কর্ণফুলীর জুলধা-ডাঙ্গারচর সড়ক
মূল্যবৃদ্ধির অযুহাতে ঠিকাদার আটকে রাখল ২ কোটি টাকার নির্মাণ কাজ!
জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম কর্ণফুলীর জুলধা ডাঙ্গারচরের দুঃখ নামে খ্যাত প্রধান সড়ক। এ সড়কের শেষ অংশ নির্মাণে সরকারি বরাদ্দ হয়েছে বহু আগেই। টেন্ডার পেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ হলো কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করছে না ঠিকাদার এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপজেলার জুলধা ইউনিয়নের ডাঙারচরের শেষাংশ ঈশান মিস্ত্রী হাটের ১ কিলোমিটার সড়কটি যেন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এ কারণ হিসেবে অনেকে গ্রামীণ এই রাস্তা দিয়ে মিলকারখানা ও ফ্যাক্টরির বড় বড় লরি ও ভারি যানবাহন চলাচলের ফলে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন।
ফলে, যাতায়াতে চরম দুর্ভোগে পোহাতে হচ্ছে জুলধা ইউনিয়নের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষকে। যথা সময়ে সড়ক নির্মাণ না হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয়দের। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থাও। এর প্রভাব পড়েছে কৃষি, ব্যবসা বাণিজ্য ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
জানা গেছে, মাত্র ১ দশমিক ২ কিলোমিটার জুলধা-ডাঙ্গারচর সড়কের শেষ অংশের কাজটির জন্য কয়েক দফায় বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু টেন্ডার হলেও দীর্ঘদিন কাজ হচ্ছে না অজানা কারণে। নির্মাণ কাজ না হওয়ার পিছনে একে অপরকে দায়ী করছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘ ১৭ বছর আগে সংস্কার হলেও এখন সংস্কার বিহীন সড়কটির শেষ অংশ জুড়েই ছোট-বড় খানাখন্দে গর্তে ভরপুর। এতে যানবাহন ও লোকজনের চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।
জুলধা পাওয়ার প্লান্ট, এস এ গ্রুপ ট্যাঙ্ক টার্মিনাল, ষ্টার সিমেন্টের মতো বড় বড় ফ্যাক্টরীতে মালামাল আসা নেওয়া করতে গিয়ে ভারি যানবাহন চলাচলের কারণে সড়কের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। সরকার গ্রামীণ রাস্তার বরাদ্দ দিয়ে কাজ করলেও মূলত এসব সড়ক আরো টেকসই ও মজবুত করতে হলে মিল কারখানা ও ফ্যাক্টরী মালিকদের এগিয়ে আসা উচিত বলে সচেতন মহল মনে করছেন।
এ সড়ক পথ দিয়ে হালিশহর বেগমজান উচ্চ বিদ্যালয়, ডাঙ্গারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডাঙ্গারচর আইডিয়াল স্কুল, ডাঙ্গারচর রহমানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন শত শত শিক্ষার্থী। সিএনজিচালক মোঃ ওসমান বলেন, ‘সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে গাড়ি চালাতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে। যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। এতে প্রতিদিন গাড়ি মেরামতের কাজ করতে হচ্ছে।’
উপজেলা এলজিইডি’র অফিস সূত্রে জানা গেছে, ডাঙারচরের শেষাংশ ঈশান মিস্ত্রী হাটের এ সড়কটি নির্মাণে কাজ পান মেসার্স এ আলী চৌধুরী। ২ কোটি ১৭ হাজার টাকা ব্যয়ে কাজের টেন্ডার ওপেনিং হয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজ পেয়েছেন। ওয়ার্ক অর্ডার নিয়েছেন বহু আগেই। কিন্তু নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অযুহাত দেখিয়ে কাজ বন্ধ রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয় লোকজনের পক্ষে সাবেক ইউপি সদস্য সিরাজুল ইসলাম হৃদয় বলেন, গত মাস দুয়েক আগে ঠিকাদারের তোড়জোড় ও স্থানীয় নেতাদের প্রচার প্রচারণায় আশাবাদী হয়েছিল এলাকার মানুষ। কিন্তু সামান্য কাজটির জন্য নানা শ্রেণি পেশার পাতি নেতারা ঠিকাদারের সাথে দৌঁড়ঝাঁপ ও কয়েক দফায় বৈঠক করলেও কাজ হচ্ছে না।’
তিনি আরো জানান, মূল ঠিকাদার থেকে সাব ঠিকাদার হিসেবে কাজ পেতে নানা জনের তদবিরে অতিষ্ট রয়েছে ঠিকাদার। কেননা, কেউ চায় অর্ধেক কাজ, কেউবা পুরোটাই, কেউ দিতে চায় রড-সিমেন্ট সাপ্লাই, কেউ বালি। এভাবেই হয়তো আটকে গেছে কন্ট্রাক্টর। মূলত এলাকার মানুষের দুর্ভোগে থাকলেও কেউ তা গুরুত্ব দিচ্ছে না। নিজেদের স্বার্থে।’
সড়ক নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এ আলী চৌধুরীর স্বত্বাধিকারী মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘টেন্ডারের মাধ্যমে সড়কটি নির্মাণের কাজ পেয়েছি সেটি সত্য কিন্তু এলজিইডির অফিসের সহযোগিতা থাকলেও সময়মতো কাজ ধরতে না পারার অন্যতম কারণ হলো নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি।’
তিনি বলেন, ‘গত ৯ মাস থেকে পর্যায়ক্রমে নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমরা ঠিকাদারেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি। অনেকেই আবার ব্যাংক ঋণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কায় আছি। আমরা গত সপ্তাহে প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করেছি। সরকার যদি অন্তত ভ্যাটটা কমায় দেয়। তাহলে আমরা চলমান প্রকল্পের কাজ শুর করতে পারব। আশাকরি জুলধা ডাঙ্গারচরের কাজটি আগামী সপ্তাহে শুরু করব।’
এ বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এর দায়িত্বে থাকা সহকারি প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘সময়মতো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সড়কের কাজ শেষ করতে নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরেও না করলে বিধি মোতাবেক চুক্তিপত্র বাতিল করা হবে। কেননা, কোনো ঠিকাদারের সঙ্গে এলজিইডির কাজের চুক্তি নেই। পরবর্তীতে বিধি মোতাবেক ঠিকাদার নিয়োগ করে সড়ক নির্মাণ কাজ শেষ করা হবে।’
(জেজে/এসপি/মার্চ ২৫, ২০২২)
