চরপাথরঘাটায় মাসের পর মাস, চরলক্ষ্যায় এক ঘন্টায় জন্মসনদ!
জে জাহেদ, চট্টগ্রাম : যে কোন বয়সী লোকজনকে ইউনিয়র পরিষদ ও কাউন্সিলর অফিস থেকে নতুন করে জন্ম নিবন্ধন সনদ নিতে গেলে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম কর্ণফুলীর উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। কোন ঝুট ঝামেলা ছাড়াই স্থানীয় লোকজনকে অতি সহজেই জন্ম সনদ সংগ্রহ করতে দেখা যায়।
যেখানে পাশের ইউনিয়ন চরপাথরঘাটায় জন্ম সনদ পেতে আজম্ম হয়রানির কথা শোনাচ্ছে স্থানীয় লোকজন। এমনকি চরপাথরঘাটা ইউনিয়নে স্থায়ী নাগরিকদের জন্মনিবন্ধন পেতে এখনো মাসের পর মাস ঘুরে টাকা দিয়ে টোকেন সিরিয়াল নিয়ে শান্ত থাকতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য মাত্র ঘন্টা খানিকের মধ্যে চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদ হতে বাংলা-ইংরেজি দুই ভার্সনে জন্মসনদ পাচ্ছে নাগরিকরা।
এমনও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সনদ পেতে চরপাথরঘাটা ইউনিয়নে জুড়ে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি শর্ত। এসব শর্ত পূরণ করতে গিয়ে চরপাথরঘাটার অনেকেরই হাঁসফাঁস অবস্থা। ইছানগর গ্রামের মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, আমার চাচ্চুর ছেলেমেয়েদের জন্ম সনদ আনতে পরিষদে গেলে এক মাস পরে পাবো বলে টোকেন নিতে হলো। দুইজন ইউপি সদস্য সুপারিশ করলেও কাজ হয়নি।'
অপরদিকে, চরলক্ষ্যার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জয় চ্যাটার্জী প্রতিবেদককে বলেন, সরকারের উপবৃত্তি পেতে হলে শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। তাই বহু ছাত্রছাত্রীর বাবা-মা ইউনিয়ন অফিসে গিয়ে নিজেদের জন্ম সনদ এনে সহজেই স্কুলে জমা দিচ্ছেন।’
এছাড়াও চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান সোলায়মান তালকুদারের উদ্যোগে ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠির কথা বিবেচনা করে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) খাদ্য সামগ্রী বিক্রির স্টেশন তৈরি হয়েছে।
সপ্তাহে দুদিন টিসিবি পাচ্ছে কয়েক শতাধিক লোকজন। অন্যান্য ইউনিয়নে এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। ফলে, চরলক্ষ্যায় সরকারের সুফল পাচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষেরা। বঞ্চিত হচ্ছে না নাগরিক সুবিধা থেকেও। প্যাকেজে কিংবা খুচরা পণ্য বিক্রি করার কারণে সবশ্রেণির মানুষ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছে। জনগণের কাছে সরকারের সফলতা পৌঁছিয়ে দিতে কাজ করছেন চরলক্ষ্যার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান।
চরলক্ষ্যা বানুর বাপের বাড়ির মোহাম্মদ সেলিম ওয়াহিদ বলেন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, মাত্র কয়েক ঘন্টায় চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদ হতে বাংলা ইংরেজি দুই ভার্সনে পরিবারের পাঁচ সদস্যের জন্মসনদ হাতে পেলাম। এজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে।’
জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, সরকার আসন্ন রমজান মাসে সাধারণ মানুষের মধ্যে টিসিবির মাধ্যমে নিত্যপণ্য সামগ্রী সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক দেশের সকল ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মতো আমরাও উপকার ভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করে কম দামে টিসিবি সেবায় অন্তর্ভূক্ত করেছি।’
জন্মসনদ বিষয়ে ১নং চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সোলায়মান তালকুদার বলেন, ‘শুধু জন্ম সনদ বিষয়ে নয়, পুরো চরলক্ষ্যাবাসীর সেবক হয়ে কাজ করতে চাই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও হাট-বাজারের উন্নয়ন করতে চাই।’
চেয়ারম্যান অপরপ্রশ্নে বলেন, ‘জনগণের নাগরিক অধিকার ও ইউনিয়ন পরিষদের সেবা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে নিজেকে আত্মনিয়োগ করতে চাই। আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবক মাননীয় ভূমিমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় আমি চরলক্ষ্যাকে মাদক ও বাল্যবিবাহ মুক্ত, পরিচ্ছন্ন একটি আধুনিক মডেল ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের চট্টগ্রাম জেলার উপ-পরিচালক বদিউল আলম বলেন, পাসপোর্ট করা, বিবাহ নিবন্ধন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, জমি রেজিস্ট্রেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য সবার জন্ম সনদ প্রয়োজন। সবাই যেন জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আসেন সেই জন্য নিবন্ধনের আবেদনে কিছু বিষয় নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শূন্য থেকে ৪৫ দিন বয়সী শিশুর জন্ম নিবন্ধনের জন্য টিকার কার্ড, পিতা-মাতার অনলাইন জন্মনিবন্ধনসহ জাতীয় পরিচয়পত্র, বাসার হোল্ডিং নম্বর ও চৌকিদারি ট্যাক্সের রশিদের হাল সনদ, আবেদনকারী-অভিভাবকের মোবাইল নম্বর, ফরমের সঙ্গে এক কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজের ছবি লাগবে।
অপরদিকে, ৪৬ দিন থেকে ৫ বছর বয়সীদের জন্ম নিবন্ধন নিতে ভিন্ন নিয়ম আর বয়স ৫ বছরের বেশি হলে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র বিবিধ নিয়ম পূরণ বাধ্যতামূলক, যাদের জন্ম ২০০১ সালের ১ জানুয়ারির আগে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক, যদি জন্ম ২০০১ সালের আগে হয় সেক্ষেত্রে পিতা-মাতা মৃত হলে মৃত্যুসনদ বাধ্যতামূলক।যাদের জন্ম ২০০১ সালের ১ জানুয়ারির পর তাদের পিতা-মাতা মৃত হলে প্রথমে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন গ্রহণ করার পর অনলাইন মৃত্যু নিবন্ধন সনদ গ্রহণ করতে হবে। উভয় সনদ আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে।
বাসার হোল্ডিং নম্বর ও চৌকিদারি ট্যাক্সের রশিদের হাল সন, আবেদনকারী-অভিভাবকের মোবাইল নম্বর, ফরমের সঙ্গে এক কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজের ছবি, আবেদনের সঙ্গে কাগজপত্র সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য-নারী সদস্যদের স্বাক্ষরসহ সিল বাধ্যতামূলক।
(জেজে/এসপি/ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২২)
