কৌশলী টেন্ডারে তিন ঠিকাদারের কব্জায় কর্ণফুলীর আড়াই কোটি টাকার কাজ!
জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ রাস্তায় সেতু নির্মাণ প্রকল্পে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় দরপত্র ফরম সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সরাসরি অনিয়মের অভিযোগ সদ্য যোগদানকৃত কর্ণফুলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) উমা খান কাফির বিরুদ্ধে।
একাধিক দরপত্র ফরম প্রত্যাশীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মূলত পিআইও অফিস একটি সিন্ডিকেটের সাথে আতাত করে দরপত্র ফরম দেয়নি কাউকে। ফলে, অনেকেই দরপত্র নিতে না পারায় রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে সরকার। আরো অভিযোগ ওঠে দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডেকেটের সাথে আতাত করে উপজেলা পরিষদ এসব কর্মকান্ড করে গেলেও প্রশাসন এক্ষেত্রে নীরব ভূমিকায়।
ওদিকে, পছন্দের ব্যক্তিদের টেন্ডার পাইয়ে দেওয়াসহ সুবিধা দিতে নিদির্ষ্ট লোকদের দরপত্র ফরম বিক্রি করে আসছেন। মইজ্জ্যারটেক গরুর বাজারও একই প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হওয়ায় সমালোচনা শুরু হয়েছ।
এতে কারচুপি করে নির্দিষ্ট তিনটি ঠিকাদারকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাজ দিয়ে সুবিধা নেওয়ার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অতি কৌশলে টেন্ডার দেওয়া হলেও দরপত্র বিক্রি করা হয়নি বাহিরের কাউকে। যারা দরপত্র পেয়েছেন বা কিনতে সামর্থ্য হয়েছেন সবই সিন্ডিকেটের লোকজন।
জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রনালয়ের অধীনে জিওবি তহবিল উৎসে কর্ণফুলীতে তিনটি সেতু নির্মাণে ২ কোটি ৩৭ লাখ ৭১ হাজার ৮৮৩ টাকার বরাদ্দ রেখে জাতীয় দৈনিকে দরপত্র প্রকাশ করেন।
দরপত্র সূত্রমতে, এতে চট্টগ্রাম কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের লালমিয়া ঠিকাদার মসজিদের সামনে সিরাজুল হক সংযোগ সড়কে খোয়াজনগর খালের উপর ১৪ মিটার দৈর্ঘ্যের গার্ডার সেতু (নং-৭০৮৭) নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ লাখ ৭২ হাজার ৮৯৮ টাকা। পাশাপাশি জুলধা ইউনিয়নের পাইপের গোড়া বাজারে জুলধা-শিকলবাহা সংযোগ সড়কে খালের উপর ১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের গার্ডার সেতু (৭০৮৮) নির্মাণে ব্যয় ৮৭ লাখ ৮৯ হাজার ১৯১ টাকা এবং চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের মাগন আলী তালুকদার সড়কে চেয়ারম্যান আলী খালের উপর ১৪ মিটার দৈর্ঘ্যের গার্ডার সেতু (৭০৮৯) নির্মাণে ৬৯ লাখ ৩৯ হাজার ৭৯৪ টাকা প্রাক্কলিত অর্থের ব্যয় ধরা হয়।
এই অর্থ বছরে শিকলবাহা ও বড়উঠান ইউনিয়নে কোন সেতু বা ব্রীজ নির্মাণের বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। বিশ্বস্ত একটি সূত্র বলছে, প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে এসব সেতু নির্মাণের দায়িত্ব পেলেন চরপাথরঘাটা রাশেদ কন্সট্রাকশন, চরলক্ষ্যার রমা এন্টারপ্রাইজ ও শিকলবাহার সানজা এন্টারপ্রাইজ।
জানা যায়, এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সমূহ সরকার দলীয় বিভিন্ন নেতাকর্মীদের। আর প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে এলটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। এতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রকাশ্যে দরপত্র বিক্রি না করে উল্লেখিত তিন ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশনে সুবিধা গ্রহণ করে গোপনে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অভিযোগ দরপত্র ফরম প্রত্যাশীদের।
জানা গেছে, এমনকি নিয়ম অনুযায়ি জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের দরপত্র বিক্রয় করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়েও দরপত্র উন্মুক্তকরণ করা হয়নি। ফলে, অভিযোগ শুধুমাত্র নির্দিষ্ট তিনটি ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে উপজেলার অন্যান্য নবায়নকারী ঠিকাদার ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি।
সূত্র বলছে, অতিগোপনে সরকার দলীয় কর্ণফুলী উপজেলার তিন প্রভাবশালী নেতার অখ্যাত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ এই কাজ দেওয়া হচ্ছে। প্রায় আড়াই কোটি টাকার এ কাজটি বাগিয়ে নিতে উর্ধ্বতন অফিসারকেও সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কর্ণফুলী উপজেলায় কর্মরত অন্যান্য ঠিকাদার ও প্রতিষ্ঠানও। এ নিয়ে পুরো উপজেলায় কর্মরত সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার বলেন, ‘করোনাসহ নানা দুর্যোগে আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে নিদারুণ কষ্টে আছি। আমরা অতীতে এলজিইডি ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনার বহু সম্পন্ন কাজের বিল এখনো পাইনি। আমরা আশা করেছিলাম অন্তত এলটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র হবে স্বচ্ছ। কিন্তু অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সদ্য যোগদান করা পিআইও তা না করে কিছু ঠিকাদারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে দরপত্র আটকিয়ে সাধারণ ঠিকাদারদের চরম বিপাকে ফেলেছেন। ফলে, টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে না পেরে আমরা পথে বসার উপক্রম হয়েছি।’
অনেক ঠিকাদার আবার এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। অপরদিকে, কর্ণফুলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) উমা খান কাফির বলেন, অনিয়ম হয়েছে কিনা জানি না। তবে তিন সেতুর কাজ পেয়েছে চরপাথরঘাটার রাশেদ কন্সট্রাকশন, চরলক্ষ্যার রমা এন্টারপ্রাইজ ও শিকলবাহার সানজা এন্টারপ্রাইজ। কে কি করেছে সেটাও বলতে পারব না। আমি এখানে নতুন আসলাম। এটা ওদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়তো।’
টেন্ডার বিষয়ে জানতে কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও ফোন রিসিভ করা হয়নি। তবে, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়েও দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ইউএনও শাহিনা সুলতানা বলেন, ‘দরপত্র ফরম পাইনি এরকম কেউ অভিযোগ করেনি। এর বাহিরে কিছু বলতে পারব না।’
(জেজে/এসপি/মার্চ ০৩, ২০২২)
