারি-আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং পিকেএসএফসহ অন্যান্য এনজিওতে দুর্নীতি বিরোধী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

যার মধ্যে রয়েছে সারাদেশে দুর্নীতি বিরোধী কার্টুন প্রদর্শনী, মানববন্ধন, সেমিনার ও আলোচনা সভা। যেখানে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সামাজিক সংগঠন, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি ও সাধারণ জনগণ অংশগ্রহণ করবে।

জাতিসংঘ ২০০৩ সালে ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস ঘোষণা করে। সে হিসেবে এবার ২১ তম আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস। জাতিসংঘ সারা বিশ্বকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যেই ইউনাইটেড ন্যাশনস কনভেনশন অ্যাগেইনেস্ট করাপশনের (আনকাক) মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশ আনকাকের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালন শুরু করে। যদিও সরকারিভাবে ২০১৭ সাল থেকে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে।
বর্তমানে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দুর্নীতি। সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কবলে আজ বিপন্ন মানবসভ্যতা। সর্বনাশা এই সামাজিক ব্যাধির মরণ ছোবলে বর্তমান সমাজ জর্জরিত। সর্বোচ্চ প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, শিল্প-বাণিজ্যসহ সর্বত্রই চলছে দুর্নীতি। তাই বিশেষজ্ঞরা দুর্নীতিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

আভিধানিক অর্থে দুর্নীতি হলো নীতিবিরুদ্ধ, কুনীতি, অসদাচরণ, অসৎ উপায় অবলম্বন, অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন, নীতি-বিরুদ্ধ আচরণ ইত্যাদি। আর প্রতিরোধ অর্থ হচ্ছে-নিরোধ, নিবারণ, বাধাদান, প্রতিবন্ধকতা, আটক, ব্যাঘাত। আভিধানিক অর্থে শব্দটি অত্যন্ত ছোট হলেও এর অর্থ ব্যাপক। দুর্নীতিকে নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা যায় না। বিজ্ঞজনরা দুর্নীতিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। দুর্নীতির ধরন প্রকৃতি বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময়। তাই তা নির্দিষ্টকরণ জটিল কাজ। দুর্নীতি এমন এক ধরনের অপরাধ, যার সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার, সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার যুক্ত। সাধারণ কথায় দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ উৎকোচ গ্রহণ বা মহল বিশেষের অশুভ স্বার্থ হাসিল করাকে দুর্নীতি বোঝায়।

বাংলাদেশের সমাজজীবনে অনৈক্য, হিংসা, দলাদলি, কোন্দল, স্বার্থপরতা, অবিশ্বাস এবং চরম দুর্নীতি বিরাজ করছে। দুর্নীতি আজ রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, সামাজি, ধর্মীয় ও ব্যক্তি জীবনের সব ক্ষেত্রে বিরাজ করছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তা থেকে বাদ যায়নি।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ সবার কাম্য। দুর্নীতি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে এবং জনগণের সম্পদকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা জাগায়। দুর্নীতি ও বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে যারা প্রভাব বিস্তার করে তারা সেই প্রভাব স্বীকার করে না। এই দুর্নীতিপরায়ণ অবস্থা কোনো নীতিকথা ও তথাকথিত সামাজিক বয়কটে পরিবর্তন হবে না। বর্তমান যুগে অপরাধের ধারা বদলে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে ভিওআইপির সাহায্যে কতিপয় কোম্পানি যে অনাচার করে এসেছে, প্রশাসন তাদের কেশ পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারেনি। এসব দুর্নীতি ও অপরাধ কর্মের সঙ্গে সমাজের উচ্চ মহলের শিক্ষিত, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদ রয়েছে। তাদের সহায়তায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে বহাল তবিয়তে থাকে। দুর্নীতি দমন কমিশনের সহায়তায় দ-িতদের অর্ধেকেরও বেশি অপরাধী সামাজিক ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছে রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। দুদকের তত্ত্বাবধানে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) বিভিন্ন অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে ৩০৩টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ে মাত্র ১৯৬টি মামলা হয়। কিন্তু ৯ মাসেই পরিসমাপ্তি বা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৫৯টি অভিযোগ। যা ২০২২ ও ২০২১ সালের ১১ মাসের পরিসংখ্যান বিবেচনা নিলেও প্রায় দ্বিগুণ। একই সময়ে ২৪৭টি মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। অন্যদিকে ৫৫টি মামলার চার্জশিট না দিয়ে এফআরটির (মামলা থেকে অব্যাহতি) মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।

২০২২ ও ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ৩১২টি ও ২৪৪টি অভিযোগ পরিসমাপ্তি বা নথিভুক্তি (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ওইসব অভিযোগে দুর্নীতি খুঁজে পায়নি দুদক অনুসন্ধান বিভাগ।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে দুদকের বিভিন্ন অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে ৩৫৪টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেয়। ওইসব অভিযোগে মামলা দায়ের হয় ২৭৬টি। ওই সময় ৩১২টি অভিযোগের পরিসমাপ্তি বা নথিভুক্তি (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) হয়। ১৬২টি মামলার চার্জশিট দিয়েছিল দুদক। আর ৭৮টি মামলা থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৩২৬টি দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কমিশন। একই সময়ে ৩১১টি দুর্নীতির মামলা হয়। ওই সময় ২৪৪টি অভিযোগের পরিসমাপ্তি বা নথিভুক্তি (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) হয়। তদন্ত শেষে ২২২টি মামলার চার্জশিট দায়ের হয়। এফআরটি (মামলা থেকে অব্যাহতি) হয়েছিল ৮০টি মামলার।

চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) বিভিন্ন অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে ৩০৩টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ে মাত্র ১৯৬টি মামলা হয়। কিন্তু ৯ মাসেই পরিসমাপ্তি বা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৫৯টি অভিযোগ। যা ২০২২ ও ২০২১ সালের ১১ মাসের পরিসংখ্যান বিবেচনা নিলেও প্রায় দ্বিগুণ।আর গত তিন বছরে দুর্নীতির মামলার আসামি গ্রেপ্তারের উল্লেখযোগ্য সংখ্যা দিতে পারেনি দুদক। দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের পাঁচ বছরে প্রতিবছর গড়ে শতাধিক আসামি গ্রেপ্তার করার নজির সৃষ্টি করেছিল। অথচ গত ১৯ বছরে দুদকের বিভিন্ন দিকে সক্ষমতা বাড়লেও সেই তুলনায় দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ড বাড়েনি।

সার্বিক বিষয়ে সংস্থাটির সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে থাকে। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে কেবল কমিশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে সব শ্রেণির মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

এদিকে দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে চলতি বছরের গত ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) দায়ের হওয়া ১৯৬টি মামলায় ৩৭৪ জনকে আসামি করা হয়। এতে ১৮৭ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও তালিকায় রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধি রয়েছেন ১০ জন। এছাড়া ৭০ জন বেসরকারি চাকরিজীবী, ৩০ জন ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য পেশার ৭৬ জনকে আসামি করেছে দুদক।

অপরদিকে গত ৯ মাসে দাখিল হওয়া ২৪২টি অভিযোগপত্রে ১ হাজার ১২৪ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে ৬৮৯ জনই সরকারি চাকরিজীবী। দাখিল করা অভিযোগপত্রে বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৮৯ জন, ৮১ জন ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ৬১ এবং ৯ জন জনপ্রতিনিধি এবং অন্যান্য পেশার ৯৭ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

যারা আসলে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত; বিশেষ করে যারা রাজনৈতিকভাবে ও প্রশাসনিকভাবে ক্ষমতাবান ব্যক্তি, যাদের রুই-কাতলা বলা হয়। তাদের ক্ষেত্রে দুদককে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। তারা মূলত যারা চুনোপুঁটি তাদের নিয়ে টানা-হেঁচড়া করছে। দুদক এখন রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, প্রভাবিত হয়। যারা প্রভাবশালী তাদের ধরতে সাহস দেখায় না। দুদক কী ক্রমাগতভাবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মূলত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটা যতখানি না কমিশনের হাতে, তার থেকে বেশি প্রশাসনের হাতে। দেশের দুর্নীতি দমনে দুদককে সমস্ত প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে কাজ করতে হবে।

বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির বৈষম্য ও বঞ্চনার ইতিহাস গভীরভাবে অনুভব করতে পেরে আজীবন তাদের মুক্তির জন্য লড়াই সংগ্রাম করে গেছেন। সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় তিনি সমাজের অসংগতি বুঝতে পেরে হুশিয়ারিও উচ্চারণ করেছিলেন, ‘বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ সব সমাজবিরোধী তৎপরতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘যেসব সমাজবিরোধী ব্যক্তি শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের হয়রানি করছে এবং যারা দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকার ইতস্তত করবে না’। সমাজের সব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন ও দুর্নীতি পরস্পর নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। একটি দেশ যখন দরিদ্র অবস্থা থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয়, তখন সে দেশে ব্যাপক দুর্নীতি দেখা দিতে পারে।দুর্নীতি অনেকটাই উন্নয়নের সহযাত্রী। অর্থাৎ একটি দেশ বা জনপদ যখন উন্নয়নের ধারায় ধাবিত হয় তখন সেখানে নানা পর্যায়ে দুর্নীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে এবং প্রশ্নাতীত রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে, তাহলে দুর্নীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সম্ভব।

বিশ্বে কোনো দেশই দুর্নীতিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারেনি। উন্নত দেশগুলোতে দুর্নীতি আছে তবে তা সীমিত বা সহনীয় পর্যায়ে।তাই দুর্নীতি সেসব দেশের প্রধান সমস্যা নয়। তবে একটি সমাজে কোনোভাবেই ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতির বিস্তার সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। দ্রুত উন্নয়ন এবং ব্যাপক দুর্নীতিও কাম্য হতে পারে না।অতি দরিদ্র কোনো দেশ যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়কে ধাবিত হয় তখন সেখানে অবধারিতভাবে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা দুর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে। তিনি বলেছেন, ‘দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে হলে, প্রশাসনকে হতে হবে দুর্নীতিমুক্ত এবং নিশ্চিত করতে হবে সুশাসন’৷ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মতো দুর্নীতির বিরুদ্ধেও জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন তিনি৷ সাম্প্রতিক সময়ে সরকার দলের কিছু কিছু দুর্নীতিবাজ দুর্নীতি করে কেউই রেহাই পানননি। সকলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দলের ভিতর থেকেই তিনি শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। এধরনের ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তা এক কথায় বিস্ময়কর। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ধারাবাহিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের বড়ো ২৫টি অর্থনীতির দেশের একটি হবে। তখন বাংলাদেশ হবে ২৪ তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। সামাজিক নানা সূচকে বাংলাদেশ নিকট-প্রতিবেশী অনেক দেশকে অতিক্রম করে গেছে।

দুর্নীতিই উন্নয়নের প্রধান বাধা। এই দুর্নীতিই ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সাম্য ও গণতন্ত্রের হুমকি। উন্নয়নের এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এর বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন।বাংলাদেশ আজ বিশ্বদরবারে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিত। এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে সুষমভাবে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিকতা বা অন্য কোনো বিভাজনকে ন্যূনতম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য- দুর্নীতিই আজকের বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান বাধা হিসেবে সামনে চলে আসছে।

বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে মিশন বাস্তবায়নকারি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন।সমাজের সর্বস্তরে প্রবাহমান একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবিরোধী সংস্কৃতির চর্চা এবং এর প্রসার সুনিশ্চিত করা এবং উত্তম চর্চার বিকাশ সাধন করা এ কমিশনের মূল লক্ষ্য।বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে বেশ কিছু আইন ও বিধিমালা রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা-২০০৭ সংশোধনী, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা– ২০১৯, সাক্ষ্য আইন– ১৮৭২, ক্রিমিনাল ল এমেন্ডমেন্ট এ্যাক্ট– ১৯৫৮, দন্ডবিধি– ১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি)– ১৮৯৮, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন – ১৯৪৭, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন– ২০১২, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন- ২০০৪ এবং তথ্য অবমুক্তকরণ নীতিমালা– ২০১১ ইত্যাদি।

কমিশন দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের লক্ষ্যে সমাজে সততা ও নিষ্ঠাবোধ জাগ্রত করা তথা উত্তম চর্চার বিকাশে পাঁচ বছর মেয়াদি (২০১৭-২০২১) কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। দুর্নীতির ঘটনা তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের লক্ষ্যে কমিশন ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই দুদক অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইন-১০৬ এর কার্যক্রম শুরু করে, যা এখন দেশের সাধারণ মানুষের অভিযোগ জানানো ও প্রতিকারের প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

মানুষ কেন দুর্নীতি করে তার উত্তর খুঁজতে ব্যক্তির আর্থ-সামাজিক অবস্থা, মানসিকতা, শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ব্যক্তি ও সমাজ এ দুয়ের পারস্পরিক ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার মাঝেই দুর্নীতির উদ্ভব এবং বিস্তার হয়। তাই ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে কী কী উপাদান দুর্নীতির নিয়ামক হিসেবে কাজ করে তা উদঘাটন করে সেগুলোকে দুর্নীতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। যেমন-১. ঐতিহাসিক কারণ, ২. অর্থের মূল্যস্তর বৃদ্ধি, ৩. অপর্যাপ্ত বেতন, ৪. রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ত্রুটি, ৫. অপরাধ দূরীকরণে বলিষ্ঠ পদক্ষেপের অভাব, ৬. আইন সম্পর্কে জনগণের সচেতনতার অভাব, ৭. অর্থের মাপকাঠিতে সামাজিক মর্যাদা নিরূপণ প্রবণতা, ৮. ব্যক্তিগত লোভ-লালসা ও ৯. ধর্মীয় শিক্ষার অভাব।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে কেউ কেউ ধর্মীয় শিক্ষা ও জনগণের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বস্তুত দুর্নীতির প্রতিকার, প্রতিরোধ ও সংশোধনের জন্য কার্যকর সামাজিক নীতি-কর্মসূচি গ্রহণ, আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং জনমত গড়ে তুলতে হবে। আর এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো বিবেচনায় আনা যেতে পারে- যেমন : দুর্নীতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা তথা শিক্ষা কৌশল, বিভিন্ন প্রদর্শনমূলক অনুষ্ঠানমালা, সাহিত্য ও বিচিত্রানুষ্ঠান, স্লোগান, পথযাত্রা, রেডিও-টিভি, ছায়াছবি, দুর্নীতিবিরোধী পোস্টার এবং পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। নিম্নে দুর্নীতি মোকাবেলায় আরো কিছু পদক্ষেপ সম্পের্কে তুলে ধরা হলো-

১. দুর্নীতিবিরোধী চিন্তাচেতনার বিকাশ ও বিস্তার ঘটানো। ২. আন্দোলন পরিচালনার জন্য সংগঠন গড়ে তোলা। ৩. নেতৃত্ব ও সংগঠনের প্রতি জনগণের সমর্থন ও আস্থা অর্জন করা। ৪. দুর্নীতি মোকাবেলায় গঠিত সংগঠনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ৫. ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বিবেচনায় দুর্নীতি মোকাবিলায় অধিকতর ফলদায়ক উপায় ও পন্থা নির্বাচন। ৬. গৃহীত উপায় ও পন্থার প্রতি জনসর্থন যাচাই ও প্রয়োজনে সংশোধন। ৭. জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতি মোকাবিলায় কার্যকর পন্থা ও উপায় কার্যকরকরণ। ৮. মূল্যায়ন ও কার্যকারিতা স্থায়ীকরণ। ৯. ধর্মীয় বিধানাবলি প্রচার ও কার্যকর করা। ১০. দুর্নীতিবিরোধী সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনা করা। ১১. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ১২. দুর্নীতিবাজদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা। ১৩. দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালন করা। ১৪. দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ বা সামাজিকভাবে বয়কট করা। ১৫. দক্ষ তদন্তকারী এবং সরকারি আইনজীবী নিয়োগ করে দুর্নীতিবাজদের শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা। ১৬. দুর্নীতি দমন কমিশনকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা।

পরিশেষে বলতে চাই, দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি এবং সমাজ ও সভ্যতার জন্য মারাত্মক অভিশাপ। একমাত্র দুর্নীতির কারণেই আমাদের ওপর নেমে এসেছে দরিদ্রতা এবং দেশের উন্নয়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই অবিলম্বে এর মূলোৎপাটন অপরিহার্য। বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিধায় দুর্নীতির কারণ এবং তা প্রতিরোধে কতিপয় নীতিমালার কথা বলা হয়েছে। এটি যত বেশি বিশ্লেষিত ও আলোচিত হবে জনগণ এ বিষয়ে তত বেশি সচেতন হবে এবং তার সুফল ভোগে সমর্থ হবে।তাই অনিয়ম দূর্নীতি যেই করুক, প্রশ্ন তুলতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে পারিবারিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধের চর্চাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদর্শের চর্চার মাধ্যমেই দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক।

পাঠকের মতামত:

০১ মার্চ ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test