জে. জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় ‘বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক’ কলেজবাজার শাখা হতে তথ্য গোপন করে অন্যের জমি মর্টগেজ দিয়ে ৫ লক্ষ টাকা নগদ পুঁজি ঋণ গ্রহণ করার অভিযোগ ওঠেছে মেসার্স মুছা আদর্শ ডেইরী ফার্ম এর মালিক মুছা আদর্শের বিরুদ্ধে। সে শিকলবাহা জীবন মাঝি বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা।

ব্যাংক সূত্র জানায়, ওই ঋণে সুদসহ বকেয় দাঁড়ায় ১১ লাখ ১৯ হাজার ৮০৫ টাকা। ঋণ পরিশোধ না করায় অর্থ ঋণ আইনে মামলা করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। পরে ঋণের বিপরীতে দেওয়া জমি নিলামে ওঠে। এতে ভিটেমাটি হারাতে বসেছে এক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। এমন অভিযোগ শিকলবাহা এলাকার নুর নাহার বেগমের ।

নুর নাহার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইদ্রিস (প্রয়াত) এর কণ্যা। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পিতা স্বাধীনতা সংগ্রামে ১ নম্বর সেক্টরে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ স্বশস্ত্র বাহিনীর তৎকালিন অধিনায়ক মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী কতৃক সনদ রয়েছে। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রলালয়ের সনদও (ম ১৭১৯৭৭)।

পরিবারটি প্রতারণার শিকার হচ্ছেন এমন তথ্য জানিয়ে প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট কৃষি ব্যাংক ব্যবস্থাপকের কাছে আবেদন করেন। এতে নিলাম কার্যক্রম বাতিলের কথাও জানিয়েছেন। পাশাপাশি ভ‚ক্তভোগিরা উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভ‚মি) বরাবরেও লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। যাতে বাপ দাদার ভিটেমাটি রক্ষায় উৎস খতিয়ানে স্বত্ত¡ পুনর্বহাল করা হয়।

ঘটনার অনুসন্ধান ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ মার্চ প্রকাশিত ব্যাংক নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ রয়েছে ঋণ নেওয়া সম্পত্তির ম‚ল মালিক মরহুম বদিউজ্জামানের ছেলে মোহাং আব্বাস। কিন্তু ১৯৮৯ সালের ১৯ নভেম্বর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিকৃত ৬২৫৫ নং দানপত্র দলিল ম‚লে মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইদ্রিস কণ্যা নুর নাহার বেগম ও তাঁর স্বামী নিলামকৃত সম্পত্তির মালিক হন। দানপত্র ম‚লে এই সম্পত্তি প্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিন যাবত গৃহ নির্মাণ করে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ ও হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করে ভোগ দখলে রয়েছেন।

কিন্তু মালিক দাবিদার আব্বাস এর মৃত্যুতে তাঁর ওয়ারিশ ১ স্ত্রী, ৪ পুত্র ও ৩ কণ্যা থাকার পর অন্যান্যদের নাম না দিয়ে পুত্র মোহাম্মদ মুছা আদর্শ জালিয়াতির মাধ্যমে নামজারী জমাভাগ (মামলা নং-১১৪৮৮/২০১২ইং) ম‚লে দুই দাগে মোট চার গন্ডা জমি তার নিজের নামে নামজারী খতিয়ান (১০৭৯২) সৃজন করেন।

পরে এসব কাগজপত্র ব্যবহার করে কলেজবাজার কৃষি ব্যাংক শাখা হতে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন। ওদিকে, ভ‚ক্তভোগি পরিবারটি ব্যাংক সম্পত্তির প্রকৃত দখলকার ও মালিকানা থাকা সত্বেও যাচাই বাচাই না করে ব্যাংক ঋণ প্রদান করে বলে অভিযোগ তুলেন । বিষয়টি জানতে পেরে মুক্তিযোদ্ধা কণ্যা উপজেলা ভূমি অফিসে মোহাম্মদ মুছা আদর্শ এর খতিয়ান বাতিলের আবেদন করেন। চলমান বিষয়টি এসিল্যান্ড অফিসে চ‚ড়ান্ত শুনানীর জন্য দিন রয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নুর নাহার বেগম বলেন, ‘হঠাৎ ভিটেমাটি নিলামের খবরে আমরা হতবাক হয়েছি। জাল জালিয়াতির মাধ্যমে স্বত্ত¡হীন ব্যক্তির কাছে ব্যাংক লোন প্রদান করায় আমরা হয়রানির শিকার হচ্ছি। দাবি জানাচ্ছি, আপত্তি, দখল ও সম্পত্তির মালিকানার বিষয়ে চ‚ড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিলাম কার্যক্রম স্থগিত রেখে প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধান করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার।’

তিনি আরও বলেন, ‘মূল উৎস খতিয়ান থেকে অনেক মালিকেই জমি কেনা বেচা বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি জমির মিউটিশন না করেন। আর এই সুযোগে যদি অন্যেরা ওই জমি নিজের মালিকানা দেখিয়ে প্রতারণা করে ব্যাংক ঋণ নেয়। আর মুল মালিকের অজান্তে যদি ভিটেবাড়ি/জমি নিলামে ওঠে। তাহলে কী প্রকৃত জমির মালিকের ঘরবাড়িও চলে যাবে? বিজয়ের ৫০ বছর পর আমরা মুক্তিযোদ্ধা পরিবার আজ বড় অসহায়।’

অভিযুক্ত মোহাম্মদ মুর্ছা আদর্শ বলেন, ‘আমি ব্যাংকে লোনের জন্য যখন আবেদন করি। তখন ব্যাংক থেকে বলল নিজের নামে খতিয়ান লাগবে। তখন আমি আমার বাবার জায়গা খতিয়ান করেছিলাম। এটা যে নুর নাহারের ভিটেমাটি আমি এখন জানতেছি। অলরেডি ব্যাংকে গিয়ে বলে আসলাম ওটা আমার জায়গা নয়। আমার দুই ভাই মুক্তিযাদ্ধা। ভুক্তভোগি আমার বড় ভাইয়ের মেয়ে। সে আমার ভাতিজী। আমি বর্তমানে খুব অসুস্থ। লোন পরিশোধ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ আমার ফার্মের সব গরু মারা গেছে।’

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি ব্যাংক কলেজ বাজার শাখার ব্যবস্থাপক মোঃ মনির আহমেদ বলেন, ‘যে জমি দেখিয়ে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা মুছা আদর্শ লোন নিয়েছেন। সে জমিটি উনার নামে খতিয়ান সৃজন হয়ে যথারীতি ডিসিআর কেটে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করেছিলেন। নিয়ম অনুযায়ি সব তল্লাশি করে জমির উপর ৫ লাখ টাকা নগদ পুঁজি ঋণ প্রদান করা হয়। পরে বন্ধকী দলিলটি পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দেওয়া হয়। এরমধ্যে আমরা নুর নাহার বেগম থেকে একটি আবেদন পাই। সাথে সাথে আমরা বিষয়টি এসিল্যান্ড অফিসকে অবগত করেছি। নিলাম কার্যক্রমও এখন স্থগিত রয়েছে।’

মানবাধিকার, আইনজীবী, কলামিস্ট ও সুশাসনকর্মী এ এম জিয়া হাবীব আহ্সান বলেন, ‘ভ‚মি অফিসে যদি সঠিক নিয়মে তদন্ত করে নামজারি খতিয়ান সৃজন করা হতো। তবে এ সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়তো। কিন্তু আমরা এখনো ভ‚মি অফিসে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে পারিনি। ভ‚মি অফিসে অনিয়ম দুর্নীতির কারণে সরকারের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। ব্যাংকের ও যাছাই বাছাই করা উচিত ছিল।’

উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভ‚মি) শিরিন আক্তার জানান, ‘যতদুর জেনেছি ভূক্তভোগির আবেদনের প্রেক্ষিতে দুইপক্ষকে শিকলবাহার ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে নোটিশ ইস্যু করা হয়েছিল। তহশিলদার প্রতিবেদন দিয়েছেন। এখন উপজেলা ভূমি অফিসে চ‚ড়ান্ত শুনানীর জন্য দিন রয়েছে। শিগগিরই শুনানি শেষে আদেশ হবে।’

(জেজে/এএস/এপ্রিল ১৬, ২০২২)