মইজ্জ্যারটেক মোড় ও কলেজ বাজার সড়কে জীবন হাতে নিয়ে পারাপার!
জে. জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম কর্ণফুলী উপজেলার কলেজ বাজার এলাকায় রাস্তার এপার থেকে ওপারে যাচ্ছেন এক নারী। মহাসড়কে দু’দিকে চলা গাড়ির দিকে তার তীক্ষ্ণ নজর। আরেকদিকে, মইজ্জ্যারটেক মোড় এলাকায় অনবরত গাড়ি আসার কারণে রাস্তা পার হতে পারছেন না পথচারী আব্দুল খালেক ও বুলবুল।
বারবার চেষ্টা করেও গাড়ি এসে পড়লে আবার পেছনে চলে যান। আবার দু’কদম সামনে। অবশেষে, আরেক পথচারীর সহায়তায় চলন্ত গাড়ি হাতের ইশারায় থামিয়ে ঝুঁকি নিয়েই পার হতে হয় তাঁদের।
ব্যস্ততম চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের আরাকান এ সড়কে প্রতি মুহ‚র্তের দৃশ্য এটি। প্রতিনিয়ত এভাবেই ঝুঁকি নিয়ে জীবন হাতে নিয়ে পার হচ্ছেন পথচারীরা। বেশকিছু সময় অপেক্ষা করেও রাস্তা ফাঁকা না পাওয়ায় চলন্ত গাড়ি হাতের ইশারায় থামিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পার হতে বাধ্য হচ্ছেন কর্ণফুলী তথা বিভিন্ন এলাকার লোকজন।
পথচারীরা বলছেন, মইজ্জ্যারটেকে একটা ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। কলেজবাজারে টেকসই রঙ দিয়ে চিহ্নিত স্পীড ব্রেকার না থাকায় জীবন হাতে নিয়ে রাস্তা পারাপারই যেন শিকলবাহাবাসীর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় স্কুলগামী ছেলেরা দুর্ঘটনায় পড়ে নিহত ও আহত হবার খবরও কম না।
অন্যদিকে, পাশে কর্ণফুলী এ জে চৌধুরী কলেজ ও বহ‚মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী ও কলেজ বাজারে বাজার করতে আসা হাজার হাজার মানুষের পথচলা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারচেয়েও ভয়ংকর রাস্তার পাশে থাকা ফিলিং স্টেশন গুলো।
কেনোনা, এসব ফিলিং স্টেশনে যেতে মুহ‚র্তেই গাড়ি রঙ লাইনে প্রবেশ করেন। ফলে প্রতিনিয়ত নানা দুর্ঘটনা ঘটছে।
ওদিকে, মইজ্জ্যারটেক মোড়ে গরুর বাজার ও আশে পাশের মিলকারখানায় যাতায়াতকরা লোকজনও পড়েন নানা বিড়ম্বনায়। কেনোনা, এখানে একটি ওভার ব্রিজ থাকলে এত সমস্যা হতো না। কিন্তু চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের এদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তাঁরা বারবার বলছেন নিয়মনীতির কথা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, শিকলবাহা ক্রসিং মোড় টু আনোয়ারা সড়কের দুই পাশেই অনবরত গাড়ি চলছে। আবার রাতে প্রতিটি বাসের মধ্যে চলে ভয়ানক এক প্রতিযোগিতা। এ সড়কে আবার বেশকিছু টেম্পু ও মিনিবাস চলাচল করে।
এসব গাড়ির মধ্যে অনবরত প্রতিযোগিতা লেগেই থাকে। ফলে রাস্তা পারাপারে স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ে ও বয়স্ক মহিলাদের ঝ‚ঁকি আরও বেড়ে যায়। অথচ, ব্যস্ত এ পয়েন্টে ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় অনবরত ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।
বলতে গেলে কলেজ বাজারের এপার-ওপার সড়ক ও মইজ্জ্যারটেক মোড় পারাপারের কোনো ব্যবস্থাই নেই। নেই জেব্রা ক্রসিং। ফলে, অতিরিক্ত যান চলাচলের চাপ ও চালকদের নিয়ম না মানার কারণে পথচারীদের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। এমন গুরুত্বপ‚র্ণ মোড় ও সড়কে নেই অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশও।
কর্ণফুলী এ জে চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ জসীম উদ্দীন বলেন, ‘ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে স্কুল কলেজের সামনে পরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থা ও ট্রাফিক পুলিশ দরকার। এ বিষয়ে যেন উদ্যোগ গ্রহণ করে সওজ ও ট্রাফিক বিভাগ।’
কলেজ বাজারের ব্যবসায়ী মোক্তার হোসেন হিরু বলেন, ‘প্রতিদিন শত শত, হাজার হাজার মানুষ এ রাস্তা পারাপার হয়। ওভারব্রিজ না থাকায় এদিক সেদিক দিয়ে সবাই ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে। বিশেষ করে বাচ্চা নিয়ে যখন নারীরা পার হন, তখন আমাদের কাছে খুবই ভয় লাগে। এখানে একটা ওভারব্রিজ দরকার। না হয় স্পীড ব্রেকার বা টেকসই ব্যবস্থা।’
মইজ্জ্যারটেক মোড় এলাকার ব্যবসায়ি মিরাজুন্নবী মিরাজ বলেন,‘বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই আমাদেরও রাস্তা পার হতে হয়। তা না হলে উপায় নেই। কারণ নেই স্পীড ব্রেকার, নেই জেব্রা ক্রসিং। এ সুযোগে গাড়িগুলোও অতিরিক্ত বেপরোয়া। কখন যে অঘটনের কবলে পড়ে যাই তার নিশ্চয়তা নেই। দরকার মোড়ের মাঝখানে থাকা গোল চত্বরটি আরো ছোট করা। কারণ ওপাশের গাড়ি এপাশে দেখা যায় না।’
মইজ্জ্যারটেক মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক কনস্টেবল শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নিয়মিতই ডিউটি করি। মানুষ খুব কষ্ট করে রাস্তা পার হয়। এটা কোনো নির্দিষ্ট সিগন্যালের জায়গা নয়। এ কারণে গাড়ি থামিয়ে পার করাও সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষের চাপও তো অনেক। একটা ওভারব্রিজ না হলে সমাধান সম্ভব নয়।’
কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সড়কে বাধ্যতাম‚লক, সতর্কতাম‚লক, তথ্যম‚লক এই তিন ধরনের চিহ্ন রয়েছে মোটরযান আইনে। তিন ধরনের চিহ্নের মধ্যে দেড়শ’রও বেশি চিহ্ন বা সংকেত রয়েছে সড়কে। আইনে এত সংকেতের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে চোখে পড়ে খুব কমই। ফলে, সড়কে চলাচলের জন্য সংকেতগুলো যানবাহনের চালক, পথচারীদের জানা ও মানার জন্য যে আগ্রহ থাকার কথা সেটিও চোখে পড়ে না।
কর্ণফুলী এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী নজরুল ইসলাম টুকু বলেন, ‘মহাসড়ক পারাপারে নির্দিষ্ট জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস সুবিধার কথা থাকলেও কলেজবাজার ও মইজ্জ্যারটেকে নেই কোনো সঠিক ব্যবস্থাপনা। রাস্তা পারাপারে পথচারীরা মানছেন না নিয়ম। দেখা যায়, চলন্ত গাড়ির ফাঁকেই পার হন লোকজন। তাই আমি মনেকরি জনগণের জান মালের বৃহৎ স্বার্থে শুধুমাত্র নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ না থেকেও অনেক কিছু করা যায়। শুধু দরকার বাস্তব উপলব্ধি ও সৎ উদ্যোগ।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের দোহাজারী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী সুমন সিংহ বলেন, ‘মহাসড়কে স্পীড ব্রেকার দেওয়া সম্ভব না। কলেজ বাজার ও মইজ্জ্যারটেক মোড়ে কোনো ওভারব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা আপাতত নেই। ওভারব্রিজ নির্মাণ যুক্তিসঙ্গত হবে বলে মনে হয় না। জেব্রা ক্রসিং তৈরি করে দেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা জনগণকে সচেতন হতে হবে। এটার কোন বিকল্প নেই।’
(জেজে/এএস/মার্চ ০২, ২০২২)
