জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম কর্ণফুলীতে আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসেবে মানা হয় যুবলীগকে। উপজেলায় এই সংগঠনের যেমন সুনাম রয়েছে, তেমনি কতিপয় নেতা-কর্মীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সুনাম ক্ষুণ্ণও হয়েছে।

মাদক কেলেংকারি, বিভিন্ন হত্যা-মামলা ও নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার কারণে গত দুই বছরে বেশ সমালোচনায় পড়ে কর্ণফুলী যুবলীগ। এসব কিছুকে পেছনে ফেলে উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নে যুবলীগের নতুন কমিটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ফলে, সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটিয়ে তৃণমূলে চাঙ্গাভাব এলেও সাবেক ছাত্রনেতা, ত্যাগী ও সুযোগসন্ধানী-সহ সব শ্রেণির নেতাকর্মীরাই ভুগছেন কিছুটা অস্বস্তিতে। সবার একই ভাবনা- কেমন হবে পাঁচ ইউনিয়নে যুবলীগের কমিটি, কারা স্থান পাচ্ছেন কমিটিতে? বিভিন্ন অপরাধীরা জায়গা দখল করে নিবে নাতো?

এদিকে, রাজনীতি সচেতন সাধারণ মানুষের মতামত ও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, ইউনিয়ন কমিটি গুলোতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ারও একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যার অন্যতম কারণ হিসেবে ওঠে এসেছে গ্রুপিং রাজনীতি।

কর্ণফুলীতে যেকোন সংগঠনের কমিটি গঠন করা হলে? স্ব স্ব নেতার আবদার থাকে। তাদের বলয়ে থাকা ঘুরপাক খাওয়া কর্মীদের কমিটিতে স্থান করে দিতে। সে মতে লবিং ও শুরু করে নেতারা। ফলে, যোগ্য নেতাকর্মীদের কমিটিতে জায়গা পাওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।

জানা যায়, আজ থেকে ৯ বছর আগে অর্থ্যাৎ ২০১৩ সালের দিকে সাবেক পটিয়া বর্তমান কর্ণফুলী উপজেলায় চরপাথরঘাটা ইউনিয়নে যুবলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। সেখানে শুধু সভাপতি জকির আহমেদ মামুন ও সাধারণ সম্পাদক মার্শাল মনির আহমেদের নাম ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত সংগঠনটির বাকি পদ পূরণ হয়নি। তবে সংগঠনের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছেন বর্তমান উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, পাঁচ ইউনিয়নের সম্মেলন সফল করার জন্য পাঁচটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। যাতে তালিকা চূড়ান্ত করে উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে তথ্য জমা দেওয়া হয়। ইউনিয়ন যুবলীগ কমিটির সম্পাদকীয় পদে আগ্রহী নেতাদের এসব জীবনবৃত্তান্ত কিংবা বিনিময় ফরম ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

এতে কর্ণফুলীর পাঁচ ইউনিয়নে যথাঃ চরপাথরঘাটা, চরলক্ষ্যা, শিকলবাহা, বড়উঠান ও জুলধায় দুই শতাধিক নেতাকর্মী ইতোমধ্যে ফরম সংগ্রহ করেছেন। যা শিগগরই জমা করা হবে। পরে সেই তথ্যগুলো নিয়ে কাজ করবেন দায়িত্বশীলরা উপজেলা যুবলীগের নেতারা।

দলীয় সূত্র বলছে, কমিটিতে সঠিক মূল্যায়নের বিষয়টিও ভাবছেন দায়িত্বশীলরা। যাতে ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সাবেক ত্যাগী ছাত্রনেতা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত কর্মীরা স্থান পায়। সাংগঠনিকভাবে দক্ষরা যেন স্থান পেতে পারেন ইউনিয়ন কমিটিতে। এছাড়াও, ছাত্রলীগের সাবেক সফল ছাত্রনেতারাও যুবলীগের কমিটিতে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

অপরদিকে, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কর্ণফুলী যুবলীগের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেছেন। অনেকের বিরুদ্ধে তদন্তও চলছে। আছে মামলাও। এমন অনেক মুখই এবারও পদপ্রত্যাশী। তবে, কমিটি করার ক্ষেত্রে সতর্কভাবে যাচাই-বাছাই করার কথা জানিয়েছেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা। কোনোভাবেই যেন বিতর্কিত মুখ কমিটিতে না আসে, সেদিকে কড়া নজর রাখবেন তাঁরা।

কেনোনা, ২০২০ সালের ১৪ মার্চ এক লাখ ১৫ হাজার পিস ইয়াবা মামলায় গ্রেপ্তার হন কর্ণফুলী উপজেলা যুবলীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক ইকবাল আল ফারুক। ২০২১ সালের ২১ মে উপজেলায় মোঃ মুরাদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি হন উপজেলা যুবলীগের উপ-প্রচার সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাগর। গত ইউপি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় উপজেলা যুবলীগের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সহ-সম্পাদক মুহাম্মদ মুছা বহিষ্কৃত হন। সকল ঘটনায় বিব্রত ছিলো উপজেলা যুবলীগ!

এছাড়াও, হত্যা মামলার বিভিন্ন আসামি ও অপরাধীরাও ফরম সংগ্রহ করে তৃণমূল যুবলীগের পদ বাগিয়ে নিতে তৎপর রয়েছে বলে জানা যায়। যদিও দলের দুঃসময়ে মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক ত্যাগী ছাত্রনেতারা এখনো কোনঠাসা হয়ে রয়েছেন। নেই তাদের কোন পদ-পদবি কিংবা হয়নি দলের সুসময়ে মূল্যায়ন।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক যুবলীগ কমিটিতে পদপ্রত্যাশী একাধিক নেতাকর্মীরা বলেন, উপজেলা যুবলীগ যা বলছে আমরা তা শুনতেছি। তাঁদের কথা বিশ্বাস করে নেতাকর্মীরাও পদ পেতে ফরম সংগ্রহ করছেন। কিন্তু আদৌও আমাদের মনে হয় না তৃণমূল থেকে উঠে আসে ত্যাগী কর্মীরা সম্পাদকীয় পথ পাবেন। কারণ মাঠে রাজনৈতিক সৌন্দর্য্য দেখিয়ে কারো ইচ্ছায় যদি কমিটি দেওয়া হয়। তবে সে কমিটি হবে তৃণমূল বিছিন্ন সুপারিশ কমিটি।

জানতে চাইলে চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগ সাবেক সাধারণ সম্পাদক মার্শাল মনির আহমেদ বলেন, ইউনিয়ন যুবলীগের কমিটি গঠনে ফরম বিতরণের দৃশ্য সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। আশা করি দলীয় শৃঙ্খলাবন্ধ নেতাকর্মী, দলের চেইন অফ কমান্ড এবং সিনিয়র-জুনিয়র সম্মাননা রেখে আমাদের প্রিয়নেতা মাননীয় ভূমিমন্ত্রী মহোদয়ের হাতকে শক্তিশালী করার লক্ষে পাঁচ ইউনিয়নে একেকটি সুন্দর কমিটি উপহার দেবেন।'

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি আ ম ম টি পু সুলতান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যে বর্ধিত সভা করেছিলাম, সেখানেই নির্দেশনা ছিলো ইউনিয়ন কমিটি গুলো করে ফেলার। সংগঠনকে গতিশীল করা এবং আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এটা চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে করা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, বিশেষ করে দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকা নেতাকর্মীরা যুবলীগের দায়িত্ব আসতে চেষ্টা-তদবির করবেন এটাই স্বাভাবিক। কেনোনা, গত একযুগ থেকে ইউনিয়ন যুবলীগের ক্ষীণ অবস্থানকে গতিশীল ও সক্রিয় করতে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় এবং ত্যাগী নেতৃত্বদের পদে আনতে চেষ্টা করবেন উপজেলা যুবলীগের নেতাকর্মীরা।'

(জেজে/এএস/মার্চ ০৯, ২০২২)