রাজনৈতিক কোন্দল না অন্য কিছু?
কর্ণফুলীতে ৫ বছরে ৫ ইউএনওর বদলি!
জে. জাহেদ, চট্টগ্রাম : দেশের ৪৯০ তম সর্বকনিষ্ঠ উপজেলা কর্ণফুলীতে গত পাঁচ বছরে পাঁচজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বদলি হয়েছেন। সর্বশেষ ১৩ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে বর্তমান ইউএনও শাহিনা সুলতানাকে সরিয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের উপ-পরিচালক পদে পদায়ন করা হয়েছে।
এদিকে ঘন ঘন ইউএনও’র বদলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কেননা, ছোট উপজেলা হিসেবে পেকুয়ায় এতবেশি বদলির ঘটনা ঘটেনি। স্থানীয়দের ধারণা রাজনৈতিক কোন্দল কিংবা জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয়হীনতার কারণেই ঘন ঘন তাদের বদলি হচ্ছে!
জানা যায়, দেশের সব উপজেলায় ১৭টি সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল দুটি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা। এর মধ্যে একটি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কমিটি এবং অন্যটি দুুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দরপত্র কমিটির সভাপতি। বাকিগুলোর সভাপতি ইউএনও’রা। জনপ্রতিনিধি হয়েও কাজ করার ক্ষেত্রে হাত-পা বাঁধা তাঁদের।
সরাসরি মুখ খুলতে রাজি না হলেও উপজেলার অনেক জনপ্রতিনিধিরা জানান, ইউএনও’দের আমলাতান্ত্রিক মনোভাব। এমনকি উপজেলা পর্যায়ে তাঁরা শাসকের ভূমিকা পালন করেন। জনপ্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে ইউএনও পরিষদের বেশির ভাগ কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। উপজেলা পরিষদের সব কাজে চেয়ারম্যানের অনুমোদন নিতে হয় ইউএনওদের কাছ থেকে। এ ছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সদস্যরাও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না।
ইউএনওরা দুই তিন বছর একটি এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু চেয়ারম্যানরা জনপ্রতিনিধি। তাঁদের পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হওয়ারও চিন্তা করতে হয়। চেয়ারম্যানদের অনেক দায়বদ্ধতা থাকে। সেভাবে কাজ করতে গেলে নিয়মের বাহিরে অনেক সময় কাজ করতে হয়। এতেই বিপত্তি আর মনোমানিল্য রূপ নেয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও’দের সাথে। মত বিরোধ সৃষ্টি হয় মাসিক আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সমন্বয় সভায়।
সচেতনমহল ও সাধারণ মানুষেরা বলেন ভিন্ন কথা। তাঁরা জানান, উপজেলার কিছু উন্নয়নমূলক প্রকল্পে নামে বেনামে প্রকল্প ও সভাপতি দেখিয়ে লুটপাট হয়। এমনকি শুধুমাত্র কোটেশন দেখিয়ে টেন্ডারবিহীন কোটি কোটি টাকার সরকারি কাজ করা হয়। জনপ্রতিনিধিদের পছন্দসই লোকজন দিয়ে চলে এসব অনিয়ম। ইউএনওরা এসব অনিয়মে মৌনসম্মতি না জানালে ভাগ্যে জুঁটে বদলি।
একটি অসমর্থিত সূত্র নিশ্চিত করে বলেন, কর্ণফুলী উপজেলা সৃষ্টিলগ্ন থেকে সকল দপ্তরে এ যাবত সরকারি অডিট পরিচালনা করা হয়নি। ইউএনও অর্থবছরের নিরীক্ষা/অডিট কার্যক্রম পরিচালিত করার আগ্রহ প্রকাশ করলে তা নিয়ে উপজেলায় মতপার্থক্য তৈরি হয়। তবে এসব বিষয়ে জানতে উপজেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিনা সুলতানা বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বদলি-পদায়ন নিয়মিত বিষয়। এসব বিষয়ে মন্তব্য করার কিছু নাই। তবে যতদিন ছিলাম তাঁর ভালো মন্দ মূল্যায়ন করবে উপজেলাবাসী।’
তথ্যমতে, কর্ণফুলী উপজেলার প্রথম নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ আহসান উদ্দীন মুরাদ। ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি নিয়োগ পান। নিয়োগের তিন মাসের মাথায় তাঁকে বদলি করা হয়েছিল। বদলির ৮দিন পর তা আবার স্থগিত করেছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়। পরে আবারও বদলি হন।
এরপর, ২০১৭ সালের ৫ জুলাই আহসান উদদিন মুরাদের স্থলাভিষিক্ত হন নতুন নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বিজেন ব্যানার্জী। তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৯ তম ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন। নিজ বাড়ি ছিল মৌলভীবাজার জেলার জুড়ি উপজেলা। তিনিও এক বছরের বেশি থাকতে পারেননি।
২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর উপজেলার তৃতীয় নির্বাহী অফিসার হিসেবে যোগদান করেন সৈয়দ শামসুল তাবরীজ। তিনি ছিলেন ৩০তম বিসিএসের কর্মকর্তা। নিজ জেলা ফেনী। অল্প সময়ে তিনি সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি ও আস্থা অর্জন করেছিলেন। এরপর ১ বছর ৪ মাস ৭ দিন পর তিনিও বদলি হন। পরে কর্ণফুলী উপজেলার নতুন ইউএনও হিসেবে নিয়োগ পান ৩১তম বিসিএস (প্রশাসন) কর্মকর্তা প্রবীর কুমার রায়। তিনি কর্ণফুলী উপজেলার আদেশ বাতিল করে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় বদলি নিলেন।
এরমধ্যে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নতুন ইউএনও হিসেবে যোগদান করেন মোঃ নোমান হোসেন। এর পাঁচ মাস যেতে না যেতেই হঠাৎ ২৯ জুলাই তিনিও বদলি হলেন। একই বছরের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সাক্ষরিত এক আদেশে কর্ণফুলী উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে নিয়োগ পান শাহিনা সুলতানা।
২৮তম বিসিএস ব্যাচের ওই কর্মকর্তা ৩০ জুলাই উপজেলায় যোগদান করেন। এটাই সত্য, এই উপজেলায় অতীতে নিয়োগপ্রাপ্ত সকল নির্বাহী অফিসারদের স্থায়িত্বকালের রেকর্ড ভেঙ্গে তিনি ১ বছর ৮ মাস ২৮ দিন সংশ্লিষ্ট উপজেলায় কর্মরত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৯ মে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার)-এর ১১২ তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকার চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলাধীন চরলক্ষ্যা, চরপাথরঘাটা, শিকলবাহা, জুলধা ও বড়উঠান ইউনিয়ন সমন্বয়ে কর্ণফুলী থানাকে উপজেলায় উন্নীতকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের আনুষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু হয়।
(ওএস/এসপি/এপ্রিল ১৪, ২০২২)
