তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পেরেশন (বিসিক) গোপালগঞ্জে ৫০ একর জমিতে সম্প্রসারিত বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তুলেছে। নৌ, সড়ক ও রেল যোগাযোগ সম্বলিত এ শিল্পনগরীতে দেশের বৃহৎ-বৃহৎ উদ্যোক্তারা শিল্প ইউনিট স্থাপন করতে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন।কিছু শিল্প ইউনিট এখানে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে। এসব শিল্প ইউনিটে জেলার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। পুরেদমে এ বিসিকের শিল্প ইাউনিটগুলো চালু হলে এ জেলার অন্তত ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে জেলার অর্থনীতি হবে সমৃদ্ধ। জাতীয় অর্থনীতিতে এ শিল্পনগরী অবদান রাখবে।

গোপালগঞ্জ বিসিক শিল্প নগরী কর্মকর্তা সুজন দাস বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ১০২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সম্প্রসারিত শিল্পনগরী বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গোপালগঞ্জ শহরতলীর হারদাসপুরে মধুমতি নদীর তীরে এ নগরীর অবস্থান। ৫০ একরের এ শিল্পনগরীটি ২০২৩ সালের শুরুতে যাত্রা শুরু করে। এখানে বিসিকের প্রশাসনিক ভবন, নিরাপত্তা, ডাম্পিং ইয়ার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ,পানি, ড্রেনেজ সহ আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিসিক ঘিরে রয়েছে নৌ, সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। নৌপথে পণ্য লোড-আনলোডের বন্দোবস্ত এখানে রাখা হয়েছে। এ বিসিকে মোট শিল্প প্লট ১৩৪টি। এরমধ্যে ৩৯টি প্লট উদ্যেক্তারা বরাদ্দ নিয়েছেন। দেশের বৃহৎ-বৃহৎ শিল্প উদ্যেক্তারা এখানে প্লট বরাদ্দ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এ বিসিকের ৬টি শিল্প ইউনিট পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন শুরু করেছে। এখানে ২শ’ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ।পর্যায়ক্রমে সব শিল্প ইউনিট চালু হবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে এ কর্মকর্তা বলেন, এতে জেলার অন্তত ৫ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে এ বিসিক অবদান রাখবে।

পিসিএল পাওয়ার ইঞ্জিনিয়াররিং ওয়ার্কসপের সত্ত্বধিকারী মো: রমজান বলেন, আমরা প্লট বরাদ্দ নিয়ে কারখানা স্থাপন করেছি। অতি সম্প্রতি পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছি। এখনো পুরোপুরি চালু করতে পারিনি। দ্রুত এটি চালু করতে পাবর। আমার কারখানায় ইলেকট্রিক বাতি, ঝাঁড় বাতি সহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করছি। এখানে সম্ভাবনার একটি জায়গা রয়েছে, সেটি হল সব কারখানা চালু হলে কর্মসংস্থান প্রসারিত হবে। এখানে দিনে ৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে না। তাই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে। চায়না থেকে ৫শ’ টাকার যে পরিমান গ্লাস আমাদনী করা যায়, গ্যাস থাকলে সেই গ্লাস মাত্র ৬০ টাকায় এখানে উৎপাদন করা সম্ভব । আমরা কাজ জানি, আমাদের কারখানায় রফতানী মুখী পন্য উৎপাদন করতে পারব। এগুলো বিদেশে রফতানী করতে পারলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রায় আয় করা যাবে। তাই এ বিসিকে গ্যাসের ব্যবস্থা করলে দ্রুত শিল্পায়ন ঘটবে। তাই আমি এখানে গ্যাস চাই।

হারিদাসপুর গ্রামের বাসিন্দা ও সুলতানশাহী-কেকানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাসির উদ্দিন (৫২) বলেন, হরিদাসপুর ছোট একটি গ্রাম। এখানে জমি-জায়গা খুব কম। এখানকার মানুষের আশা ছিল এখানে বিসিক হলে কল কারখানা স্থাপিত হবে। এলাকার মানুষ কর্মসংস্থাননের সুযোগ পাবে। সেই সাথে বাংলাদেশের আর্থসামজিক অবস্থার বিশাল উন্নতি সাধিত হবে। সেই লক্ষ্যেই এখানে বিসিক হয়েছে। বিগত সরকার না থাকার কারণে এখানকার মানুষ হতাশ। হয়তো গোপালগঞ্জে কিছু হবে কি না? বিসিকে শিল্প কলকারখানা চালু হবে কি না? আশাকরি বর্তমান সরকার ভাল কাজগুলো ধরে রাখবে। অন্যান্য জেলার মতো গোপালগঞ্জের দিকেও তাকাবে। বিসিক নিয়ে আমাদের যে আশা ছিল সেটা বাস্তবায়ন হবে। বিসিকে শিল্পায়নের মাধ্যমে এ জেলার মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হবে বলে আমি আশাকরি।

হরিদাসপুর গ্রামের বসিন্দা ইয়াসিন হোসেন রাকিব (৩১) বলেন, এখানে আমাদের জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে। অনেক স্বপ্ন ছিল এখানে কলকারখানা হবে।আমাদের এলাকার মানুষ কাজের সুযোগ পাবে। পরিবার পরিজন নিয়ে ভাল থাকবে। কিছু কারখানা উৎপাদনে গেছে। সেখানে শ’শ’ মানুষ কাজ করছে। আমরা চাই সব শিল্প ইউনিট উৎপাদনে যাক। এ বিসিক কর্মচঞ্চল হয়ে উঠুক। তা হলে আমাদের জেলা আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হবে।

সম্প্রসারিত বিসিকে চালু হওয়া বণফুল এ্যান্ড কোম্পানীর শ্রমিক সাথী বেগম (২৫) বলেন, আমি বণফুলে প্যাকেজিং এর কাজ করি। এখান থেকে যা পাই তা দিয়ে আমার সংসার ভালভাবে চলে যায়। আমার মতো অনেকেই এখানে কাজ করেন। শিল্পনগরীর সব ইউনিট চালু হলে আমাদের মতো আরো হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তাই আমরা এখানে দ্রুত শিল্পায়ন চাই।

গোপালগঞ্জ বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব মো: মোশাররফ হোসেন বলেন, এ শিল্পনগরীর সাথে রেল, সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ রয়েছে। এখানকার পরিবেশ শিল্পবান্ধব। তাই এখানে কলকারখানা স্থাপনে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ রযেছে।বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব বিরাজ করছে। এটি কেটে গেলেই বিসিক শিল্পনগরীতে পুরোদমে শিল্পায়ন হবে। এরমধ্য দিয়ে জেলাবাসীর আর্থিক উন্নতির স্বপ্ন পুরণ হবে।

গোপালগঞ্জ বিসিকের এজিএম এ.কে.এম কামরুজ্জামান বলেন, আমার বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে কথা বলে বিদ্যুৎ সমস্যা নিরসন করব। এখানে গ্যাস দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এছাড়া সম্ভাবনাময় এ শিল্পনগরীর সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেব।

(টিবি/এসপি/আগস্ট ৩০, ২০২৫)