চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচন
মৌলভীবাজারে ইউপি নির্বাচন ঘিরে প্রচার প্রচারণা এখন তুঙ্গে
মোঃ আব্দুল কাইয়ুম, মৌলভীবাজার : তৃণমূলে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সবচেয়ে বড় আয়োজন ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে দীর্ঘ পাঁচবছর পর। মৌলভীবাজার সদরের ১২টি ইউনিয়নে চলতি মাসের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্টিত হচ্ছে এই নির্বাচন। জেলা সদরের বাহিরে পার্শবর্তী রাজনগর উপজেলার ৮টি ইউনিয়নেও একই দিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইউপি নির্বাচন। অর্থাৎ আর মাত্র চারদির পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহু প্রতিক্ষিত এ নির্বাচন। প্রবাসী অধ্যুসিত জেলা সদরের ১২টি ইউনিয়নে ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ ৬০ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী এখন বিরামহীন ছুটে চলেছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। নিজেদের কর্মী পাঠিয়ে বাড়ি বাড়ি লিফলেট বিতরণ করে ভোট চাচ্ছেন। প্রার্থীরাও নিজেদের সমর্থকদের সাথে নিয়ে প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী পিকাপ গাড়ি কিংবা অটোরিকশায় মাইকে ভোট চেয়ে প্রচার প্রচাণা চলছে বিরামহীন। প্রচারের ক্ষেত্রে নানান ধরনের জনপ্রিয় লোক ও বাউল গানের সুরে সুরে বাদ্য যন্ত্রের তালে তালে নেচে গেয়ে ভোট চাচ্ছেন নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে।
এবারের নির্বাচনে প্রার্থীরা সোস্যাল মিডিয়াও বেশ সরব দেখা যাচ্ছে বেশি। ফেইসবুক ওয়ার্টসঅ্যাপসহ অন্যান্য সামাজিক প্লাটফরমে নির্বাচনী প্রচারণার ছবি নিয়মিত আপলোড দিচ্ছেন এবং সাথে সাথে ভোটারদের কাছে ভোট চেয়ে নিয়মিত ভিডিও বার্তা সোস্যাল মিডিয়া ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আর এসব প্রার্থীদের ভোটার ও সমর্থকরাও সোস্যাল মিডিয়ার নিয়মিত পোস্টগুলো লাইক এবং শেয়ার দিচ্ছেন। ভোটারদের মনোভাব বুঝতে পারা প্রার্থীদের ক্রিয়েটিভ চিন্তাধারা সোস্যাল মিডিয়ায় যত বেশি প্রচার হচ্ছে তত বেশি প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা কিংবা নির্বাচনে জয়ী হতে বড় একটি ভুমিকা রাখবে বলে ধারণা প্রার্থীদের।
অধিকাংশ ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী সংখ্যা বেশি থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। প্রার্থীরাও সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচনে জয়ী হতে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রতির ফুলঝুড়ি। তবে প্রার্থী নির্বাচনে ভোটাররাও মিলাচ্ছেন বিগত দিনের হিসেব নিকেশ। মোট কথা, সময় যত গড়াচ্ছে ভোটের মাঠের চিত্রও প্রতিদিন তত পরিবর্তিত হচ্ছে। কারন জেলা সদরের ১২টি ইউনিয়নের অধিকাংশ ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বাহিরে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্ত অবস্থানে থাকায় বিপাকে নৌকার প্রার্থীরা। যদিও নৌকার প্রার্থীদের বিজয়ী করতে জেলা আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতারা এখন প্রতিদিনই দলীয় প্রার্থীর পক্ষে বিভিন্ন ইউনিয়নের কোন না কোন নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিয়ে নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাচ্ছেন এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে জেলা সদরের ১২টি ইউনিয়নে এখন বিরাজ করছে নির্বাচনী উৎসবের পূর্ণ আমেজ। নির্বাচনকে সামনে রেখে ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামের রাস্তার অলিগলিতে এখন শোভা পাচ্ছে প্রার্থীদের প্রচারণার বিলবোর্ড। প্রতিটি রাস্তায় রাস্তায় পোষ্টারে ছেয়ে গেছে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলের চায়ের দোকানগুলোতে ততই বাড়ছে ভোটারদের উপস্থিতি। চায়ের দোকান গুলোতে গরম চায়ের ঝরে এই কনকনে শীতে অনেকটা উষ্ণতাও বাড়াচ্ছে ।
মঙ্গলবার (২১ ডিসেম্বর) সদরের মোস্তফাপুর, নাজিরাবাদ, গিয়াসনগর, আমতৈল, চাঁদনীঘাটসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়,নির্বাচনী প্রচারণায় বর্তমান চেয়ারম্যানদের পাশাপাশি নৌকার প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও সমানতালে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ১১নং মোস্তফাপুর ইউনিয়নে মোটার ভোটার রয়েছেন ১৮ হাজার ২শত ২৯জন। এই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম তাজ আনারস প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখানে ভোট যুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাজুল ইসলাম তাজ ছাড়াও নৌকার প্রার্থী খসরু আহমদ, স্বতন্ত্র প্রার্থী তোফায়েল আহমদ তুয়েল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী লন্ডন প্রবাসী এমএ রহিমসহ তিনজন প্রার্থী রয়েছেন। তবে ভোটারদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন তাজুল ইসলাম তাজ। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী তোফায়েল আহমদ তুয়েলও ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
১২নং গিয়াসনগর ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে মোট ভোটার রয়েছেন,২১ হাজার ৬শত ৬৯ জন। এখানে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৬ জন প্রার্থী। জানা যায়, ওই ইউনিয়নে প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী জিলা মিয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী (আ:মীলীগ বিদ্রোহী) গোলাম মোশাররফ টিটু, স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ গৌসুল আহমদ ও নৌকার প্রার্থী প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা ছুরুক মিয়া। এই চার প্রার্থীর বাহিরে ওই ইউনিয়নে আরও দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকলেও তাঁরা তেমন একটা আলোচনায় নেই বলে জানা গেছে।
নাজিরাবাদ ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা রয়েছে ১৭ হাজার ৯শত ৬জন। এ ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীসহ মোট ৬ জন প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে প্রচার প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন, বর্তমান চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এনামুল হক রাজা, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আশরাফ উদ্দিন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান। এর বাহিরে এ ইউনিয়নে নির্বাচনে জয়ী হতে নৌকার প্রার্থী আশিকুর রহমান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী (আ:মীলীগ বিদ্রোহী) সৈয়দ মুহিত আলীও মাঠে তৎপর রয়েছেন।
এদিকে ওই ইউনিয়নগুলো ছাড়াও আমতৈল ইউনিয়ন, কনকপুর ইউনিয়ন, একাটুনা ইউনিয়ন, চাঁদনীঘাট ইউনিয়ন, আখাইলকুড়া ইউনিয়ন, কামালপুর ইউনিয়ন, মনুমুখ ইউনিয়ন, খলিলপুর ইউনিয়ন ও আপারকাগাবালা ইউনিয়নসহ সবগুলো ইউনিয়নেই চেয়ারম্যান প্রার্থীরা জোড় প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বলে জানা গেছে। এসব ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যানদের পাশাপাশি নৌকার প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সমানতালে প্রচারণা চালাচ্ছেন ভোটের মাঠে।
সবমিলিয়ে কে হতে যাচ্ছেন এসব ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান, সেটা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন গননার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত।
অপরদিকে নির্বাচনে সাধারণ সদস্য পদের প্রার্থীরাও প্রচার প্রচারণায় কোন অবস্থাতেই পিছিয়ে নেই। ১২টি ইউনিয়নের প্রতিটি ওযার্ডের মেম্বার প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আশায় এখন বিরামহীন প্রচারণা চালাচ্ছেন ।
(একে/এসপি/ডিসেম্বর ২১, ২০২১)
