ঈশ্বরদীতে হিন্দু সম্পদায়ের সূর্য্য (ছট) পূজা অনুষ্ঠিত
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি : ঈশ্বরদীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের দুই দিন ব্যাপী সূর্য্য (ছট) পূজা উৎসব মূখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সূর্য্য দেবের উদ্দেশ্যে পূজাদানের জন্য বুধবার (১০ নভেম্বর) বিকেলে এবং বৃহস্পতিবার (১১ নভেম্বর) ভোরে ঈশ্বরদী উপজেলা চত্বরের পুকুরে শত শত নারী-পুরুষ উপস্থিত হয়। বিশেষ করে অবাঙ্গালি হিন্দু নারীরা উপোস করে কোমড় পর্যন্ত পুকুরে নেমে এই পূজার সূচনা করেন। সূর্য্য অস্ত এবং সূর্য্যোদয় পর্যন্ত এই পূজা চলে।
ভোরে সূর্যোদয়ের আগে এবং অস্ত না যাওয়া পর্যন্ত নারীরা পুকুরে নেমে সূর্য্যদেবের অর্চনা করে। ছট পূজায় কোনো মূর্তি উপাসনার স্থান নেই। এতে ডুবিত এবং উদিত সূর্যকে পূজা করা হয়। পূজার দু’দিন আগে লাউ ভাত এবং একদিন আগে খির ভাত খাওয়ার সাথে ৩৬ ঘণ্টার এক কঠোর ব্রত পালন করতে হয়। পূজায় সম্পূর্ণ সাত্বিক নৈবেদ্য ইত্যাদি কূলা, ডালা বা পাচিতে রেখে উৎসর্গ করা হয়। বিভিন্ন ফল মূল, মিঠাই ইত্যাদির সঙ্গে পরম্পরাগত বিহারী লোকখাদ্য "ঠেকুয়া" প্রস্তুত করে নৈবেদ্য রূপে প্রদান করা হয়।
এ সময় নুন-মশলা বর্জিত সম্পূর্ণ নিরামিষ খাদ্য গ্রহণ করা হয়। পূজার শেষে আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশীদের প্রসাদ বিতরণ এই পূজার অন্যতম নিয়ম। এই পূজায় অনেককে নদীর ঘাটে গিয়ে পূজা করার দৃশ্যও দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমানে এই পূজা সার্বজনীন রূপ পেয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ভাষাভাষী এখন মানুষ এই পূজার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করে পূজায় সামিল হতে শুরু করেছেন।
ছটপুজো আসলে সূর্য উপাসনা। কার্তিক মাসের শুকপরে ষষ্ঠী তিথিতে উদযাপন করা হয় ছটপুজো। ষষ্ঠী শব্দ থেকেই এসেছে ছট বা ছঠ। মূলত পূর্বভারত জুড়ে এই উৎসব পালন রমরমা হলেও পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। সূর্য এবং তাঁর পত্নী ঊষা অর্থাৎ ছটি মাইয়ের পুজোই ছটপুজো। পৃথিবীতে জীবনের স্রোত অবিরাম রাখার জন্য সূর্যকে এই পুজোর মাধ্যমে উপাসনা করা হয়।
এই ছট পুজো প্রচলনের নেপথ্যে রয়েছে একটি গল্প। পুরাণ মতে, নি:সন্তান রাজা প্রিয়ংবদকে পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করার পরামর্শ দেন মহর্ষি কাশ্যপ। সেই যজ্ঞ সম্পন্ন হলে প্রিয়ংবদের স্ত্রী মালিনীকে প্রসাদ হিসেবে পায়েস খেতে দেন মহর্ষি। কিন্তু দেখা যায়, মৃত সন্তান প্রসব করেন মালিনী। পুত্রশোকে বিহব্বল রাজা প্রিয়ংবদ সিদ্ধান্ত নেন প্রাণত্যাগের। ঠিক সেই সময় প্রকট হন ব্রহ্মার মানসপুত্রী দেবসেনা। তিনি প্রিয়ংবদকে তাঁর পুজো করার নির্দেশ দেন। তাঁর আশীর্বাদে সন্তানকে ফের ফিরে পান রাজা। বলা হয়, এই দেবীর উৎপত্তি মূল বা আদি প্রবৃত্তির ষষ্ঠ অংশ থেকে। তাই তিনি ষষ্ঠী বা ছটি মাইয়া। এই পূজা সূর্য্যদেব ও তার পত্নি ঊষার (ছটী মাঈ) প্রতি সমর্পিত হয়, যেখানে তাকে পৃথিবীতে জীবনের স্রোত বহাল রাখার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও আশীর্বাদ প্রদানের কামনা করা হয়।
কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপাবলি পালনের পর চার দিনের এই ব্রতের (কার্তিক) শুকা চতুর্থী থেকে (কার্তিক) শুকা সপ্তমী সবচেয়ে কঠিন ও তাৎপর্যপূর্ণ রাত্রি হল কার্তিক শুকা ষষ্ঠী; বিক্রম সংবৎ-এর কার্তিক মাসের শুকা ষষ্ঠী তিথিতে এই ব্রত উদযাপিত হওয়ার কারণে এর নাম ছট রাখা হয়েছে। এই পূজার কবে কোথায় উৎপত্তি হয়েছিল তার কোনো স্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায় না। কিন্তু কিছু পৌরাণিক আখ্যানে ছট পূজার নীতি নিয়মের সাথে মিল থাকা উৎসব দেখা যায়।
সূর্য্যোপাসনার এই অনুপম লৌকিক উৎসব পূর্ব ভারতের বিহার, ঝাডখন্ড, পূর্ব উত্তর প্রদেশ এবং নেপালের তরাই অঞ্চলে পালিত হয়ে থাকে। সূর্য্য পূজা উপলে ঈশ্বরদীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎসব মূখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
(এসকেকে/এএস/নভেম্বর ১১, ২০২১)
