কর্ণফুলী পিডিবি অফিস
যেখানে ঘুষ দিলে কাজ হয় বিদ্যুৎ গতিতে!
জে. জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেকস্থ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিদ্যুৎ বিপণন ও বিক্রয় উপকেন্দ্রে প্রকাশ্যেই নানা অনিয়ম চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, পিডিবি অফিসে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যাদের ঘুষ দিলে কাজ হয় বিদ্যুৎ গতিতে, আর না দিলে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয় গ্রাহকদের ।
সেবা প্রত্যাশীদের আরও অভিযোগ, এখানে বিদ্যুৎ এর নতুন সংযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক খুঁটি, লাইন অপসারণ, মিটার বিকল, মিটার পরিবর্তন, লোড বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সেবায় গ্রাহক ভোগান্তি চরম আকারে পৌঁছেছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নির্ধারিত ফি জমা দিয়েও ঘুষ না দিলে গ্রাহকদের দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এ যেন পিডিবি বিদ্যুৎ অফিস আর ঘুষ একাকার!
এখানকার দুর্নীতিবাজ কর্তাব্যক্তিরা তাদের ভালো মানুষের অন্তরালে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এ দুর্নীতিবাজরা বিদ্যুৎ চুরির হিসাব মিলাতে গিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, যা নিয়ে বিপাকে পড়ছেন গ্রাহকরা। জানা গেছে, বাড়তি ভুতুড়ে বিল পরিশোধের জন্য গ্রাহকদের প্রতি চাপ প্রয়োগসহ মামলার হুমকি দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করে আসছে কর্ণফুলী পিডিবি অফিসের প্রকৌশলীরা।
জানা যায়, আবাসিক-বাণিজ্যিকে নতুন সংযোগ নিতে সরকারি ফি হিসেবে জমা দিতে হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। অফিসে খরচ প্রকৌশলী চেঃ ৫০০, ১০০ টাকা ব্যান্ডিং, অথচ এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০/১২ হাজার টাকা না দিলে মিলে না বিদ্যুতের নতুন সংযোগ।
এছাড়া এখানকার পিডিবির বিদ্যুৎ সরবরাহের কমান্ড এরিয়ার বিভিন্ন স্পটে অসাধু বিদ্যুৎ গ্রাহকরা অটোরিকশা চার্জ করার নামে গ্যারেজ খুলে বসেছে। এসব গ্যারেজ মালিক প্রথমে দুই তারের বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমোদন নেন; পরে পিডিবি অফিসের অসাধু কর্তাব্যক্তি ও কর্মচারীদের যোগসাজশে মিটার বাইপাস করে ডি-২ তারে (তিন তারের লাইন) লাইনের অবৈধ সংযোগ নেয়। এর পাশাপাশি অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে বেশ কিছু মুরগি ও গরুর খামারেও। আর এসব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা নেয় পিডিবির লোকজন।
বেশির ভাগ অভিযোগ-মইজ্জ্যারটেক পিডিবি উপকেন্দ্র অফিসের সহকারি প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে। অনিয়ম হচ্ছে চরলক্ষ্যা মৌলভী বাজার পিডার, চরপাথরঘাটা-ইছানগর ৩ নম্বর পিডার, ঘুমদন্ডি ১২ নম্বর পিডার, বোয়ালখালী পিডার, বোর্ড বাজারের ৪ নম্বর পিডার। এরমধ্যে গত দুমাস আগে যোগদান করা প্রকৌশলীও গ্রাহকদের হয়রানি করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
জানা যায়, পিডিবি কর্ণফুলীর এই উপকেন্দ্রে শত শত গ্রাহকের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। একাধিক গ্রাহকরা বলছেন, সামান্য ভূমিকম্পে ভাইব্রেশন, বজ্রপাত কিংবা বাসায় ড্রিল মেশিনে ব্যবহার করলেও মিটার অটোমেটিকলি লক হয়ে যায়। কর্ণফুলীর শিকলবাহা, চরলক্ষ্যা ও চরপাথরঘাটায় পিডিবির এনালগ ও ডিজিটাল মিটারের সংখ্যা ২৩ হাজারের উপরে। কিন্তু হটলাইন কিংবা অভিযোগ কেন্দ্রে কোন ধরনের সেবা পর্যাপ্ত নেই।
জানা গেছে, নতুন সংযোগ নিতে গেলে পিডিবির অফিস থেকে নতুন ডিজিটাল মিটার না কিনলে প্রকৌশলীরা নানা অজুহাতে ফাইল অনুমোদন করেন না বলেও অভিযোগ করেছেন অনেক ভূক্তভোগিদের।
উপজেলার তিন ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রাহক জানান, পিডিবির মইজ্জ্যারটেক উপকেন্দ্র অফিস দুর্নীতির হাট হয়ে গেছে। নতুন সংযোগ নিতে গেলে প্রথমেই অফিস থেকে ডিজিটাল মিটার ক্রয় করার অলিখিত শর্ত দেওয়া হয়। পরে নগদ টাকা দিয়ে মিটার কেনার পরই মেলে সংযোগের অনুমোদন।
ভুক্তভোগিদের অভিযোগ, যেখানে শহরেও পুরোপুর প্রি পেইড মিটার চালু হয়নি। সেখানে ইউনিয়নে ইউনিয়নে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে এসব মিটার। যা সেবার নামে ভোগান্তি।
পিডিবির পটিয়া বিদ্যুৎ বিপণন ও বিক্রয় বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেন জানান, ‘অতীতে কখনো এভাবে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হতো না। সম্প্রতি কর্ণফুলীর বিভিন্ন পিডারে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। এর ফলে হয়তো অনেক গ্রাহক অসন্তোষ হয়ে নানা অভিযোগ করতে পারেন।
তবে গ্রাহক যাতে হয়রানি না হয় আমরা কিছুদিন পরপর মইজ্জ্যারটেক পিডিবি উপকেন্দ্র অফিসের সহকারি প্রকৌশলী থেকে উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের পিডার স্থান পরিবর্তন করে দিয়ে থাকি। তবুও কারো বিরুদ্ধে কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আমাদের জানালে ব্যবস্থা নেব।’
চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান সাবিনা বানু বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করতেছি সাধারণ গ্রাহকদের সেবা দিতে। কিন্তু এরপরেও কোন অনিয়মের অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’
(জেজে/এসপি/মার্চ ০৫, ২০২২)
