পরিষদের ভাড়া রুমে ২২ বছর ধরে চলছে কর্ণফুলী থানার কার্যক্রম
জে জাহেদ, চট্টগ্রাম : কর্ণফুলী নদীর ওপারে উপযুক্ত স্থান সঙ্কটের কারণে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে একটি ইউনিয়ন পরিষদের ভাড়া রুমেই চলছে সিএমপি ‘কর্ণফুলী থানা’র কার্যক্রম। পরিষদের ভেতর থানা। আবার থানার উপরেই পরিষদ। ফলে, সিএমপি কর্ণফুলী থানা পুলিশ তাদের নিজস্ব আবাসন ও দাপ্তরিক অফিস সঙ্কটে ভুগেছেন।
এদিকে থানার পরিধি বেড়েছে, কিন্তু সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। সিএমপি’র অন্য থানা থেকে কর্ণফুলী থানা পুলিশ আবার অপরাধ দমনেও পিছিয়ে নেই বলে জানিয়েছেন জোনের সহকারি পুলিশ কমিশনার মোঃ মাসুদ রানা। স্বল্প জনবলে সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও নেই কোন পুলিশ ব্যারাক ও নিজস্ব ভবন।
জানা গেছে, কর্ণফুলী থানা কাম-ব্যারাক নির্মাণের জন্য সিডিএ কর্ণফুলী আবাসিক এলাকায় ১৫ দশমিক ১১ কাঠা জমি বরাদ্দ দেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ২০১৪ সালের ৩০ জুন জারি করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্মারকমূলে ১৫ কাঠা জমি কিনে নেয় সিএমপি।
জমির মালিক চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে প্রায় এক কোটি টাকাও পরিশোধ করা হয়। পরবর্তীতে আরো দশমিক ১১ কাঠা জমি সিডিএ থেকে কেনা হয়। কিন্তু পুলিশ সদর দফতর থেকে ৮ তলা বিশিষ্ট থানা ভবন নির্মাণের যে নকশা পাঠানো হয়েছে, সেই নকশায় সিডিএ’র জায়গায় ভবন হবে না। নকশা অনুযায়ী আরো সাড়ে তিন কাঠা জমি প্রয়োজন। এতেই থানা ভবন নির্মাণ কাজ থমকে যায়।
এদিকে জাতীয় অর্থনীতিতে খুবই গুরুত্ব বহন করে কর্ণফুলী তীরবর্তী এ থানা অঞ্চল। পাঁচ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত প্রায় তিন লাখ লোক অধ্যুষিত কর্ণফুলী উপজেলার আয়তন প্রতিষ্ঠাকালে আয়তন ১৩৬.৫৯ বর্গ কিলোমিটার হলেও নতুন করে তার পরিধি বেড়েছে।
কর্ণফুলী উপজেলাতে পটিয়া থানাধীন যে ১১টি ওয়ার্ড ছিল তা কর্ণফুলী থানাতে প্রবেশ করেছে। শুরুর দিকে এ থানায় লোক সংখ্যা ছিল ১,৭৯,১৪৮ জন। এই কর্ণফুলী উপজেলা ও আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ, রায়পুর, বারশত ইউনিয়নের আংশিক এলাকা নিয়ে কর্ণফুলী থানা প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। এখানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কাফকো, সিইউএফএল, বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়া অঞ্চল-কেপিইজেড ছাড়াও কর্ণফুলী নদীর তীরে শতাধিক বড় মাঝারি শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।
থানার পুলিশ সদস্যরা জানান, অস্থায়ী থানা ভবন গ্রামের ভিতরে হওয়ায় ঘটনাস্থলে আসা যাওয়া করতে অসুবিধা হয়। একইভাবে থানায় সেবা নিতে আসা লোকজনকেও ভোগান্তি পোহাতে হয়। প্রতিটি থানায় নারী-পুরুষের জন্য আলাদা হাজতখানা রাখার বিধান থাকলেও কর্ণফুলী থানায় নেই নারী হাজতখানা। কক্ষ স্বল্পতার কারণে আটক নারীদের রাখা হচ্ছে ডিউটি অফিসারের কক্ষে।
তাছাড়া পর্যাপ্ত খালি জায়গা না থাকায় জব্দ করা গাড়ি ও মালামাল রাখতে সমস্যায় পড়তে হয়। অস্থায়ী ব্যারাকে পুলিশ সদস্যদের থাকার জায়গার সংকুলান হয় না। ব্যারাকে জায়গা না থাকায় গাঁদাগাদি করে থাকতে হয় তাদের। অনেক কে আবার থাকতে হয় ভাড়া বাড়িতে। সেক্ষেত্রে মহিলা সিপাহীদের পড়তে হয় নানা বিড়ম্বনায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্ণফুলী থানার এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘বলতে গেলে সামগ্রিকভাবে উপযুক্ত নাগরিক অধিকার ও সেবা থেকে উপেক্ষিত সাধারণ মানুষকে তাদের কাঙ্খিত নাগরিক সেবা দিতে পুলিশকে বেগ পেতে হয়।’ জানতে চাইলে বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এস এম মেহেদী হাসান জানান, ‘বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন; আশা করি শিগগিরই কর্ণফুলী থানার নিজস্ব কাম-ব্যারাক ও ভবন হবে।’
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে বন্দর, পটিয়া ও আনোয়ারা থানা ভেঙে গঠিত হয় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন হলো কর্ণফুলী থানা। যেটি ২০০০ সালের ২৭ মে চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদ এর পুরাতন ভবনে কার্যক্রম শুরু হয়। পরিষদের জরাজীর্ণ-ভবনের কিছু অংশ মাসিক ৩৫ হাজার টাকা ভাড়ায় নেয়। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লক্ষ টাকার উপরে।
কর্ণফুলী থানার অধীনে তিনটি ফাঁড়ি-শাহমীরপুর, শিকলবাহা ও বন্দর পুলিশ ফাঁড়ি এবং তিনটি ক্যাম্প-কাফকো, কেপিইজেড ও শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্র পুলিশ ক্যাম্প পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে একটি পুলিশ বক্সও। থানায় বর্তমানে দুজন পরিদর্শক, ১৫ জন উপ-পরিদর্শক, ২১ জন সহকারী উপ-পরিদর্শক ও ২২ জন কনস্টেবল কর্মরত আছেন।
১৯৭৮ সালের ৩০ নভেম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। তখন ৬০ বর্গমাইল এলাকায় দশ লাখ নগরবাসীর জন্য থানা সংখ্যা ছিলো ছয়টি। কার্যক্রম শুরু’র কয়েক বছরের মধ্যে স্বতন্ত্র বিধিমালা প্রণয়ন করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এগিয়ে গেলেও পিছিয়ে পড়ে সিএমপি।
(জেজে/এসপি/মার্চ ০৭, ২০২২)
