E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভূমি চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

২০২২ জুন ০৫ ১৯:০১:৪৩
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভূমি চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শাহ্ আলম শাহী, চট্রগ্রাম থেকে ফিরে : সবুজ পাহাড়ে ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি। শহরের কোলাহল আর যান্ত্রিকতা থেকে দূরে অবস্থিত এ ক্যাম্পাস যেন প্রকৃতির কোলে গড়ে উঠা এক অপরূপ ও অনন্য নৈস্বর্গ। দেশের সবচেয়ে বড় আয়তনের এ বিদ্যাপীঠ যেন প্রকৃতি আর মানব প্রাাণের মেলবন্ধন। সবুজ বৃক্ষরাজির উপর উড়ন্ত বিচিত্র রঙের হরেক রকম পাখি, সবুজ পাহাড়ের কোলে থাকা হরিণ, অজগর কিংবা বিচিত্র আর দুর্লভ প্রাণিরর জীবন্ত জাদুঘর চবি ক্যাম্পাস। ঝুলন্ত সেতু ঝর্ণাধারা, উদ্ভিদ উদ্যান, জাদুঘর, রহস্যময় চালন্দা গিরিপথ কিংবা সুবিশাল মাঠ আছে এ ক্যাম্পাসে! এসবের মায়াবী সৌন্দর্য উপভোগ করলে জুড়িয়ে যায় প্রাণ।

ষড়ঋতুর পালাবদল হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। গ্রীষ্মের আগমনে রুক্ষ প্রকৃতি। হঠাৎ সবুজ পাহাড় ঘিরে কালো মেঘের আনাগোনা আর কালবৈশাখী ঝড়, বর্ষার আগমনে প্রকৃতির সতেজতা লাভ, শরতের কাশফুল, হেমন্তের সোনালী ধান কিংবা ঋতুরাজ বসন্তের ফোঁটা ফুল সবই দেখা যায় চবি ক্যাম্পাসে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর হাটহাজারিতে ১৭৫৩ একর পাহাড়ি এবং সমতল ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আয়তনের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় এটি। বর্তমানে উপাচার্য (ভিসি) ড. শিরীণ আখতার।

প্রকৃতি তার অপার মহিমায় সাঁজিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে। পাহাড় থেকে নেমে আসা জলরাশির খেলা ও ঝরনার পাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য,ঝুলন্ত সেতু,কাটাপাহাড়সহ মানবসৃষ্ট স্থাপনাগুলোও প্রকৃতিপ্রেমি সহ যে কাউকে আকৃষ্ট করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বর্ষে অধ্যায়নরত দিনাজপুরের ছেলে শাহ্ শৈবাল রীশাদ জানালেন,তিনি ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে দেশের ১০টি বিশ্ববিদ্যায়ে অধ্যায়নের সুযোগ পেলেও তাকে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতি আকৃষ্ট করায় শেষে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। এখানকার প্রকৃতি ও পরিবেশ তাকে মোহিত করেছে। দিনাজপুর থেকে অনেক দূরে হলেও এ বিশ্ববিদ্যালয় অনেক ভালো বলেই তার কাছে মনে হচ্ছে।

শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হৃদয় জানালেন, তার পড়া-লেখা শেষেও তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাড়তে খুবই কষ্ট পাচ্ছেন। তাকে প্রতিমূহুর্ত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস আকড়ে আছে। তাই,এ বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যেতে তার খুবই কষ্টের।

আরেক শিক্ষার্থী রুমানা পাভীন জানালেন, ছুুঁটিতে বাড়ি গিয়েও তাকে ভালো লাগেনা, ক্যাম্পাস ছেড়ে বাসায় থাকতে। তিসি যেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকেই ভালোবেসে ফেলেছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো শাটল ট্রেন। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে এটি। ক্যাম্পাস শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দুরে হওয়ায় ছাত্রদের যাতায়াতের জন্য শাটলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রোজ ১৮-২০ হাজার শিক্ষার্থীর যাতায়াতের মাধ্যম এই শাটল ট্রেন। পৃথিবীতে একমাত্র চবিতে বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটল ট্রেন এখনও চলাচল করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ বলা হয় শাটল ট্রেনকে।

প্রধাান ফটক থেকে সামনের দিকে বিশাল পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বিস্মৃত পিচঢালা রাজপথ, যার নাম কাটা পাহাড়। দুপাশে সুউচ্চ পাহাড় মাঝখান দিয়ে রাস্তা, একটু পরপর যাত্রী ছাউনি এবং পাহাড়ের উঁচু উঁচু টিলাতে, গাছ-গাছালিতে নানা প্রজাতির বণ্যপ্রাণি এবং মায়া হরিণের লুকোচুরি সত্যিই দর্শনার্থীর মুহূর্তেই নজর কেড়ে নিতে সক্ষম। নান্দনিক নকশায় গড়া বাণিজ্য ভবন এবং সামনের দিকে একে একে শহীদ মিনার, বুদ্ধিজীবী চত্বর, গ্রন্থাকার চত্বর, আইটি ভবন, জাদুঘর, মুক্তমঞ্চ, কলা অনুষদ, জারুলতলা, চাকসু এবং জনপ্রিয় কলা অনুষদের ঝুপড়ি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকটা দৃষ্টিনন্দন করেছে ফরেস্ট্রি এরিয়া। ইনস্টিটিউট অফ ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের উদ্যোগে করা সবুজ বনায়ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসকে একটি আকর্ষনীয় পর্যটন স্পটে পরিণত করেছে। এখানে রয়েছে, দেশের মহাবিপন্ন সবচেয়ে উঁচুবৃক্ষ বৈলাম, হেলিপ্যাড, লেক, সুইমিংপুল, মেমোরিয়াল গার্ডেন ইত্যাদি।

মহাবিপন্নে দেশের পাহাড়ি এলাকায় জন্ম নেয়া বৈলাম গাছ নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্সস গবেষণা করছে। দেশের সবচেয়ে উঁচু এই বৃক্ষটি লম্বায় ২৪০ ফুটের চেয়েও বেশি।বৈলামে মতো ঝুঁকিতে রয়েছে,দেশের ১২৮ প্রজাতির গাছ। আর এরই মধ্যে ৬৯ প্রজাতির গাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মহাবিপন্ন বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ বৈলামের বৈজ্ঞানিক নাম এ্যানিসোপটেরা স্ক্যাফুলা।

বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালেয়শিয়া, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় এটি দেখা যায়। বাংলাদেশে এই বৈলাম বৃক্ষের ২৪ টি’র অস্তিত্ব পাওয়া দেশে। দেশের পার্বত্য চট্রগ্রাম, রাঙামাটি,বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের প্রান্তিক বনে বিক্ষিপ্তভাবে পাহাড়ি অঞ্চলে বৈলাম গাছ জন্মে। এরমধ্যে পাহাড় বেষ্টিত চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ গবেষণা উদ্যানে তিনটি,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান উদ্যানে দু’টি এবং ঢাকার মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে দু’টি গাছ রয়েছে । অনেকে অতি দুর্লভ প্রজাতির এই গাছ পর্যবেক্ষণ করছেন।মহাবিপন্ন এই বৃক্ষের অস্তিত্ব রক্ষায় চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স এ নিয়ে গবেষণা করছে।

বৈলাম উদ্ভিদ পত্র সরল,দীর্ঘায়িত। ফুল মসৃণ, রং হলুদাভ সাদা। বীজ চড়কারে ঘুরে দূরে পড়ে,উল্টো চারা গজায়। কাঠ বিড়ালী ও টিয়া পাখির প্রিয় খাবার বৈলাম বীজ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈলাম বৃক্ষ বিপন্নে অপরিকল্পিত জুম চাষ দায়ী। জুম চাষের জমি তৈরি করতে গিয়ে নির্বিচারে গাছ পোড়ানোয় ঝুঁকির মুখে পড়েছে এই গাছ। গবেষকদের আশঙ্কা আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে দেশ থেকে হারিয়ে যাবে এই গাছ।বৈলামে মতো ঝুঁকিতে রয়েছে, দেশের ১২৮ প্রজাতির গাছ। আর এরই মধ্যে ৬৯ প্রজাতির গাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স বিভাগ মহাবিপন্ন এই বৈলাম বৃক্ষের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রায় পাঁচ হাজার চারা উৎপাদন করেছে। বৈলাম গাছের বংশ বিস্তারে এই চারাও সরবরাহ করছেন তারা।

এছাড়াও বাঁশ গাছের প্রজাতি রক্ষায় গবেষণা করছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট। পাশাপাশি বংশ বিস্তারে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ গাছের চারা উৎপাদন করে সরবরাহ করছেন তারা। পাহাড়ের কোলে গড়ে উঠা এ বিশ্ব বিদ্যালয়ের আকাঁবাকাঁ পথ, বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও বন্যপ্রাণি যে কাউকে আকৃষ্ট করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব বিজ্ঞান অনুষদের প্রফেসর ড.ওয়াহহিদা সুমি জানালেন,চবি ক্যাম্পাসে রয়েছে নানা প্রজাাতির উদ্ভিদ ও প্রাণি। কাটা পাহাড়ে,বাণিজ্য অনুষদের পেছনে কিংবা ফরেস্টিতে দেখতে পাওয়া যায় বাদামী রংয়ের হরিণ। হরিণগুলো বেশ লাজুক ও মায়াবী অগণিত লুকায়িত আকর্ষণের ভিড়ে চবি ক্যাম্পাসে রয়েছে রহস্যময় চালন্দা গিরিপথ। প্রাকৃতিক ঝরনা, পাহাড়ের প্রাণজুড়ানো রূপে বহুদিন ঢাকা পড়েছিল চালন্দা গিরিপথের সৌন্দর্য।
প্রায় ৩০হাজার ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আবাস ১২টি আবাসিক হল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হল জীবনের হাজারো সমস্যাকে নিত্যদিনের সঙ্গী করেই শিক্ষার্থীরা তাদের অধ্যায়ন চালিয়ে যাচ্ছেন। এতো ক্লান্তি আর পরিশ্রমের মাঝেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পায় এক ধরনের সুখের সন্ধান। এ সুখকে পুঁজি করেই ক্যাম্পাসের আনান্দঘন মুহূর্তগুলো অতিবাহিত করেন তারা। এর ফলে শিক্ষাজীবন শেষ করেও অনেকে আবার ফিরে আসেন ফেলে যাওয়া স্মৃতির টানে। হয়তো তাই ভেবেই কেউ কেউ গেয়ে উঠেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিনগুলি যায় হারিয়ে যায়, উজ্জ্বল বর্ণালী দিনগুলি মিলিয়ে যায় হাওয়ায়।’

(এস/এসপি/জুন ০৫, ২০২২)

পাঠকের মতামত:

২৬ জুন ২০২২

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test