রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : তিন মাস নিষেধাজ্ঞা শেষে সুন্দরবনের নদ-নদীতে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে মাছ ও কাঁকড়া ধরার অনুমতি পাচ্ছেন জেলেরা। তাই নদীতে নামার প্রস্তুতিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। ঝড়-জলের ধাক্কা সামলাতে পুরনো জালগুলো মেরামত করছেন তারা, কেউ আবার নতুন জাল তৈরি করছেন। পাশাপাশি, কাঠের নৌকাগুলোও মেরামত চলছে পুরোদমে।

উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, কৈখালী ও রমজাননগর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চুনা, চুনকুড়ি, মালঞ্চ ও খোলপেটুয়া নদীর ধারে সবাই পুরোনো নৌকা রং করা, ছেঁড়া জাল মেরামতের কাজে ব্যস্ত। এর মধ্যেও তাদের মুখে হাসির ঝিলিক। মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষগুলোর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলায় চারদিকে উৎসবের আমেজ।

শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ হরিনগর জেলে পাড়ার মথুরাপুর গ্রামের জেলে পরিমল সরদার (৫৫) বলেন, জাল মেরামত না করলে নদীতে নামা সম্ভব না। এখনকার নদী আগের মতো সহজ না জলজঙ্গলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয় সবসময়ই থাকে। ছোটবেলা থেকে মাছ ধরার পেশায় জড়িত। তাই সুন্দরবনে যাওয়ার আগো নৌকাতে আলকাতরা দিচ্ছি এবং জাল মেরামত করেছি। সুন্দরবনের ভেতরের নদ-নদীতে মাছ-কাঁকড়া ধরা নিয়ে রয়েছে তার নানান অভিজ্ঞতা। নিষিদ্ধ সময় ছাড়া বাকি সময়ে মাছ ধরার কাজ করেন তিনি।

নীলডুমুর এলাকায় ওয়াহেদ গাজী (৬০) বলেন, যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকে বাদাই (সুন্দরবনে) মাছ-কাঁকড়া ধরার কাজে জড়িত। এখন পর্যন্ত এ পেশায় আছি। বছরের দুটি সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। তখন আমাদের অন্য কাজ করে সংসার চালাতে হয়। মাছ ধরা শুরুর আগে ঋণ করে বিভিন্নভাবে নৌকা মেরামত ও জাল কিনে নদীতে নামি। তবে মাছ পাওয়ার বিষয়টি আল্লাহর ওপর। নদীতে নামলে অনেক সময় মাছ পাওয়া যায়, আবার অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হয়।

জেলেদের অনেকেই জানান, এবারের মৌসুমে নদীতে প্রচুর মাছের আশাবাদী তারা। তবে একই সঙ্গে তারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার জ্বালানি খরচ ও জাল-নৌকার মেরামতের খরচ অনেকটাই বেড়েছে। নিষেধাজ্ঞা দিলে আমরা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকি। তবে সরকার থেকে যে সহায়তা দেওয়া হয় সেটি দিয়ে সংসার চলে না। যে কারণে অন্য কাজ করে উপার্জন করি। সরকার সুন্দরবন ও মাছ-কাঁকড়া রক্ষায় যে অভিযান চালায় সেটি আরও কঠোর এবং নেট জাল ও কারেন্ট জালের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধসহ অবৈধভাবে সুন্দরবনে চোরা শিকারি বন্ধ করা দরকার। তাহলে সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ-কাঁকড়া পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

জেলে আকবর মালী (৬০), মজিদ সরদার (৫৮), হানিফ গাজী (৫০), ইদ্রীস গাজী (৫৫), আল মামুন মালী (৩০) বলেন, নদীতে নামার জন্য জাল ও নৌকা মেরামতের কাজ করছি। তিন মাস সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকায় আমাদের সংসার অনেক কষ্টে চলেছে। কারণ আমরা মাছ-কাঁকড়া ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজ করতে পারি না। যে কারণে সুন্দরবনে মাছ পাওয়ার আশা নিয়ে এখন আবার জাল মেরামত করে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু যে হারে সুন্দরবনে ডাকাত বেড়েছে তাই নিয়ে চিন্তায় আছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি সুন্দরবনের ডাকত নির্মূলে পদক্ষেপ নিত তাহলে আমরা নিশ্চিন্তে মাছ, কাঁকড়া ধরতে পারতাম।

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, ১ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশন থেকে নৌকা নিবন্ধন বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) হয়েছে ২ হাজার ৯৭০টি।

সুন্দরবন ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি খোদা বক্স গাজী জানান, পর্যটকের ওপর নির্ভর করে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় পাঁচ শতাধিক ট্রলার চলে। সুন্দরবনে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাছ ও কাঁকড়া ধরা বন্ধ রাখার পাশাপাশি পর্যটক ঢোকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় ট্রলারচালক ও শ্রমিকরা বেকার জীবন যাপন করেন। তাদের সংসার চলে খুব কষ্টে ধার দেনা করে।

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ফজলুল হক বলেন, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা, জীবজন্তু ও মাছের প্রজনন বাড়ানোর জন্য ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে নদ-নদীতে মাছ, কাঁকড়া ধরা ও পর্যটক প্রবেশেরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ফলে সুন্দরবনের মাছ ও কাঁকড়া ধরার ওপর নির্ভরশীল সম্প্রদায় সমস্যায় ছিল। আগামী ১ সেপ্টেম্বর সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে। জেলে ও বাওয়ালিদের সুন্দরবনে ঢোকার পাস (অনুমতি) দেওয়া হবে। এ জন্য আগে থেকে জেলে বাওয়ালির পাশাপাশি পর্যটক পরিবহনকারী ট্রলারমালিকেরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

(আরকে/এএস/আগস্ট ২৯, ২০২৫)