সড়ক দখল করে বাজার
প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, ইউএনও বলছেন একার পক্ষে সম্ভব নয়!
জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সাধারণ মানুষের জানা নেই ‘সড়ক’ বাজার বসানোর জায়গা কিনা? কিন্তু উপজেলার চাতরী চৌমুহনী কাঁচা বাজারের মোড় থেকে পুরো চারপাশের সড়কেই প্রতিদিন বাজার বসেছে। ফলে, দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পথ চলাচলকারী সাধারণ লোকজনকে। অথচ এসব দেখার যেন কেউ নেই।
সড়কের চিত্র দেখে স্বভাবতই প্রশ্নে ওঠে, আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসন কী ৭০ লাখ টাকায় সড়ক ইজারা দিলেন? না, ৮নং চাতরী ইউনিয়নের পশুরহাটসহ চাতরী চৌমুহনী বাজার এক বছরের জন্য ইজারা দিলেন? নাহলে, প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশের সামনেই কিভাবে প্রতিদিন সড়কে বাজার বসানো হচ্ছে!
জানা যায়, ১৪২৬ বাংলা সনে বাজারটির ইজারা মূল্য ছিল ৩৭ লাখ ২৯ হাজার ৫৫০ টাকা (ভ্যাট ব্যতিত), ১৪২৭ বাংলা সনে ছিল ৬১ লাখ, ১৪২৮ সনে ছিল ৬৮ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা, যা আগামী পহেলা বৈশাখ ১৪২৯ বাংলা সনে সরকারি ইজারা মূল্য দেখানো হয়েছে ৫৮ লাখ ৯৫ হাজার ৭৩৮ টাকা। আয়কর ৫%, ভ্যাট ১৫% সহ যা দাঁড়াবে প্রায় ৭০ লাখ টাকার উপরে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন বাজারের সীমানা কোথায়? তা নির্ধারণ না করেই বছরে পর বছর সড়কের উপরে চলছে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি আর ব্যবসা। চাতরী চৌমুহনীতে শুধু অবৈধ স্থাপনা নয়, চৌমুহনী সড়কের কয়েকটি অংশ জুড়ে বাস, সিএনজি, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনও দখল করেছে সড়ক। তবে, ফুটপাত ও সড়ক দখল করে অস্থায়ী দোকান নির্মাণ, যানজট সৃষ্টির প্রধান কারণ বলে দাবি করছেন ভুগক্তভোগী আনোয়ারাবাসী।
এ ধরনের দখল ও অপকর্মের পেছনে যা কাজ করে, এখানেও হয়তো তাই কাজ করছে। স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক নেতা ও নাম সর্বস্ব সমিতির গুটিকয়েক নেতা এর সঙ্গে রয়েছেন । মূলত তাঁরা তাঁদের স্বার্থেই এভাবে সড়ক দখল করে দোকানপাট ও ব্যবসা স্থাপনা গড়ে তুলেছেন।
বাজারের ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি দোকান থেকে নেতারা মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করে থাকেন। আর এসব নেতা এতটাই প্রভাবশালী যে কেউ তাঁদের ভয়ে কিছু বলতে পারে না। গত ২৯ মার্চ আব্দুল হালিম ও আনোয়ার হোসেন নামে দু’ব্যক্তি ইউএনও’র কাছে চাঁদাবাজির অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার পায়নি বলে জানা যায়। মিজান নামে এক লোক প্রকাশ্যে চাঁদা তোলায়, তার রোষানলের শিকার সাইফুদ্দীন, মামুন, কায়সার ও করিম নামে সাধারণ দোকানদার।
যদিও অভিযুক্তরা বলেছেন, তাদের চাঁদা তোলার সংগঠনটি নিবন্ধিত। তবে, সড়কে দোকান বসিয়ে চাঁদা তোলার জন্য কারা নিবন্ধন দিলো তা জানা যায়নি। কিন্তু এটাই স্পষ্ট, এভাবে সড়ক দখল করে বাজার বসানোর ফলে ওই এলাকায় প্রতিদিন তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
চাতরী চৌমুহনীর অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশে আইন, প্রশাসন বলে কিছু নেই। একটা সড়ক এভাবে দখল হয়ে বাজার বসেছে অথচ তা সরাতে কারও কোনো উদ্যোগ নেই? আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসন কিংবা ট্রাফিক পুলিশ কী করছেন? মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে তাদের আদৌও কোনো মাথাব্যথা আছে কি? তাঁরা কেন এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না? চাতরী এলাকাতো তাদেরই অধীন এবং এটা তাদেরই কাজ।
উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, ‘চাতরী বাজারের যানজট নিরসন ও সড়ক দখল মুক্ত করতে সাত এপ্রিলেও অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট সরে গেলে সড়ক আবারো তাদের দখলে চলে যায়।’ এক্ষেত্রে স্পেশাল কোন বাহিনী যেমন-র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) কিংবা ব্যাটালিয়ন পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে সড়কের উপর ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করা যায় কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় উপস্থাপন করার কথা জানান।’
কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় এই সন্দেহ খুবই স্বাভাবিক যে, এখানে কোনো স্বার্থ বা ভাগ-বাঁটোয়ারার সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিটি অবৈধ দখলদার দোকানি থেকে দৈনিক ১০০ টাকা হারে শতাধিক ভাসমান স্পট থেকে চাঁদা নিলে দিনে আয় ১০ হাজার, সপ্তাহে ৭০ হাজার, মাসে ৩ লাখ, বছরে ৩৬ লাখ টাকা চাঁদা ওঠে। এ টাকা যাচ্ছে কার পকেটে?
অথচ, উপজেলা প্রশাসনের ইজারা বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট শর্ত রয়েছে, সরকার অনুমোদিত টোল আদায় করতে হবে। বিনা রশিদে টোল আদায় করা যাবে না। ইজারাদার নিজ খরচে বাজারে দৃশ্যমান টোল চার্ট টাঙাবেন। বাজার পরিস্কার রাখবেন। নির্ধারিত জায়গা ছাড়া বাজারে পশুর হাট বসানো যাবে না এবং ১৮ নং ক্রমিকে রয়েছে কোন অবস্থাতেই সড়কের উপর হাট বাজার বসানো যাবে না।
এখানকার ইজারাদারের নাম মোজাম্মেল হক। টোল আদায় করেন এরশাদ নামে এক ব্যক্তি। ইজারাদার কিছু বলতে না চাইলেও চাতরী চৌমুহনী বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দারোয়ান নুরচ্ছাফাসহ তিনজনের জন্য ১০ টাকা করে দেড়শ দোকান থেকে তুলে তাদের বেতন ও সমিতির অফিস খরচ চালানো হয়। কোন সদস্যের বিয়ে অনুষ্ঠানেও সাহায্য করা হয়।’ সমিতির নেতা কথায় হিসাব করলে, দৈনিক চাঁদা ওঠে ১৫শ’, মাসে ৪৫ হাজার, বছরে ৫ লাখ ৪০ হাজার। এত টাকা যায় কোথায়? তার উত্তর নেতা জেনেও নীরব।
চাতরী ইউনিয়নের হাজী বশর জানান, ‘প্রতিদিন এই স্থানে তীব্র যানজট লেগেই থাকে তাই কষ্ট হলেও গন্তব্যে পৌঁছাতে রিকশা বা সিএনজিতে না উঠে হেঁটে চলাচল করি। কিন্তু বর্তমানে এমন অবস্থা যে পায়ে হেঁটে চলাচলও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যানজট আর দুর্ভোগ থেকে বাঁচতে আমরা উপজেলা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করি । চাতরী এলাকার মোশাররফ হোসেন জানান, ‘ট্রাফিক ও থানা পুলিশকেও তৎপর হতে হবে। তবে শুধু বাজার উচ্ছেদ করলেই হবে না, এভাবে সড়ক দখল করে যাতে আর বাজার বসতে না পারে, সেটাও দেখতে হবে ।’
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শেখ জোবায়ের আহমেদ বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে মোটেও নমনীয় নয়। এটার সমাধানে কমিউনিটি ইনভলভমেন্ট দরকার। আমার একার প্রচেষ্টাতে সম্ভব নয়। ট্রাফিক পুলিশ আছে। তাঁদের জিজ্ঞেস করেন।’
আনোয়ারা ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ (টিআই) হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘কেইপিজেড কারখানা ছুটি হলে চাতরী বাজারে যানজটের সৃষ্টি হয়। ওই সময় যানজটের কারণে বাজারের তিন পাশের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে, বিকেল চারটা থেকে রাত পর্যন্ত সময়ে যাতায়াতকারীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এটা সত্য। চাঁদাবাজি কারা করে আমরা জানি না।’
(জেজে/এসপি/এপ্রিল ১২, ২০২২)
