টেকসই উন্নয়নের সংস্কৃতি কেন্দ্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া
ওয়াজেদুর রহমান কনক
টেকসই উন্নয়নকে যদি কেবল অর্থনৈতিক সূচক, অবকাঠামো নির্মাণ বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সমষ্টি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে মানবসমাজে স্থায়ী রূপান্তর ঘটাতে ব্যর্থ হয়। এই বিষয়টির দার্শনিক ভিত্তি সেই সীমাবদ্ধ ধারণাকে অতিক্রম করে। এখানে টেকসই উন্নয়নকে দেখা হয় একটি গভীর সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে—যেখানে মানুষের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, আচরণগত অভ্যাস এবং সমষ্টিগত স্মৃতি ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়। এসডিজির লক্ষ্যগুলো কাগজে বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সেগুলোর বাস্তবায়ন তখনই কার্যকর হয়, যখন তা মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে মিশে যায়।
এই দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। মানুষ কেবল উন্নয়নের উপকারভোগী নয়, বরং উন্নয়নের সক্রিয় নির্মাতা। মানুষ কীভাবে শেখে, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, কীভাবে প্রকৃতি, নারী, ভিন্ন মত বা ভিন্ন সংস্কৃতিকে দেখে—এসব প্রশ্নের উত্তর অর্থনীতি বা প্রযুক্তি একা দিতে পারে না। এগুলোর উত্তর নিহিত থাকে সংস্কৃতির ভেতরে। তাই এসডিজি বাস্তবায়নে সংস্কৃতিকে কোনো ‘সহযোগী উপাদান’ হিসেবে নয়, বরং সামাজিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই বিষয়টির দার্শনিক অবস্থান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: উন্নয়ন কার জন্য এবং কার দ্বারা? অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন দর্শন অনুযায়ী, মানুষকে উন্নয়নের বস্তু হিসেবে না দেখে বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—নাটক, গান, গল্প বলা, স্থানীয় উৎসব, কমিউনিটি আর্ট—মানুষকে কেবল বার্তা গ্রহণকারী নয়, বরং সহ-স্রষ্টা হিসেবে যুক্ত করে। এই প্রক্রিয়ায় এসডিজি একটি বাহ্যিক লক্ষ্য থেকে অভ্যন্তরীণ সামাজিক চর্চায় রূপ নেয়।
দার্শনিকভাবে এই বিষয়টি সংস্কৃতিকে একটি জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে দেখে, যা পরিবর্তনশীল, বিতর্কমুখর এবং ক্ষমতার সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। তাই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কেবল ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি সমালোচনামূলক সচেতনতা তৈরির একটি মাধ্যমও। লিঙ্গবৈষম্য, সামাজিক বঞ্চনা, পরিবেশ ধ্বংস বা সহিংসতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক বয়ান সমাজের গভীরে প্রশ্ন তোলে এবং বিকল্প মূল্যবোধ নির্মাণ করে। এই বিকল্প মূল্যবোধই সামাজিক রূপান্তরের ভিত্তি।
এসডিজি বাস্তবায়নে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকা বোঝার জন্য সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিসংখ্যান একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে। UNESCO Institute for Statistics (UIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংস্কৃতি আর নীতিগত বা তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিমাপযোগ্য উন্নয়ন সূচকের অংশে পরিণত হয়েছে। UNESCO-র Cultural Statistics Framework অনুসারে, সংস্কৃতি ও টেকসই উন্নয়নের সংযোগ বিশেষভাবে পরিমাপ করা হচ্ছে SDG Target ১১.৪.১ -এর মাধ্যমে, যেখানে প্রতি ব্যক্তি সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যয়কে সূচক হিসেবে ধরা হয়। এই সূচকের আওতায় তথ্য সংগ্রহের পরিসর দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২০ সালে যেখানে মাত্র ৩০টি দেশ এই সূচকে তথ্য সরবরাহ করেছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সংখ্যা বেড়ে ৭০টিরও বেশি দেশে পৌঁছেছে। এটি নির্দেশ করে যে বিশ্বব্যাপী সংস্কৃতিকে উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই গুরুত্ব দিচ্ছে।
UNESCO-র ২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে মাথাপিছু ব্যয় দেশভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। কোনো কোনো দেশে এই ব্যয় মাত্র ১ মার্কিন ডলার, আবার কোনো দেশে তা ৫১৫.৮ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ব্যয়ের পার্থক্য কেবল জাতীয় আয় বা GDP-র ওপর নির্ভর করে না। অনেক মাঝারি বা নিম্ন আয়ের দেশও তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে তুলনামূলকভাবে উচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে সংস্কৃতি কেবল অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিফলন।
এই বাস্তবতাকে আরও কাঠামোবদ্ধভাবে বিশ্লেষণের জন্য UNESCO “Culture|2030 Indicators” প্রকল্প চালু করেছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে ২০৩০ অ্যাজেন্ডায় সংস্কৃতির অবদানকে নিয়মিতভাবে ট্র্যাক করা হচ্ছে, যাতে উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট ও নীতি প্রণয়নে সংস্কৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করা সহজ হয়।
সংস্কৃতি যে কেবল নৈতিক বা ঐতিহ্যগত গুরুত্ব বহন করে তা নয়, বরং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এর অবদান পরিসংখ্যান দ্বারা স্পষ্ট। UNESCO-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা দেখায়, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল শিল্পসমূহ বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩.৯ শতাংশ অবদান রাখে এবং মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৫.৩ শতাংশ মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। এই খাতের মাধ্যমে শিল্পী, কারুশিল্পী, শিক্ষক, গবেষক, মিডিয়া কর্মীসহ বিপুল জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছে।
গৃহস্থালির পর্যায়েও সংস্কৃতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বৈশ্বিক গড় হিসেবে দেখা যায়, মোট গৃহস্থালির ব্যয়ের প্রায় ২.৫৯ শতাংশ সংস্কৃতি-সম্পর্কিত পণ্য ও সেবায় ব্যয় হয়। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সংস্কৃতির উপস্থিতি ও সামাজিক অংশগ্রহণের গভীরতা নির্দেশ করে।
দেশভিত্তিক উদাহরণ হিসেবে কেনিয়ার তথ্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সংস্কৃতি-সম্পর্কিত কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ দেখা যায়। শহরাঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ জনপরিসরে স্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রকাশ ও কার্যক্রমের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। একই সঙ্গে, গৃহস্থালির মোট ব্যয়ের প্রায় ১.৯ শতাংশ সংস্কৃতিক পণ্য ও সেবায় ব্যয় হয় এবং সাংস্কৃতিক পণ্যের রপ্তানি মোট রপ্তানির প্রায় ২.৭৭ শতাংশে অবদান রাখে। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে সংস্কৃতি শুধু পরিচয়ের বিষয় নয়; এটি বাস্তব অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ SDG 11-এর একটি কেন্দ্রীয় লক্ষ্য। Target 11.4-এর অধীনে বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে Indicator 11.4.1-এর মাধ্যমে। UNESCO-র UIS এই সূচক নিয়মিত হালনাগাদ করছে, যাতে দেশগুলোর অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। একই সঙ্গে Culture|2030 Framework-এর আওতায় ২২টি থিম্যাটিক সূচক ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে ঐতিহ্য সংরক্ষণ, GDP-তে সংস্কৃতির অবদান, সাংস্কৃতিক কর্মসংস্থান, সাংস্কৃতিক ব্যবসা, গৃহস্থালির ব্যয়, টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত।
সামগ্রিকভাবে, বৈশ্বিক তথ্য বলছে সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল শিল্পসমূহ বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৯.৫ মিলিয়ন মানুষকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বিশ্ব GDP-র ৩ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে সংস্কৃতি কেবল উৎসব, আচার বা নান্দনিক চর্চার বিষয় নয়; এটি টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক সংহতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানবিক রূপান্তরের একটি মৌলিক স্তম্ভ। যদিও সংস্কৃতি SDG-তে আলাদা লক্ষ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত নয়, তথাপি SDG 4, 8 ও 11-সহ বহু লক্ষ্যের সাফল্য সরাসরি সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। UNESCO-র ডেটা-ফ্রেমওয়ার্ক ও Culture|2030 Indicators-এর মাধ্যমে এখন বিশ্বব্যাপী এই সাংস্কৃতিক অবদানকে পরিমাণগত ও গুণগত উভয় দিক থেকেই মূল্যায়ন করা সম্ভব হচ্ছে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
পাঠকের মতামত:
- ফিফা সভাপতির পদত্যাগ চান স্পেনের ফুটবল কর্মকর্তা
- ‘যারা আমাদের কষ্ট দেখে হাসছো ও বিদ্রুপ করছো, তোমাদের ধন্যবাদ‘
- ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বিকল্প নয়, সক্ষমতা বৃদ্ধির হাতিয়ার’
- ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোকে জাতিসংঘের মহাসচিব দেখতে চান ট্রাম্প
- বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এক লাখ ডলার সহায়তা দিলো চীন
- ‘বিএনপি বিপ্লবের সন্তান, কোনো আত্মদান বৃথা যায় না’
- ইউপি চেয়ারম্যানের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণে হাইকোর্টে রুল
- 'রাজাকাররা যে কোনো লোককে গ্রেফতার করতে পারবে'
- সাতক্ষীরায় প্রাইভেটকার চালক সুমন হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা
- বি-স্ক্যান চেঞ্জমেকার অ্যাওয়ার্ডে মনোনীত ফরিদপুরের বিপ্লব মালো
- বন্দর নয়, মানদণ্ড গড়ার সময় এখন বাংলাদেশের
- অটো রিকশাচালক নাঈম হত্যায় দুইজনের যাবজ্জীবন
- জামায়াত এমপি নজরুলের ভিডিও নিয়ে দিনভর নানা তর্ক-বিতর্ক
- নির্মাণের সাত দিনেই ভেঙে গেল চেয়ারম্যানের নির্মিত ড্রেন
- ২০২৭ সালের মধ্যে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন করবে সরকার
- বগুড়ায় ছুরিকাঘাতে এক ব্যক্তি নিহত
- সোনাতলায় তিন দিনব্যাপী ১৬ প্রহরব্যাপী লীলা কীর্তন অনুষ্ঠিত
- উন্নয়নের খোঁজখবর নিতে কাপ্তাইয়ে ইউএনডিপির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল
- সদ্য লঞ্চ হওয়া গ্যালাক্সি এ৩৭ ৫জি’র দাম কমালো স্যামসাং
- রেমিট্যান্স বনাম প্রবাসীদের অদেখা অশ্রু
- গোপালগঞ্জে গেস্ট হাউজ থেক ৫ নারীসহ আটক ১১
- বিশ্বকাপের ভক্তদের উৎসবে হামলার হুমকি তদন্ত করছে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ
- সাতক্ষীরায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ইলেকট্রিশিয়ানের মৃত্যু
- নড়াইলে শিশুকে ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষক পলাতক
- কাপ্তাই জেটিঘাটে ইঞ্জিনচালিত বোট থেকে দিনমজুরের মরদেহ উদ্ধার
- ডাক্তার হতে চায় মহম্মদপুরের কোহেলী
- ‘পকেট-সাইজড জায়ান্ট’ অনার প্যাড এক্স৭ এখন বাজারে
- প্রতিবন্ধীর টাকা মেরে খাওয়ার অভিযোগে মুন্সিগঞ্জ কোর্টে মামলা
- আবারও ফোবানা পুরুস্কার পেলেন বাংলা প্রেস সম্পাদক ছাবেদ সাথী
- বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পলাশবাড়ীতে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ পালিত
- নিয়োগ পাচ্ছেন ৩৬ হাজার শিক্ষক
- কাঁঠাল
- নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক কর্মকর্তাদের মিলনমেলা ছিনতাই
- বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেনের মুখে যুদ্ধ কথা
- খুলনায় ‘মদপানে’ পাঁচজনের মৃত্যু
- যশোর এম এম কলেজে পিঠা উৎসব মিলন মেলায় পরিণত
- প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জুয়া এখন অনলাইনে
- দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সম্প্রসারণ: তৃণমূলে ব্যাপক পদক্ষেপের আহ্বান
- বিশ্বের সুখী দেশের তালিকায় ১১ ধাপ পেছাল বাংলাদেশ
- গণহত্যায় স্বামী ও স্বজন হারানো এক মায়ের বয়ান
- সমরেশ মজুমদার সাহিত্য পুরস্কার পেলেন সেলিনা হোসেন
- এমন যদি হতো
- টুনিরহাট গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে নওগাঁ
- ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’র শুরুটা আশা জাগানিয়া
- ইউপি চেয়ারম্যানের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণে হাইকোর্টে রুল
-1.gif)








