জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : কাজী আছে, অফিসও আছে, নিয়মিত বিয়েও পড়াচ্ছেন। আছে বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রার-সরকার নির্ধারিত বালাম বইও। নেই আইনগত কোনো বৈধতা। সেই সাথে কাজির নেই সরকারি নিবন্ধনও। তবুও কথিত কাজী পরিচয়েই বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করছেন বছরের পর বছর। নিবন্ধন কোথায়? কোন বইয়ে হচ্ছে তার কোন বালাই নেই। তবুও ভুয়া কাজী বিয়ে রেজিস্ট্রির নামে হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। এসব নামসর্বস্ব কাজীর ফাঁদে পড়ে চরপাথরঘাটার শত শত মানুষ প্রতারিত হলেও নেই প্রশাসনের তেমন নজরধারি।

ফলে, নিকাহ ও তালাক নিবন্ধনে এক প্রকার বিশৃঙ্খলা চলছে। বেড়েছে ভুয়া কাজির দৌরাত্ম্য। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নে এভাবেই দীর্ঘ ১২ বছর ধরে নিকাহ রেজিস্ট্রির কাজ করে আসছেন কামরুল ইসলাম নামে এক ভুয়া কাজী। এ সময় তিনি নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রি করেছেন হাজার হাজার। কিন্তু জানা গেছে, তিনি ভুয়া। এর ফলে যারা তার মাধ্যমে বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করিয়েছে মহাচিন্তায় পড়েছেন তারা।

সম্প্রতি, এ বিষয়ে সৈয়দ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম নামে চরলক্ষ্যা ইউনিয়নে দায়িত্বরত এক মুসলিম নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন। যার অনুলিপি প্রেরণ করা হয়েছে জেলা রেজিষ্ট্রার বরাবরও। জানা গেছে, ভুয়া কাজী কামরুল ইসলামের বাড়ি উপজেলার জুলধা ইউনিয়নে।

অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, গত ০৭ ফেব্রুয়ারি তরিখে চট্টগ্রাম জেলা রেজিষ্ট্রার ১নং (খ) চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের পার্শ্ববতী ইউনিয়নের কাজী হিসেবে সৈয়দ মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করেন। বিষয়টি ভূয়া কাজী কামরুল ইসলামকেও অবগত করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ ৩০/৪০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরেও পটিয়া থানার ৫নং হাবীলাশদ্বীপ ইউনিয়নের কাজী শরফুদ্দিন মোঃ সেলিম ও কামরুল ইসলাম যৌথ ভাবে অফিস খোলা রেখে নিজেদেরকে চরপাথরঘাটার কাজী পরিচয় দিয়ে ব্রিজঘাট নুর মাকের্টের ২য় তলায় সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তি করছেন।

প্রতারনা করে বিবাহ রেজিষ্ট্রার করে যাচ্ছেন। অতীতেও কোন দায়িত্ব ছাড়াই দীর্ঘ একযুগ এভাবে বিয়ে পড়িয়ে আসছেন তারা। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে একাধিকবার অভিযোগ করলেও পুলিশ প্রশাসন কিংবা উপজেলা প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি। অনেক সময় চেয়ারম্যান অফিস বন্ধ করে দিলেও পুনরায় খোলা রাখেন।
চরপাথরঘাটা এলাকার বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তি শুক্কুর আহমেদ বলেন, আমার নাতনির বিয়ে রেজিস্ট্রি করেছেন কাজী কামরুল। এখন শুনি তিনি ভুয়া কাজী। তার মাধ্যমে যেসব বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়েছে ভবিষ্যতে এ নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হবে কিনা-সে চিন্তায় আছি।’

আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভুয়া কাজীর মাধ্যমে করা রেজিস্ট্রিও ভুয়া। তদের মতে নজরদারির অভাবে এ রকম ভুয়া কাজীরা বিয়ে ও তালাক নিবন্ধনের ফাঁদ পেতে বসছেন। এদের কারণেই বিয়ে বিচ্ছেদ, বিদেশে যাওয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে আইনি জটিলতায় পড়েন সাধারণ মানুষ।

অ্যাডভোকেট তৌফিকুল মওলা বলেন, কাজী যদি ভুয়া হয় তার দ্বারা নিবন্ধিত বিয়ে এবং তালাকও ভুয়া। ভুয়া কাজীর দ্বারা যারা বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন করিয়েছেন জরুরি মুহূর্তে তারা জটিলতায় পড়বেন। তাই সংশ্লিষ্টরা ভুয়া কাজীর দায় এড়াতে পারেন না।

তিনি বলেন, ভুয়া কাজীর দৌরাত্ম্য কমাতে হলে কাজীর সাইনবোর্ডে নিবন্ধন নাম্বার লেখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আর কাজীদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ডাটাবেজ এবং ওয়েবসাইট তৈরি করতে হবে। যাতে নিবন্ধন নাম্বার দিয়ে যে কেউ কাজী বৈধ না ভুয়া তা যাচাই করতে পারেন।’

কাজী সৈয়দ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কামরুল ইসলাম কোন বৈধ কাজী নন, তিনি ভুয়া কাজী। ২০১০ সাল থেকে প্রতারণা করছেন চরপাথরঘাটায়। গত পরশু চরপাথরঘাটার ১ নং এলাকায় বিয়ে পড়াতে গিয়ে আটক হলেও এক মেম্বার ছেড়ে দেন।’

কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিনা সুলতানা বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা একটা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। যা তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

(জেজে/এসপি/মার্চ ২১, ২০২২)