E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

জীবনযুদ্ধে লড়াকু সৈনিক শ্যামনগরের সোনামনি

২০২০ সেপ্টেম্বর ২৪ ১৯:৫৫:৩৭
জীবনযুদ্ধে লড়াকু সৈনিক শ্যামনগরের সোনামনি

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন উপকুলবর্তী জেলা সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় উপজেলা শ্যামনগর। সুন্দরবন  উপকুলীয় ইউনিয়নের মধ্যে রয়েছে গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ ও রমজাননগর। এসব ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ সুন্দরবনের বনজ সম্পদ, নদী ও সাগরের মৎস্য, কাঁকড়া আহরণের উপর নির্ভরশীল। তাই সুন্দরবনে গোলপাতা, গরান , সুন্দরী গাছ কাটার পাশপাশি সাগর ও নদীতে মাছ ধরতে যেয়ে বা মধু সংগ্রহ করতে যেয়ে অনেক পুরুষ ও নারী বাঘের হামলায় নিহত হয়েছেন। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুরুষদের সংখ্যা অনেক বেশি। তবে পরিবারের  একমাত্র আয়ক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী বিধবা হওয়ায় সন্তান সন্ততি নিয়ে  অভিশপ্ত ও মানববেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হন। শ্বশুর বাড়ির লোকেরা এমনভাবে গালি দেন যে, বিয়ে না করলে তাদের ছেলে যেন হাজার বছর বেঁচে থাকতো। অনেকের শ্বশুর বাড়ি ও বাপের বাড়িতে ও জায়গা হয়নি। অপায়ার বদনাম নিয়ে  সন্তান সন্ততি নিয়ে বাস করতে হয়েছে নদীর চরভরাটি সরকারি খাস জমিতে। আবার কারো আশ্রয় হয়েছে ধনাঢ্য ব্যক্তির জমির এক কোনে।

একাধিক বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ ও রমজাননগর ইউনিয়নে ২০০০ সাল থেকে চলতি বছরের আগষ্ট মাস পর্যন্ত সুন্দরবনে ৫০৫ জন জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়াল বাঘের আক্রমণে মারা গেছেন। এ ছাড়াও আশাশুনি উপজেলায়ও কয়েকজন মারা গেছেন।

শ্যামনগরের মন্সিগঞ্জ সদরের রাধাকান্ত সরদার সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবন জীবিকা নির্বাহ করতেন। ২০ বছর বয়সী রাধাকান্তের সঙ্গে একই গ্রামের বনজীবী ভবতোষ সরদারের ১৫ বছর বয়সী মেয়ে সোনামনির বিয়ে হয় ১৯৯৪ সালে। ছেলে বাবুর বয়স যখন চার বছর এমনই এক সময়ে ১৯৯৯ সালে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেয়ে বাঘের আক্রমণে মারা যান রাধাকান্ত সরদার। একমাত্র ছেলেকে কিভাবে মানুষ করবেন, কিভাবে লেখাপড়া শেখাবেন, থাকবেন কোথায় এসব চিন্তা করতে করতে ঘুম হারাম হয়ে যায় বিধবা সোনামনির। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা তাকে অপয়া, স্বামী খেকো, অলক্ষী বলে ঘৃণার চোখে দেখতে থাকে। একপর্যায়ে পাড়া প্রতিবেশিরা অবিবাহিত দেবর ভবেন সরদারের সাথে সোনামনির বিয়ে দেয়। ভবেন সরদারও সুন্দরবনে মাছ ধরে সংসার চালান। সোনামনির দঃখ কিছুটা লাঘব হয়।

অতীতকে মুছে ফেলে নতুন ভাবে স্বামী সংসার শুরু করে সোনামনি। নতুন করে এক ছেলে ও দু’ মেয়ের মা হয় সোনামনি। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে অভাবেই দিন কাটতো সোনামনির। কিন্তু বিধি বাম। ২০০৯ সালে ভবেন সরদারও সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেয়ে বাঘের আক্রমণে মারা যান। সোনামনির চোখে মুখে তখন হতাশার ছাপ। নিরুপায় হয়ে সন্তানদের বাঁচাতে অন্যের জমিতে দিন মজুর ও নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাতো সোনামনি। মেয়ে দু’টিকে নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে দিলেও দু’ ছেলেকে বিয়ে দিয়ে বৌমা ঘরে আনাার কয়েক মাস না যেতেই কপাল মন্দ হয় সোনামনির। একপর্যায়ে শেষ সম্বল দোচালা ঘরে একাকি বসবাস করে কখনো নদীতে জাল টেনে আবার কখনো অন্যের মাছের ঘেরে দিন মজুর খেটে জীবনসংগ্রামে নেমে পড়েন সোনামনি।

সম্প্রতি সোনামনি বেসরকারি সংস্থা লিডার্স এর বাঘ বিধবা দলের সদস্য হয়ে সুদ বিহীন ১০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়িতে পাতি হাঁস পালন করছেন। চলতি বছরের মার্চের শেষের দিকে জেলায় করোনা ভাইরাসের আক্রমণ দেখা দেওয়ায় আবারো চরম হতাশার মুখে পড়েন সোনামনি। লকডাউনের কারণে মজুরি বন্ধ হয়ে যায়। অভাবের সংসারে করোনা কালীন বেসরকারিভাবে খাদ্য প্যাকেজ, হাইজিন প্যাকেজ এবং ৩০ কেজি চাল সহায়তা পান তিনি। করোনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২০ মে আম্ফানের আঘাত। আম্ফানের আঘাতে উপকূলীয় এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।

সোনামনি যখন হতাশ হয়ে দিন গুনছেন কবে করোনা যাবে। ঠিক এমনই এক সময়ে গত ২০ আগষ্ট অমাবস্যার জোয়ারও অতিবৃষ্টিতে সুন্দরবন উপকুলবর্তী গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনি, মুন্সিগঞ্জে নদীবাঁধ ভেঙে এলাকা পানিবন্দি হয়ে পড়ে। মানুষের বসবাস অনুপোযোগী হয়ে পড়ে এলাকা। হাঁস মুরগি ও গবাদি পশু নিয়ে মানুষকে চরম বিপদে পড়তে হয়। রাস্তা ঘাট মানুষ চলাচলের অণুপোযোগী হয়ে পড়ে। কি করবে ভেবে পায়না সোনামনি। এমন পরিস্থিতিতে সোনামনির মত সব বাঘ বিধবাদের জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। বর্তমান পরিস্থিতি কাটিয়ে সোনামনি কি পারবেন একটু সুখের মুখ দেখতে?

(আরকে/এসপি/সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০)

পাঠকের মতামত:

২৮ অক্টোবর ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test