এক মণ ধানের দামের চেয়ে শ্রমিকের মজুরি বেশি!
তুষার কান্তি বিশ্বস, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ধানের চেয়ে শ্রমিকের মূল্য বেশি হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছে কৃষকেরা। যেখানে ধান মণ প্রতি ৭০০-৭৫০ টাকা সেখানে একজন শ্রমিকের মজুরি ১ হাজার টাকা থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা। শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকেরা এখনো তাদের ফসল ঘরে উঠাতে পারেনি। স্থানীয় শ্রমিকের সাথে সাথে বাইরে থেকে আসা শ্রমিকদের সংখ্যাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় আসানির প্রভাবে সৃষ্ট বাতাস ও বৃষ্টিতে বেশ কিছু জমির ধান গাছ পরে গিয়েছে। শ্রমিক সংকট সহ সব মিলিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন টুঙ্গিপাড়া উপজেলার কৃষকেরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় জমির ধান পেকে গেছে ও বৃষ্টি বাতাসে বেশকিছু জমির ধান গাছ পড়ে রয়েছে। ঈদের আগে থেকে কৃষকের ধান কাটা শুরু করলেও বেশিরভাগ কৃষকের ধান শ্রমিকের অভাবে মাঠেই পড়ে আছে। তাই কষ্টের ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এছাড়া ধানের মূল্যের চেয়ে শ্রমিকের মূল্য বেশি থাকায় কৃষকেরা পড়েছেন বিপাকে।
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় ৮৫৫৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। হাইব্রিড জাতের ধান বিঘা প্রতি ৫০ মন ও উফসি জাতের ধান ৩৫ মণ হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ধান কৃষকেরা ঘরে উঠিয়েছেন। সার, বীজ ও অন্যান্য খরচ দিয়ে বিঘা প্রতি কৃষকের প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে বাকি ধান কাটতে পারছেনা কৃষকেরা। বর্তমান বাজারে ধানের মণপ্রতি ৭০০-৭৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু ১ হাজার টাকা থেকে ১ হাজার ২ শ’ টাকা দিতে চাইলেও মিলছে না ধান কাটার শ্রমিক।
গওহরডাঙ্গা গ্রামের কৃষক রকিবুল ইসলাম বলেন, দেড় বিঘা জমিতে তিনি বোরো ধানের চাষ করেছি। ধান লাগানো থেকে কাটা পর্যন্ত শ্রমিক মূল্য সহ ৩৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আর ৩০ মন ধান বিক্রি করেছি ২১ হাজার টাকা। কয়েকমাস কষ্ট করে ধান চাষ করে লাভের পরিবর্তে আরো লোকসানে পরেছি। এভাবে যদি ধানের চেয়ে শ্রমিকের মূল্য বেশি থাকে তাহলে কৃষকেরা ধান চাষ থেকে আগ্রহ হারাবে।
টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার কৃষক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ৫ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছিলাম। ধানের ফলন ভালো হলেও মূল্য কম। অন্যদিকে একজন শ্রমিকের মূল্য একমন ধানের দামের চাইতে বেশি। এখন কিভাবে ধান কাটবো সেটাই ভেবে পাচ্ছি না।
ডুমুরিয়া ইউনিয়নের লেবুতলা গ্রামের জাহিদ ফকির বলেন, ৪ বিঘা জমিতে ধানের চাষ করেছি। সব খরচ মিলিয়ে এবার লাভের মুখ তো দেখবোই না বরং লোকসানে পরবো। তবুও ফসল ঘরে উঠানোর আশায় ধান কাটার শ্রমিক অনেক খুজেও পাইনি। তাই আতঙ্কে দিন পার করছি।
শ্রীরামকান্দি গ্রামের দুলাল শেখ জানান, একদিকে যেমন ধান কাটার শ্রমিক সংকট, অন্যদিকে শ্রমিক পাওয়া গেলেও জনপ্রতি ১ হাজার ২শ’ টাকা গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। আর বর্তমানে ধান মনপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৭শ’ টাকা থেকে ৭শ’৫০ টাকা। তাই শ্রমিকের চোকাতে হিমশিম খাচ্ছে কৃষকেরা। তাই সরকার যদি ধানের দাম দ্রুত বাড়ায় তাহলে কৃষকেরা একটু খেয়ে দেয়ে বাঁচতে পারে।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জামাল উদ্দিন বলেন, এবার বোরো ধানের ফলন খুব ভালো হলেও ব্যাপক শ্রমিক সংকট রয়েছে। এছাড়া শ্রমিকের মূল্য গতবারের থেকে প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় কৃষকরা ফসল তুলতে হিমশিম খাচ্ছে। দ্রুত যদি ধানের মূল্য না বাড়ে তাহলে কৃষকেরা ব্যাপক লোকসানের পড়বে। এছাড়া কৃষকের ধান চাষের আগ্রহ হারাবে।
(টিকেবি/এসপি/মে ১১, ২০২২)
