দিলীপ চন্দ, ফরিদপুর : ফরিদপুরে ফসলি জমির পরিমান হ্রাস পাচ্ছে। দিন দিন যে হারে ফসলি জমির পরিমান কমছে তাতে বিভিন্ন ফসল আবাদের জন্য আবাদি জমির প্রকট সংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে কৃষি জমি কমতে থাকলে কয়েক দশক পরে কেমন হবে দেশের কৃষি উৎপাদন এবং আবাদী জমির পরিস্থিতি? বিভিন্ন কারণে আবাদি জমির পরিমান কমে যাচ্ছে। গত ৬ বছরে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর আবাদি জমি হ্রাস পেয়েছে। 

জানা গেছে, ফরিদপুর জেলার প্রতিষ্ঠা ১৭৮৬ সালে। মতান্তরে এ-জেলা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১৫ সালে। ফরিদপুরের নামকরণ করা হয়েছে এখানকার প্রখ্যাত সুফি সাধক শাহ শেখ ফরিদুদ্দিনের নামানুসারে। এ জেলার পূর্বনাম ছিল ‘ফতেহাবাদ’। ফরিদপুর জেলার প্রতিষ্ঠা সন ১৭৮৬ হলেও তখন এটির নাম ছিল জালালপুর এবং প্রধান কার্যালয় ছিল ঢাকা। ১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা জালালপুর হতে বিভক্ত হয়ে এটি ফরিদপুর জেলা নামে অভিহিত হয় এবং হেড কোয়ার্টার স্থাপন করা হয় ফরিদপুর শহরে। গোয়ালন্দ, ফরিদপুর সদর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ এই চারটি মহকুমা সমন্বয়ে ফরিদপুর জেলা পূর্ণাঙ্গতা পায়। বর্তমানে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর এই পাঁচটি জেলায় রূপান্তরিত হয়েছে।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর অঞ্চলের মোট ফসলী জমির পরিমান ৩ লক্ষ ৩২ হাজার ৯১৮হেক্টর। এর মধ্যে নীট ফসলী জমি ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৯৫৮ হেক্টর। পতিত জমির পরিমান ৩ হাজার ৪৬২ হেক্টর। এক ফসলী জমি ১৪ হাজার ১৭ হেক্টর। দো-ফসলী জমি ৭১ হাজার ৭১২ হেক্টর। তিন ফসলী জমির পরিমাণ ৫২ হাজার ৪০৪ হেক্টর। ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী ফরিদপুর জেলার মোট আয়তন ২৭৩ হাজার বর্গকিমি (৮০০ বর্গমাইল)। মোট জনসংখ্যা ১৯ লক্ষ ৮৮ হাজার ৬৯৭ জন। ফরিদপুরের সদর ও নয়টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গত ৬ বছরে ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে ফসিল জমির পরিমান। গত ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে জেলা জুড়ে আবাদ জমির পরিমান ছিল ৩ লক্ষ ৪৪ হাজার ৭৭৮ হেক্টর। হ্রাস পেতে পেতে চলতি ২০২১-২২ অর্থ বছরে ৩ লক্ষ ৩২ হাজার হেক্টর আবাদি জমিতে দাঁড়িয়েছে।

জেলা-উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সর্বত্রই প্রতিদিন অবৈধভাবে আবাদি জমি ধ্বংস করে মাটি কাটার মহোৎসব চলছে। জাঙ্গালিয়া এলাকা থেকে বেকু দিয়ে অবৈধ ভাবে মাটি খনন করে বড় ছয় চাকার গাড়ি করে জাংগালিয়া এবং বিলমান্দলার এই ছোট নতুন নির্মিত রাস্তা দিয়ে প্রতিনিয়ত মাটি নেওয়ার কারণে রাস্তার দুই পাশ ভেংগে যাচ্ছে। ফরিদপুর শহর ঘেঁষে বিভিন্ন গ্রাম এলাকার কৃষি জমিতে একের পর এক গড়ে উঠেছে ইটের ভাটা। এতে পরিবেশ ও ফসল উৎপাদন মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

এদিকে পদ্মা নদী থেকে সারাবছর ধরে অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালি ও কৃষি জমির টপ সয়েলের সহজলভ্যতার কারণে এরইমধ্যে শহর সংলগ্ন ডিগ্রিরচর ইউনিয়নের সিএন্ডবি ঘাট এলাকায় গড়ে উঠেছে এক ডজনেরও বেশি ইটের ভাটা। এর মধ্যে একেবারেই গ্রামীণ এলাকা আইজদ্দিন মাতুব্বরের ডাঙ্গিতে মাত্র ২০০ গজের মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে তিনটি ইট ভাটা। এভাবে কৃষি জমির ওপর একের পর এক ইটের ভাটা গড়ে ওঠায় ফসলী জমি কমে যাচ্ছে। সেইসাথে নিরিবিলি গ্রামীণ পরিবেশগুলো বাইরে থেকে আসা শ্রমিকদের কারণে ঘনবসতিপূর্ণ ঘিঞ্জি এলাকায় পরিণত হচ্ছে। ইট ভাটার চিমনির ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের রোগ বালাই ছড়াচ্ছে। ধোঁয়া ও ধুলা দূষণে বিষাক্ত হচ্ছে পরিবেশ।

সরেজমিনে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, আইজদ্দিন মাতুব্বরের ডাঙ্গিতে কৃষি জমি ধ্বংস করে পাশাপাশি তিনটি ইটের ভাটা গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে চাঁন মিয়া ও লিয়াকত মাতুব্বরের দুটো পুরনো ভাটার পাশাপাশি আরশাদ ব্যাপারী মালিকানাধীন এবিবি ব্রিক নামে নতুন আরও একটি ইটের ভাটা স্থাপন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জেলা ইট ভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, কৃষি জমি নষ্ট করে ভাটা তৈরি হোক এটা আমরাও চাই না। তাহলে পরিবেশ অধিদপ্তর কিভাবে তাদের অনুমতি দেয়?

সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ফরিদপুরের নগরকান্দায় ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। ভাটা মালিকরা ফসলি জমি কেটে মাটি গিলে খাচ্ছে। এলাকা ঘুরে এই চিত্র দেখা যায়। ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল মাটি। ফসলি জমির মাটি ইট তৈরিতেও সুবিধা। নগরকান্দা উপজেলার মহিলারোড-বিলনালিয়া সড়কের তালমা ইউনিয়নের কোনাগ্রামের খালপাড়ের ব্রিজ সংলগ্ন বেশকিছু এলাকার ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে নিতে দেখা গেছে। এসব মাটি বেকু দিয়ে কেটে ব্যক্তি মালিকদে ভাটায় অথবা অন্য কোনো জায়গায় বিক্রি করছেন দালালরা। বেশিরভাগ মাটি অবৈধ লড়িতে করে নেয়া হচ্ছে ইটভাটায়। মাটি কাটাছেন এমন একটি ফসলি জমির মালিক তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া গ্রামের মোসলেম মোল্যা।

তিনি বলেন, মাটির ভালো দাম পাওয়ায় জমির মাটি বিক্রি করে দিয়েছি। জমির ফসলে তেমন লাভ না হওয়ায়, মাটি বিক্রি করে পুকুর খনন করছি।

এ ব্যাপারে বোয়ালমারী উপজেলার টোংরাইল গ্রামের সুনীল বিশ্বাস, কালি কুমার বালা, জয়দেব বিশ্বাস, সুতালীয়া গ্রামের অমর বিশ্বাস, ময়না গ্রামের মুকুল কুমার বোস, তারেক হোসেন, খরসুতি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আল মামুন রনি বলেন, আমরা কৃষিকাজ করছি শৈশব কাল থেকেই। দাদা-বাবার হাত ধরে কৃষি কাজে হাতেখড়ি। আগে যে পরিমান জমিতে আমাদের পরিবার চাষাবাদ করত, এখন তার এক পঞ্চমাংশ জমিতে ফসল ফলাই।

তারা আরও বলেন, জমির পরিমান কমে যাবার পেছনে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আবাদী জমির পরিমান কমছে।

এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল করিম বলেন, কৃষি জমি কেটে মাটি বিক্রি করার ফলে, ফসলি জমি কমে যাচ্ছে। এ ধরনের কাজ চলতে থাকা, খুবই দুঃখজনক।

এ ব্যাপরে নগরকান্দা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এনএম আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ফসলি জমির মাটি বিক্রি করে কৃষি জমির ক্ষতি করা হলে, এ ব্যাপারে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আছেন।

এ ব্যাপারে বোয়ালমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম এম মোশাররফ হোসেন মুশা মিয়া বলেন, আবাদি জমি হ্রাসের নানা ধরনের কারনের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি বড় সমস্যা। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের কৃষি ক্ষেত্রে। প্রতিবছর বেশ কয়েক শতাংশ হারে কমছে ফরিদপুরের আবাদী জমির পরিমান। জমি কমার অন্যতম বড় কারণই হল জনসংখ্যার চাপ। আবাদী জমি ভাগ হয়, বাড়ি ঘর তোলা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জমি কমে, ধানের ও অন্যান্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ ড. হযরত আলী বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বাড়ি ঘর নির্মাণ, ফসলি জমিতে ইটভাটা,পুকুর খননসহ নানা কারণে দিন দিন ফসলি জমির পরিমান হ্রাস পাচ্ছে।

(ডিসি/এসপি/মার্চ ১৩, ২০২২)