মোঃ আব্দুল কাইয়ুম, মৌলভীবাজার : “চা বাগানে বহুকাল ধরে বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। এখানে নারীদেরকে অনেকটা অবদমন করে রাখা হয়। চা বাগানে নারীর সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তনে বাগানের পুরুষসহ সকলকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের বঞ্চনা ও বৈষম্যের জায়গাগুলো সামনে তুলে ধরতে এখানে পুরুষদেরকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।” নারীর প্রতি সহিংসতা: সমাধানে ১৬ দিনের প্রচারাভিযান পালন উপলক্ষে মোড়ক উন্মোচন ও সংলাপে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন এসব কথা বলেন।

বৃহস্পতিবার (৯ ডিসেম্বর) সকালে কানাডিয়ান দুতাবাসের সহায়তায় সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড) এর আয়োজনে শ্রীমঙ্গলের ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রধান অথিতির বক্তব্য এসব কথা বলেন বরেণ্য প্রবীণ কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন সেড-এর পরিচালক ফিলিপ গাইন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন কানাডীয় হাইকমিশনের প্রতিনিধি (রাজনৈতিক) রায়া ইয়ামপোলস্কি। এতে আরও বক্তব্য দেন বিসিএসইউ-এর জুড়ি ভ্যালীর সহ-সভাপতি শ্রীমতি বাউরিসহ বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন (বিসিএসইউ)-এর নেতৃবৃন্দ, নারী চা শ্রমিকসহ অন্যান্যরা।

অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে চা বাগানে নারীর সুরক্ষায় জীবন দক্ষতা সহায়িকা’ শীর্ষক বই-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এরপর সহায়িকাটির সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন বইটির লেখক সেড-এর পরিচালক ফিলিপ গাইন। সহায়িকা সম্পর্কে তিনি বলেন, “সেড চা বাগানের নারী শ্রমিক, ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে মাঠ পর্যায়ে আলোচনা করে গবেষণাধর্মী এ সহায়িকা প্রকাশ করেছে। এ সহায়িকায় নারীর অবস্থা এবং তার প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা, পঞ্চায়েত ও শ্রমিক ইউনিয়নে নারীর প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ, শ্রম আইন ও নারীর কর্মপরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত ও পর্যালোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে।”
বিসিএসইউ-এর সহ-সভাপতি জেসমিন আক্তার বলেন, “চা বাগানে নারীর উন্নয়নে প্রধান অন্তরায়সমূহ হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, সামাজিক কুসংস্কার এবং শিক্ষার অভাব। নারীদের উন্নয়ন ঘটাতে হলে আমাদের নারীদেরকে শিক্ষিত হতে হবে এবং নিজেদের বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিষয়সমূহ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।”

শ্রীমঙ্গল উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মিতালী দত্ত বলেন, “চা বাগানে ধীরে ধীরে হলেও পরিবর্তন আসছে। একসময় নারীরা ইউনিয়ন ও প্রশাসনে নারীদের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ অনেক কম ছিল। কিন্তু এখন তা বাড়ছে।” নিজের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একসময় আমি সভা-সমাবেশে কথা বলতে পারতামনা। কিন্তু এখন আমি উপজেলা প্রশাসনে নারীদের প্রতিনিধিত্ব করছি। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই পুরুষদের উচিত নারীদের সমান চোখে দেখা।”

বিসিএসইউ-এর নির্বাহী উপদেষ্টা রামভজন কৈরী বলেন, “চা বাগানের পঞ্চায়েত ও ইউনিয়নে পুরুষদের চাইতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ কম। তবে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াবার জন্য ইউনিয়নের প্রচেষ্টা আছে। যেমন, চা বাগানে ভ্যালী ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সহ-সভাপতি ও সহ-সম্পাদক পদগুলো নারীদের জন্য সংরক্ষিত। এছাড়া অন্যান্য পদেও নারীদের নারীদের অংশগ্রহণ উন্মুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সেকশনে সর্দার পদে নারীদেরকে নিয়োগের জন্য বর্তমানে কাজ করা হচ্ছে।”

চা বাগানে নারীর অবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “চা বাগানে নারীদের এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। নারীর উন্নয়নের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আমাদেরকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। আর এর জন্য দরকার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তন। একইসাথে ইউনিয়ন ও স্থানীয় প্রশাসনে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের অধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে পারে।”

মজুরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “চা বাগানে তিনটি বড় সমস্যা হচ্ছে ন্যায্য মজুরি, ভূমির অধিকার এবং উচ্চশিক্ষার অভাব। ২০১৯ সালে চুক্তির মাধ্যমে ঠিক হওয়া মজুরি কাঠামো মালিকেরা ২০২১ সালে ঘোষণা করতে চায়। অথচ চলতি বছরে চায়ের উৎপাদন ও দাম অনেক বেড়েছে। কিন্তু মালিকরা বেআইনিভাবে তাদের প্রদেয় অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের মজুরির হিসাব দেয় ৪০০ টাকা। এটি সম্পূর্ণভাবে শ্রম আইনের লঙ্ঘন।”

অনুষ্ঠানের শুরুতে চা বাগানের সাংস্কৃতিক দল প্রতীক থিয়েটারের শিল্পীদের মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করে। তারা নাচ-গানের মাধ্যমে চা শ্রমিকদের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতিকে সবার সামনে তুলে ধরেন। দ্বিতীয় অধিবেশনে বৈষম্য ও সহিংসতা নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় কনের কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর চা বাগানের নারী শ্রমিক আশা অরনাল এবং মনি গোয়ালা।

(একে/এএস/ডিসেম্বর ০৯, ২০২১)