E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Walton New
Mobile Version

নিজেদের করা পাপ নিজেদেরই মোচন করতে হবে

২০২৪ মে ০২ ১৭:১২:৫৫
নিজেদের করা পাপ নিজেদেরই মোচন করতে হবে

গোপাল নাথ বাবুল


অসহ্য গরমে কাহিল পুরো বাংলাদেশ। এমন অবস্থা অনেকের কাছে অসহনীয় ঠেকছে। রীতিমত মানুষ গরমে হাঁসফাঁস করছে। অত্যাধিক গরম তাপপ্রবাহ মানুষের প্রাত্যাহিক জীবনে ছন্দ কাটছে বার বার। সমুদ্রের ধারে সারাবছরই মনোরম নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া থাকে। সেখানেও এ বছরের এপ্রিলে তাপমাত্রা ৩৭ এর উপরে রয়েছে। মঙ্গলবারে যশোরে সর্বোচ্চ ৪৩.৮ ডিগ্রি এবং চুয়াডাঙ্গায় ৪৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদরা জানান, একদিকে তীব্র গরম, অপরদিকে বাতাসে জলীয় বাষ্পের আর্দ্রতা বেশি থাকায় মানুষের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে। অল্পতেই প্রচন্ড ঘেমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। অস্বাভাবিক গরমে জীবাণু শত্রুর দাপটে বাড়ছে শারীরিক যন্ত্রণা। বিশেষ করে জ¦র ও পেটের অসুখ। চট্টগ্রামের অধিকাংশ শিশু-কিশোরদের জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, এসবের সমলয়ে শত্রু সঙ্গ জোরদার করেছে পোস্ট-কোভিড শারীরিক সমস্যাও। অতিরিক্ত গরমের কারণে সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় পানিস্বল্পতা। ফলে হিটস্ট্রোকের আশঙ্কা বেড়ে যায়। বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণে জানা যায়, গত ২৮ এপ্রিলের ১৭ জন-সহ গত ১ সপ্তাহে সারাদেশে ৩২/৩৩ জন হিটস্ট্রোকে মৃত্যু বরণ করেছেন। যাদের মধ্যে জনপ্রতিনিধি, আওয়ামীলীগ নেতা, ব্যবসায়ী, কৃষক রয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের হিসেব মতে, হিটস্ট্রোকে ১ দিনে (২৮ এপ্রিল) এত মৃত্যুর রেকর্ড দেশের ইতিহাসে নেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে কেন মরুভূমির অবস্থা বিরাজ করছে। কেন মরুভূমির মতো উত্তপ্ত আবহাওয়া দেখা দিচ্ছে। তাহলে বাংলাদেশ কী মরুভূমি হওয়ার পথে? বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এমন আশঙ্কার কথা উঠে আসছে। এমনিতেই কার্তিক থেকে আষাঢ় মাসের মধ্যে বৃষ্টি হওয়ার আগ পর্যন্ত চট্টগ্রামের অধিকাংশ টিউবওয়েলে পানি উঠে না। আবার অন্যদিকে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক বিরাট অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবকিছু মিলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি নিয়ে গবেষণা করা মার্কিন ভূ-বিজ্ঞানী ড. নরমেন ম্যাকলিওড বলেন, ‘সাহারা মরুভূমি যেভাবে মরুকরণের দিকে গেছে, ঠিক তেমনি করে বাংলাদেশে মরুকরণ ঘটছে।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন দুর্যোগের বড় কারণ জলবায়ু পরিবর্তন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও জলবায়ু সংক্রান্ত রেকর্ড থেকে জানা যায়, গত কয়েক দশক ধরেই বাংলাদেশে উষ্ণতার মাত্রা ও এর স্থায়িত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও চার থেকে পাঁচ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রার গরম অনুভূত হচ্ছে। যে কারণে সাধারণের অস্বস্তিও বেশি। ৩০ এপ্রিলের ৪৪ ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রাকে বিপদজ্জনকও বলেছেন তারা।

শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ-সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এপ্রিলের গরমে অস্বস্তি বাড়িয়েছে। এশিয়ার মতো আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশও আগুন রোদে পুড়ে খাক্ হচ্ছে। এপ্রিলের গরমে পশ্চিম আফ্রিকার স্থলবেষ্টিত দেশ মালিতে থার্মোমিটারের পারদ উঠেছে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন অতীষ্ট। আরও জানা যায়, এ গরমে সে দেশে রুটি-দুধের চেয়ে বরফের দাম বেশি। পরিবেশ ও নিজেদের ঠান্ডা রাখতে বরফের চাহিদা বেড়ে গেছে। তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে ১০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি শোচনীয় অবস্থা শিশু ও বয়স্কদের। অধ্যাপক তোলোবা বলেন, এই পরিস্থিতির জন্য আমাদের আরও পরিকল্পনা প্রয়োজন। যে পরিস্থিতি আবারও তৈরি হতে পারে। এইবার গরম আমাদের অবাক করে দিয়েছে। প্রতিবেশি দেশ সেনেগাল, গিনি, বুরকিনা ফাসো, নাইজেরিয়া, নাইজান ও শাদও প্রাণঘাতী এই তাপপ্রবাহে আক্রান্ত। চরম তাপমাত্রার জন্য মানবঘটিত জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীরা।

সম্প্রতি ইউরোপীয় জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের একটি নতুন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইউরোপ সমগ্র পৃথিবীর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে এবং সেই তাপ গ্রীষ্মের মাসগুলোতে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণ নিয়েছে। ইউরোপের কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস এবং রাষ্ট্রসংঘের অনুমান অনুসারে গত ২০ বছরে মহাদেশে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত কার্বন নির্গমন বাড়ায় বাড়ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা।

বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে এমনিতেই আমাদের পরিবেশ আবহাওয়া তপ্ত হয়ে উঠছে। পরপর দু’-তিনদিন রোদ দিলেই টেকা দায় হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন বলতে বোঝানো হয়, সূর্যের রশ্মি ক্ষুদ্র তরঙ্গ রূপে ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ে, যার ফলে ভূ-পৃষ্ঠ ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হতে থাকে। এরপর সূর্য থেকে আসা সেই রশ্মি ভূ-পৃষ্ঠে প্রতিফলিত হয়ে দীর্ঘ তরঙ্গ রূপে আবার মহাকাশে ফিরে যায়। এমন অবস্থায় মানুষের দ্বারা সৃষ্ট কিছু কিছু অত্যন্ত অবিবেচক কাজের ফলে বায়ুমন্ডলের সর্বনিম্নস্তর অর্থাৎ ট্রপোস্ফিয়ারে গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির পরিমাণ অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে চলেছে। এতে সূর্য থেকে আসা রশ্মির দৈর্ঘ্য তরঙ্গরূপে মহাশূন্যে ফিরে যাওয়ার সময় ভূ-পৃষ্টের সেই সমস্ত গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির দ্বারা শোষিত হচ্ছে। ফলে বায়ুমন্ডলের নিচের স্তরগুলির উষ্ণতা ক্রমশই অস্বাভাবিক হারে বেড়েই চলেছে।

বিশ্বের এমন অবস্থার জন্য আরও দায়ী বর্তমান সভ্যতার উম্মেষ-বিকাশ ও বিস্তারে মানুষের একাধিপত্য, তার অপরাজেয় প্রাণশক্তি ও দুর্জয় প্রকৃতি জয় করার আগ্রাসী ক্ষুধা তাকে যেমন অবিরত সক্রিয় করে রেখেছে, তেমনি সভ্যতাগর্বী আধুনিকতার মোড়কে সবুজ পৃথিবী ক্রমশ হলুদ হয়ে উঠেছে। সেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে অপ্রাকৃতিক বিস্ময় কোনও কিছুই তাকে বিরত করতে পারেনি। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে তার শক্তিকে প্রতিহত করে আধুনিক সভ্যতার বুনিয়াদ গড়ে তোলা মানুষই সৃষ্টিকর্তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। তার আগ্রাসী ক্ষুধায় প্রকৃতির অসহায় পরিণতি দেখে মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা বেড়েই চলেছে। কৃত্রিমতার আড়ম্বরে ঝাঁ চকচকে রাস্তাঘাট থেকে ইট-কাঠ-পাথরের রাজপ্রসাদ, রঙিন আলোর হাতছানিতে ভোগসর্বস্ব আধুনিকতা যে কত ঠুনকো, কত পলকা, কত অস্থিতিশীল, তা বছর দুয়েকের করোনা মহামারির গৃহবন্দি জীবনেই প্রমাণ হয়েছে। হাতের মুঠোয় পৃথিবীকে ধরতে গিয়ে হাতটাই কখন যে বেহাত হয়ে গেছে বুঝতে পারিনি।

মানুষের স্বরচিত পরিবেশের কৃত্রিম আয়োজন যতই মনোরম আর মনোম্গ্ধুকর হোক না কেন, তাতে প্রকৃতির সবুজ সজীবতা মেলে না। প্লাস্টিকের ফুলের বাহারি আয়োজন চোখ ধাঁধায়, অথচ তাতে মন ভরে না। প্রকৃতির সঙ্গে যতই দুরত্ব বাড়ছে, ততই মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ভেঙ্গে পড়ছে। কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে নির্বিচারে নিজের ইচ্ছে মতো প্রকৃতিকে ধ্বংস করে অত্যাধুনিক কৃত্রিম পরিবেশ রচনার তৎপরতায় নাগরিক জীবনের বিকৃত ক্ষুধা আমাদের পেয়ে বসেছে। তাতে অচিরেই সুলভ প্রাকৃতিক সম্পদ হাতের নাগালের বাইরে দুর্লভ হয়ে উঠেছে এবং প্রাকৃতিক রূপসুধা বিষাক্ত পরিবেশে পরিণত হয়েছে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন মানে পৃথিবী পৃষ্ঠের ‘অতিরিক্ত তাপ’। এর ফলে বিশ্বের তাপমাত্রার ক্রমাগত বৃদ্ধি ঘটছে। জলবায়ুর বা ক্লাইমেটের এ পরিবর্তনের মূল নেতৃত্ব দেয় এ বিশ্ব উষ্ণায়ন। জলবায়ুর এ পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিমাণ বাড়তে পারে এবং নানা প্রজাতিও বিলুপ্ত হতে পারে। কীভাবে মানুষের সক্রিয়তায় উষ্ণতা বাড়ছে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে। যেমন জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েল। যানবাহন ব্যবহার, বিদ্যুৎ উৎপাদন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ইত্যাদি কর্মক্ষেত্রগুলিতে অতিরিক্ত পরিমাণে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। সেখান থেকে নির্গত কার্বন-ডাই অক্সাইড বাতাসে বেড়েই চলেছে। এ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে চলা কার্বন-ডাই অক্সাইড বিশ্ব উষ্ণায়ন বৃদ্ধির অন্যতম একটি প্রধান কারণ। এসব ঘটছে মানুষের প্রয়োজনে। যে প্রয়োজনবোধ ভারসাম্যহীন। যেমন গাছ কাটা।

জ্বালানির জন্য প্রয়োজনীয় কাঠের ব্যবহার, জনবসতি বৃদ্ধি, কৃষিজমির জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা, শিল্পকারখানাগুলির প্রসার ইত্যাদি নানা কারণে অতিরিক্ত মাত্রায় গাছ কাটার ফলে কার্বন-ডাই অক্সাইড বনভূমি দ্বারা শোষিত হতে পারছে না। যার ফলে বাতাসে অক্সিজেনের মান কমে যাচ্ছে এবং কার্বন-ডাই অক্সাইডের মান বাড়ছে। মিথেন গ্যাসের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বাড়ছে উষ্ণতা। মিথেন হল প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির মধ্যে অন্যতম। কৃষি জমিতে জমে থাকা জল, গবাদি পশুর মল-মূত্র এবং বিভিন্ন পচনশীল আবর্জনা থেকে সৃষ্ট মিথেন গ্যাস বিশ্ব উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মূলত শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই বাতাসে অনেক বেশি পরিমাণে কার্বন-ডাই অক্সাইড সহ আরও বিষাক্ত গ্যাসগুলির পরিমাণ বাড়তে থাকে। এ গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্রমশ বৃদ্ধি এবং গ্রিনহাউস এফেক্টের ফলাফল হল বিশ্ব উষ্ণায়ন। এক কথায় মানুষের বিবেচনাহীন সক্রিয়তায় আজ আমাদের প্রিয় বসুন্ধরা এত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

এছাড়া বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশন মেশিন, রুম হিটার ইত্যাদি বৈদ্যুতিন শিল্পগুলি থেকে প্রচুর পরিমাণে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন নির্গত হয় এবং প্রসাধনী সামগ্রী তৈরিতেও প্রচুর পরিমাণে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন এবং প্রচুর গাড়ি চলার কারণে জ্বালানি থেকে কার্বন মনোক্সাইড ব্যবহৃত হয় যা বিশ্ব উষ্ণায়ন বাড়াতে মারাত্মক ভূমিকা পালন করে।

কাজেই, পৃথিবীতে গরম বা উষ্ণতা হঠাৎ করে বাড়ছে না। সবই মানুষের কৃতকর্মের ফল। আগামীতে যাতে ক্ষতির পরিমাণ কম হয় তার জন্য মানুষকে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে এবং নিজেদের পাপমোচনের দায় নিজেদেরই নিতে হবে।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট।

পাঠকের মতামত:

২০ জুলাই ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test