আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রশংসা
রূপপুর পারমাণবিকের কর্মকর্তাদের জ্ঞান, পেশাদারিত্ব এবং পরিচালন দক্ষতা ও নিরাপত্তা উন্নত করার দৃঢ় অঙ্গীকার

ঈশ্বরদী প্রতিনিধি : দেশের প্রথম রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের জ্ঞান, পেশাদারিত্ব এবং পরিচালন নিরাপত্তা উন্নত করার দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রশংসা করেছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রি-ওসার্ট টিম। কেন্দ্রটির কর্মীদের সাথে আলোচনাকে ‘ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করে তারা জানিয়েছেন, অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে নিরাপত্তার মান আরও বাড়ানো সম্ভব বলে জানিয়েছে আইএইএ। এখানকার কর্মীরা দক্ষ, পেশাদার এবং কেন্দ্রের কার্যকরী নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা উন্নত করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আদান-প্রদানের মাধ্যমে কেন্দ্রের নিরাপত্তা উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করে প্রি-ওসার্ট টিমের প্রতিনিধিরা।
পরিদর্শন শেষে আইএইএ এর বিশেষজ্ঞ দল কেন্দ্রটির পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তার প্রতি অঙ্গীকারের প্রশংসাও করেছে। পরিচালন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। তবে অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং সার্বিক তত্ত্ববাবধানে আরও উন্নতির পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি বিশেষজ্ঞ দল। পরিদর্শন শেষে আইএইএ-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়েছে।
গত ১০ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত পাবনার রূপপুরে এই আইএইএর ‘প্রাক-পরিচালনা সুরক্ষা পর্যালোচনা মিশন’ (প্রি-ওসার্ট) পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে আয়োজিত এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর আগে এর পরিচালন সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়ন করা। মিশন চলাকালে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট পরিচালনার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা, কার্যক্রম, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, অপারেশনাল অভিজ্ঞতা, রেডিয়েশন সুরক্ষা, রসায়ন, জরুরি প্রস্তুতি, দুর্ঘটনা ব্যবস্থাপনা এবং কমিশনিং ইত্যাদি বিষয় পর্যালোচনা করে প্রি-ওসার্ট দল।
রূপপুরের ব্যবস্থাপনা ‘চমৎকার’ উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ দলটি বলেছেন, যা বিশ্বের অন্যান্য পারমাণবিক শিল্পের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। বিশেষ করে, ফুয়েল রিফুয়েলিং মেশিনের কার্যক্রম পরিচালনার প্রশিক্ষণের জন্য স্টেট-অব-দ্য-আর্ট সিমুলেটর (সর্বাধুনিক প্রযুক্তি) ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
এই দলে বুলগেরিয়া, চীন, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ জন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এ ছাড়া যুক্ত ছিলেন আইএইএ কর্মী এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের একজন পর্যবেক্ষক। এ বিষয়ে আইএইএর সিনিয়র নিউক্লিয়ার সেফটি অফিসার সাইমন মরগান বলেন, ‘কমিশনিং থেকে অপারেশনে যাওয়া একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপদ পরিচালনার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ ধাপটি নিরাপদে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রূপপুরের কর্মীরা দক্ষ, পেশাদার এবং নিরাপত্তা উন্নয়নে আন্তরিক। কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি জাতীয় ও আইএইএ মান অনুযায়ী সম্পন্ন করতে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
তবে, সুরক্ষা আরও জোরদার করার জন্য মিশনটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে: অগ্নি ঝুঁকি কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে এবং দ্রুত পদক্ষে নিতে অগ্নি প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও উন্নত করা; বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সার্বিক কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান, পরিচালন মান এবং আচরণ উন্নত করা; কমিশনিং পর্যায়ে বিভিন্ন সিস্টেম ও যন্ত্রাংশের সঠিক সুরা নিশ্চিত করার জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা।
আইএইএ-এর কর্মকর্তারা বাংলাদেশের কাছে এই মিশনের একটি খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ খসড়ায় এখন তথ্যগত মন্তব্য যোগ করার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। আইএইএ এসব মন্তব্য পর্যালোচনা শেষে তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানী লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান আইএইএ মিশনের পর্যলোচনা পজিটিভ উল্লেখ করে বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি উচ্চ প্রযুক্তির এবং নিরাপত্তা নির্ভর প্রকল্প। প্রতিটি ধাপ সুপরিকল্পিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়, যাতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কম হয় ও সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। প্রি-ওসার্ট মিশনের পর ফাইনাল ওসার্ট মিশন হবে। এখন আইএইএ এর পরামর্শগুলো কার্যকর করার পর তাদের অনুমতি মিললে সুবিধাজনক সময়ে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোড করা হবে। এই জ্বালানি লোড করার পর সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে সময় লাগবে প্রায় ৯০ দিন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক মো. কবীর হোসেনের মোবাইলে গতকাল একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সাড়া মেলেনি। তবে আইএইএর প্রতিনিধিদলকে তিনি তার মন্তব্যে বলেছেন, ‘প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতার উচ্চমান অর্জন ও বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ। প্রি-ওসার্ট মিশন এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আন্তর্জাতিক মানদন্ড পূরণ ও দুর্বলতা চিহ্নিত করতে আমাদের সহায়তা করছে। প্রি-ওসার্ট মিশনের সঙ্গে এই সম্পৃক্ততা একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক স্থাপনা গড়ে তোলা এবং শক্তিশালী পারমাণবিক নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অঙ্গীকার প্রকাশ করে।’
এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ আমাদের জন্য অনেক মর্যাদার। আইএইএ এর প্রি-ওসার্ট মিশন যেসব পরামর্শ দিয়েছে সেগুলো দ্রুত আমলে নেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো, জ্বালানি লোডিংয়ের সময় বা কমিশনিংয়ের পর কোনো কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা প্রশমনের জন্য জরুরি সাড়াদান কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা। সকল নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও অমূলক ভয় কাটানোর জন্যও নানা পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
পরিদর্শন শেষে প্রি-ওসার্ট মিশনের সাথে চুড়ান্ত মতবিনিময় সভায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হেসেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মো. মজিবুর রহমান, প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন, এনপিসিবিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসানসহ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার এতমস্ত্রয় এক্সপোর্ট এবং প্রকল্পের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রসংগত: রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ঈশ্বরদীর রূপপুরে ভিভিইআর-১২০০ মডেলের দুটি চুল্লি স্থাপন করা হচ্ছে।
(এসকেকে/এসপি/আগস্ট ৩০, ২০২৫)