কার্টুনে পাওয়া অজ্ঞাত মৃতদেহ শনাক্ত
২৪ ঘণ্টায় ক্লুলেস হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচন করল পুলিশ
মোঃ আব্দুল কাইয়ুম, মৌলভীবাজার : গত ৪ জুলাই সোমবার মধ্যরাতে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের খঞ্জনপুর গ্রামের ইমাদ ভেরাইটিজ ষ্টোরের সামন থেকে স্থানীয় সূত্রে খবর পেয়ে কার্টুন বন্দী অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সেসময় ওই ব্যক্তির পরিচয় সনাক্ত করতে না পারলেও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনা তদন্তে গুরুত্বের সাথে মাঠে নামেন। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা ও মৃতদেহের ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে ওই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হন তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা। এর পর মাত্র ২৪ ঘন্টার চেষ্টায় ওই লোহমর্ষক ঘটনার রহস্য উন্মোচন করে পুলিশ।
২৪ ঘন্টায় ক্লুলেস হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচন করল পুলিশ
লোহমর্ষক এই হত্যাকান্ডের তদন্ত শেষে লাশের পরিচয় শনাক্তসহ রহস্য উন্মোচন গত ৬ জুলাই বুধবারের মধ্যে সম্পন্ন হলেও শুক্রবার (৮ জুলাই) বিকালে গণমাধ্যমে পুলিশের পাঠানো তথ্যে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৪ জুলাই সোমবার রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে মৌলভীবাজার সদর মডেল থানার নিয়ন্ত্রণাধীন শেরপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (এসআই) ইফতেখার ইসলাম মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানতে পারেন, সদর উপজেলার ১ নং খলিলপুর ইউনিয়নের খঞ্জনপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম এর মালিকানাধীন ইমাদ ভ্যারাইটিজ ষ্টোর এর সামনের বারান্দায় কার্টুনের ভিতর হাত-পা রশি দিয়ে এবং মুখমন্ডল সাদা পলিথিন দিয়ে প্যাঁচানো অবস্থায় অজ্ঞাত এক ব্যক্তির (৫৫) পুরুষ মৃতদেহ ফেলে রাখা রয়েছে। এ তথ্য তাৎক্ষনিক উর্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন ওই কর্মকর্তা। এর পরপরই ঘটনার সত্যতা যাচায়ের জন্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সত্যতাও পান তিনি। পরবর্তীতে মৌলভীবাজার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, মোঃ জিয়াউর রহমান ও মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ ইয়াছিনুল হকসহ ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন। ওই সময় মৃতদেহের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে নাম ঠিকানা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের কার্যক্রম শুরু করে পুলিশ।
এর পর উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইফতেখার ইসলাম লাশের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে ময়না তদন্তের জন্য মৌলভীবাজার সদর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের মর্গে পাঠান। ময়না তদন্ত শেষে লাশের কোন ওয়ারিশ সনাক্ত করতে না পারায় লাশের দাফনের জন্য মৌলভীবাজার পৌরসভা বরাবর প্রেরণ করা হলে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম লাশ দাফন সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিগন পরষ্পর যোগসাজসে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে খুন করে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে বর্ণিত ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে যায় মর্মে এসআই ইফতেখার ইসলাম মৌলভীবাজার সদর থানায় এজাহার দায়ের করলে অফিসার ইনচার্জ মৌলভীবার সদর মডেল থানা ঘটনাটিকে খুন হিসেবে মামলা রুজু করে মামলা তদন্তের দ্বায়িত্ব পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মোঃ মশিউর রহমান এর উপর দেয়া হয়।
পরবর্তীতে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকারিয়া এর নিদের্শনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদর্শন কুমার রায়, সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ জিয়াউর রহমান এর তত্ত্ববধানে মৌলভীবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ ইয়াছিনুল হকের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ তদন্ত টীম মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে ক্লু-লেস লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন ও জড়িত আসামী গ্রেফতারে সক্ষম হন।
তদন্তকারী পুলিশ কর্মূকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তকালে অজ্ঞাত লাশের পরিচয় সনাক্তের জন্য বেতার বার্তা সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যপক প্রচার প্রচারণা চালানো হয়। এর পর অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয় হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার দত্তগ্রামের মৃত আয়না মিয়ার ছেলে আইয়ুব আলী (৫৫) বলে মৃতদেহ সনাক্ত করতে সক্ষম হন পুলিশ কর্মকর্তারা।
তদন্তের এক পর্যায়ে আইয়ুব আলীর আত্মিয়-স্বজন এবং দত্তগ্রামের অন্যান্য লোকজনদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি প্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডের সাথে জনৈক মনসুর রহমান, অনুপ দাস সহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিগনের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেলে তথ্য প্রযুক্তি সহায়তায় বিশেষ পুলিশি অভিযান পরিচালনা করে দত্তগ্রাম এলাকা থেকে মনসুর রহমান (৩০), পিতা-মৃত শফিকুর রহমান এবং অনুপ দাস(৪০), পিতা-মৃত অহি ভোষন দাসসহ দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা একই এলাকার বাসিন্দা বলে জানিয়েছেন মৌলভীবাজার মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) ও তদন্তকারী কর্মকর্তা মশিউর রহমান। তিনি জানান, লেনদেন ও পূর্ব শত্রুতার জেরে এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছে।
এদিকে হত্যাকান্ডের মূল রহস্য উদঘাটনের লক্ষে গ্রেফতারকৃত আসামীদের কৌশলী জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আসামীরা জানায়, আইয়ুব আলীর সাথে টাকা পয়সার লেনদেন এবং পুর্ব বিরোধকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকান্ডটি গত ৪ জুলাই রাত ১০টার দিকে আসামী মনসুর,অনুপ দাস ও আসামী ইকবাল হোসেন মিলে সংঘঠিত করেছে। হত্যাকা-ে জড়িত তিন আসামীকে হবিগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে একজন আসামী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অপরদিকে ৭ জুলাই পলাতক অপর আসামী ইকবাল হোসেন,পিতা- ছানু মিয়া,গ্রাম দত্তগ্রাম,নবিগঞ্জ,হবিগঞ্জকে হবিগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে শুক্রবার ৮ জুলাই আদালতে সোপর্দ করা হয়। এছাড়াও তাদের দেয়া তথ্যে ৭ জুলাই থেকে লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মৌলভীবাজার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ জিয়াউর রহমান বলেন, মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা, সোস্যাল মিডিয়ার প্রচারণা ও ফিঙ্গার প্রিন্টের সূত্রধরে লোহমর্ষক ঘটনার রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে।
(একে/এসপি/জুলাই ০৮, ২০২২)
