জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : এক বছর, দুই বছর নয়, টানা দশ বছর বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেননি চট্টগ্রাম কর্ণফুলী উপজেলার ১নং চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদ। কিন্তু এরপরেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এর মইজ্জ্যারটেক উপকেন্দ্রের কর্মকর্তারা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি।

এর কারণও নাকি অনেক। সুবিধা নিয়েছেন এই উপকেন্দ্রের কোন না কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার আগে, ২০১১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর পরিষদের দায়িত্বে ছিলেন সদ্য সাবেক চরলক্ষ্যার ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী। তিনি এই ১০ বছরে কোন বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেননি।

সেক্ষেত্রে চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদের কাছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বকেয়া পাওনা রয়েছে, ৪ লাখ ১৮ হাজার ৪৩ টাকা। যা এখনো পরিশোধ করা হয়নি বলে জানা গেছে। পিডিবি সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ রয়েছে, দফায় দফায় বিল পরিশোধের জন্য চরলক্ষ্যার তৎকালিন চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হলেও তিনি তা আমলে নেননি।

বছরের পর বছর বিদ্যুৎ বিল না দিয়েই তিনি পরিষদ পরিচালনা করেছেন। এরপরেও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি পিডিবি। অথচ বিদ্যুৎ বিলের প্রতিটি কপির নিচে লাল অক্ষরে লেখো রয়েছে, “নিদির্ষ্ট তারিখের মধ্যে বিল পরিশোধ না হইলে, কোনরুপ পুর্ব নোটিশ ব্যতিরেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন করা হইবে।”

পিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, একই অবস্থা শিকলবাহা ইউনিয়ন পরিষদের বেলায়। তবে নির্বাচনের আগে কিছু বিল পরিশোধ করায়। শিকলবাহা ইউনিয়ন পরিষদের বিলের পরিমাণ কিছুটা কম রয়েছে বলে তথ্যে জানান।

মইজ্জ্যারটেক পিডিবি উপকেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, বিদ্যুৎ বিলে ১নং চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদের মিটারের নাম উল্লেখ রয়েছে ‘ইউনিয়ন পরিষদ অফিস’। ট্যারিফ শ্রেণি ছিল এলটি/এ আবাসিক। বিদ্যুৎ বিলের হিসাব নম্বর-এ/৮০৩৯। মিটার নম্বর-৬৫৬৭৬৭। বই নম্বর-৯২০। বিল নম্বর-২৫৫। বিল ইস্যু নম্বর-৭৩৯১৩। গত মার্চ মাসেও ৩০০ ইউনিটের বিল জমেছে ১ হাজার ৭৪২ টাকা। প্রতি ইউনিট বিল ধরা হয় ৫ টাকা ৪৩ পয়সা। যা ৪ লক্ষ ১৮ হাজার ৪৩ টাকায় যুক্ত হয়েছে। যেখানে আরও যুক্ত রয়েছে ৫% ভ্যাট বাবদে ১৫ হাজার ৫৪৩ টাকা।

অনুসন্ধান বলছে, গড়মিল রয়েছে প্রতি মাসের বিল তৈরিতেও। কেননা পরিষদের নিজস্ব নামে মিটার থাকলেও দেওয়া হয় এখনো গড়বিল। মিটারের সমস্যা দেখিয়ে পিডিবি অফিস প্রায়শ গড়বিল দিতে থাকলেও কখনো মিটার ত্রুুটিমুক্ত করার তাঁরা উদ্যোগ নেননি। নিয়মতি বিল দেয়নি। এর কারণে রয়েছে, মিটার ঠিক না করে গড়বিল দিয়ে নিজেদের সুবিধা আদায় করা। ফলে, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে লাখ লাখ টাকা।

এসব বকেয়া পরিশোধের জন্য সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলীকে একাধিকবার নোটিশ দেয়া সত্বেও বিল পরিশোধ না করায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। গত বছরে বিল পরিশোধের জন্য দ্রুতই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদে লাল নোটিশ দিয়েও কাজ হয়নি। তারপরও বিল পরিশোধ না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে পিডিবি।

যদিও গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদে নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন মোহাম্মদ সোলায়মান তালুকদার। তাঁকে বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের দায় কে নেবেন, এমন প্রশ্ন করা হলেও তিনি জানান, ‘আমি কারো দোষ দিবো না। ইউনিয়ন পরিষদ যেমন একটি সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। তেমনি পিডিবিও। পরিষদের বিল বকেয়া থাকলে অবশ্যই বিল পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে। হয়তো আগের চেয়ারম্যান তা নেননি। কিন্তু আমি বিভিন্ন ধাপে পিডিবির বিল পরিশোধের ব্যবস্থা নেব।’

চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমি যখন ২০১৬ সালের দিকে পরিষদে আসলাম। তখন পরিষদে বিদ্যুৎ বিলের কোন ফাইল ছিল না। পরে বিদ্যুৎ অফিস হুট করে একটা বিল দেন দুই লাখ টাকার। এরপর পিডিবি অফিসে যোগাযোগ করলেও তাঁরা কোন হেল্প করেননি। তখন চেয়ারম্যানকে জানালাম তিনিও কোন আগ্রহ দেখাননি। তাই বিল পরিশোধ করা হয়নি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘পরিষদে শুধু আমি দায়িত্বকালীন ১০ বছর নয়। এর আগের ১০ বছরও আগের চেয়ারম্যানেরা বিদ্যুৎ বিল দেননি। তাদের মতো আমিও দিইনি। পরিষদের নিচে থানার বিলও এক সাথে হতো। এখন আলাদা মিটার হয়ে থানার বিল থানা দেয় মনেহয়।’

পটিয়া বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘১০ বছরে আমরা ইউনিয়ন পরিষদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিনি একটাই কারণ। নাগরিক সেবা স্থবির হয়ে পড়বে তাই। মানুষ সেবা বঞ্চিত হয়ে চরম অসন্তুষ্ট হতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিল বকেয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যানের উদাসীনতা ও অবহেলাকেই দায়ী করছি। কেননা উনাকে বারবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

(জেজে/এসপি/এপ্রিল ১৮, ২০২২)