E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Walton New
Mobile Version

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও স্মার্ট বাংলাদেশ: এক নতুন দিগন্তের সন্ধান

২০২৪ জুন ২০ ১৮:১৫:২১
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও স্মার্ট বাংলাদেশ: এক নতুন দিগন্তের সন্ধান

ওয়াজেদুর রহমান কনক


চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (Industry 4.0) বিশ্বজুড়ে একটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করছে। এই বিপ্লবের মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT), রোবটিক্স, ব্লকচেইন, এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি। বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে "স্মার্ট বাংলাদেশ" ভিশন ঘোষণা করেছে, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশের প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। এটি এমন এক প্রযুক্তি যা মেশিনকে মানুষের মতো চিন্তা করতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে। বিভিন্ন খাতে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, এবং কৃষিক্ষেত্রে AI এর ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

এটি এমন এক সিস্টেম যেখানে বিভিন্ন ডিভাইস এবং সেন্সর ইন্টারনেটের মাধ্যমে একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকে। এর মাধ্যমে স্মার্ট হোম, স্মার্ট সিটি, এবং অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম তৈরি হচ্ছে।
রোবটের ব্যবহারে ম্যানুফ্যাকচারিং, লজিস্টিকস, এবং স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। রোবটের মাধ্যমে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সহজ এবং নিরাপদ হচ্ছে।

এটি একটি বিকেন্দ্রীভূত ডাটাবেস প্রযুক্তি, যা নিরাপদ এবং স্বচ্ছ লেনদেন নিশ্চিত করে। ফিনটেক, সরবরাহ চেইন ম্যানেজমেন্ট, এবং ভোটিং সিস্টেমে এর ব্যবহার ক্রমবর্ধমান।

বাংলাদেশ সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ গড়ার লক্ষ্যে "স্মার্ট বাংলাদেশ" ভিশন গ্রহণ করেছে। এই ভিশনের মূল দিকগুলো হলো:

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করতে শিক্ষার্থীদের জন্য ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ক্লাসরুম, এবং অনলাইন কোর্সের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে পারবে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে।

টেলিমেডিসিন, ই-হেলথ সার্ভিসেস, এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আধুনিক করা হচ্ছে। এর ফলে দূরবর্তী এলাকার মানুষও সহজে স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারবে।
IoT এবং ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার করে কৃষি খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কৃষকদের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে তাদের সাথে বাজারের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে।
স্মার্ট সিটি প্রকল্পের মাধ্যমে নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় স্মার্ট সলিউশন প্রয়োগ করা হচ্ছে।
দেশের জনগণের মধ্যে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে ব্যাপকভাবে প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রচলন প্রয়োজন।

উন্নত প্রযুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। এসব অবকাঠামো উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

তবে, এই চ্যালেঞ্জগুলোর পাশাপাশি ব্যাপক সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ:

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করবে এবং তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে।

প্রযুক্তিগত খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা দেশের বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে।

স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশন বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এবং স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশন বাংলাদেশের জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। যদিও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে এগুলোকে অতিক্রম করা সম্ভব। ভবিষ্যতে স্মার্ট বাংলাদেশ এক উদাহরণ হতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, এবং মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহারে একটি সমৃদ্ধ এবং উন্নত সমাজ গড়ে তোলা যাবে।

চতুর্থ শিল্প-বিপ্লব (Industry 4.0) সফল হলে বিশ্বব্যবস্থায় বিপুল পরিবর্তন আসবে। এই পরিবর্তন প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক, এবং পরিবেশগত প্রেক্ষাপটে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। এর ফলে নতুন নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি হবে। নিম্নে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই বিপ্লব সফল হলে কী কী পরিবর্তন আসতে পারে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

রোবটিক্স এবং অটোমেশনের মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়া অধিকতর দক্ষ ও স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠবে। উৎপাদন খরচ কমে যাবে এবং পণ্যের মান বৃদ্ধি পাবে। ডেটা সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত নতুন পেশা তৈরি হবে। তবে, অনেক প্রচলিত পেশা হারিয়ে যেতে পারে। চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের ফলে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন আরও সুসংগঠিত ও দক্ষ হবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ এবং লেনদেন দ্রুত ও সহজতর হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং ই-কমার্সের বিকাশের ফলে নতুন ব্যবসায়িক মডেল গড়ে উঠবে, যা অর্থনীতির ধরণ বদলে দেবে।

শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। প্রযুক্তিগত দক্ষতার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা সায়েন্সের উপর ভিত্তি করে নতুন কোর্স ও কারিকুলাম তৈরি হবে। কর্মজীবনে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে হলে মানুষকে আজীবন শিক্ষার ধারা বজায় রাখতে হবে।ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা উন্নত হবে। টেলিমেডিসিন এবং রিমোট পেশেন্ট মনিটরিং এর মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হবে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োটেকনোলজির উন্নতির ফলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতি আরও উন্নত হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবটিক্স প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হবে। স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, ড্রোন, এবং অন্যান্য অটোনোমাস সিস্টেম পরিবহণ ও অন্যান্য সেবাকে সহজ করবে। AI এবং মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির ব্যবহারে গবেষণা ও উদ্ভাবনে ব্যাপক অগ্রগতি হবে। স্মার্ট সিটি গড়ে উঠবে, যেখানে সবকিছু ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত থাকবে। ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, জ্বালানি ব্যবহার, এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ হবে।

প্রতিটি ডিভাইস ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত থাকবে, যার ফলে তথ্য আদানপ্রদান এবং যোগাযোগ দ্রুত ও সহজতর হবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রযুক্তির ভূমিকা বাড়বে।

সার্কুলার ইকোনমি মডেল গড়ে উঠবে, যেখানে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং অপচয় কমবে। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং পূর্বাভাস দেওয়া আরও সহজ হবে। ফলে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ সহজ হবে। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং দক্ষতা বিনিময় হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য প্রযুক্তির উন্নয়ন সামরিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলবে। সাইবার সিকিউরিটি এবং অন্যান্য নতুন নিরাপত্তা হুমকির মোকাবিলা করার প্রয়োজন হবে। বিশ্বব্যাপী ডেটা সুরক্ষা এবং প্রাইভেসি নিয়ে নতুন নীতিমালা গড়ে উঠবে। প্রতিটি দেশের সরকারকে এই নতুন নিয়ম-কানুনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ হবে।
চতুর্থ শিল্প-বিপ্লব সফল হলে বিশ্বব্যবস্থায় অভাবনীয় পরিবর্তন আসবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রযুক্তিগত, পরিবেশগত এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তনগুলো একদিকে নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে, অন্যদিকে নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করবে। এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হলে, আমাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হবে এবং প্রযুক্তিগত ও নৈতিক দিক থেকে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের সুফল ভোগ করা সম্ভব হবে এবং একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও সমতাপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

১৪ জুলাই ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test