ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ


মুখগহ্বর আমাদের শরীরের অন্যতম সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিনের খাওয়া–দাওয়া, কথা বলা বা হাসি—সবকিছুতেই মুখের বিভিন্ন অঙ্গ সমন্বিতভাবে কাজ করে। তাই মুখের ভেতরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে গুরুত্বসহকারে দেখা অত্যন্ত জরুরি। এমনই একটি সমস্যা হলো ইপিউলিস, যা মূলত দাঁতের মাড়ি বা মুখের নরম মাংসপট্টিতে হওয়া অস্বাভাবিক মাংস বৃদ্ধি বা গুটি।

অনেকেই প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না, কারণ শুরুতে ইপিউলিস ব্যথাহীন এবং ছোট থাকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি বড় হয়ে গিয়ে নানান অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাই সচেতনতা ও লক্ষণ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি।

ইপিউলিস আসলে কী?

ইপিউলিস হলো দাঁতের মাড়ির উপরিভাগে বা মুখের ভেতরের নরম অংশে তৈরি হওয়া এক ধরনের মাংস বৃদ্ধি। এটি দেখতে নরম বা সামান্য শক্ত একটি গুটির মতো হয়, কখনো গোলাকার, কখনো মাশরুমের মতো মাথা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সাধারণত দাঁত ও মাড়ির ঠিক সংযোগস্থলে, দুই দাঁতের মাঝখানে বা তালু, জিহ্বার নিচে এবং ঠোঁটের ভেতরেও এই গুটি দেখা দিতে পারে।

এটি ক্যানসার নয়, কিন্তু বড় হয়ে গেলে কামড়ে যাওয়ার ঝুঁকি, রক্তপাত, ঘা এবং সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে।

ইপিউলিসের শুরুতে যে অনুভূতিগুলো হয়

ইপিউলিস হঠাৎ বড় হয়ে ওঠে না। শুরুতে রোগীরা সাধারণত যেসব অনুভূতি করেন— * মাড়ির মধ্যে বাড়তি কিছু লেগে থাকার অনুভূতি

* জিহ্বা দিয়ে বারবার ওই অংশে স্পর্শ করতে ইচ্ছে হওয়া

* হালকা ব্যথা বা টান টান অনুভূতি

* মাড়ি একটু উঁচু বা ফোলা মনে হওয়া।বড় হলে গুটি খাওয়া বা কথা বলায় বাধা তৈরি করতে পারে।

ইপিউলিস দেখতে কেমন?

ইপিউলিসের চেহারা মানুষভেদে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, তবে সাধারণভাবে— * রং গোলাপি, লালচে বা বেগুনি * আকার প্রথমে খুব ছোট, পরে ১–২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয় * বড় হলে কখনো ৪ সেন্টিমিটারের মতোও হতে পারে * দেখতে মাশরুমের মতো মাথা বিশিষ্ট * নরম বা শক্ত উভয় রকমই হতে পারে। * গুটি ঝুলে থাকলে সহজেই কামড়ে যায়, ফলে রক্তপাত বা ঘা দেখা দেয়।

ইপিউলিসের তিনটি প্রধান ধরন

১. তন্তুযুক্ত ইপিউলিস: মাড়ির তন্তু বা হাড়সংলগ্ন আঁশ থেকে এটি তৈরি হয়। ধীরে বড় হয় এবং তুলনামূলকভাবে শক্ত।

২. দানাদার ইপিউলিস: দাঁত পড়ে যাওয়ার পর খালি স্থানে দ্রুত মাংস বৃদ্ধি পেলে এই ধরনের ইপিউলিস হয়। নরম এবং খুব সহজে রক্তপাত হয়।

৩. বৃহৎ কোষবিশিষ্ট ইপিউলিস: এটি বেগুনি বা লাল গুটির মতো দেখা যায় এবং মুখের নরম টিস্যুতে বেশি দেখা যায়।

কেন ইপিউলিস হয়?

ইপিউলিস হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে—

* মাড়ির দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ :- দাঁতের পাথর, জমে থাকা ময়লা বা সংক্রমণ মাড়িকে দুর্বল করে এবং অস্বাভাবিক মাংস বৃদ্ধিকে উসকে দেয়।

* বারবার আঘাত :- ধারালো দাঁত, ভাঙা দাঁত, খারাপভাবে বসানো দাঁতের সেট বা ব্রেসের চাপ মাড়িকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ইপিউলিস সৃষ্টি করতে পারে।

* হরমোনজনিত পরিবর্তন :- বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় মাড়ি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ফলে অস্বাভাবিক মাংস বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে।

* দাঁতের ভুল অবস্থান :- দাঁত বাঁকা বা তির্যক হলে মাড়ির নির্দিষ্ট জায়গায় বাড়তি চাপ পড়ে, যা গুটি তৈরির কারণ হতে পারে।

* দীর্ঘমেয়াদি অস্বস্তি বা উত্তেজনা :- একই স্থানে দীর্ঘদিন জ্বালা বা চাপ থাকলে সেখানকার কোষ বৃদ্ধি পেয়ে গুটি তৈরি করতে পারে।

শিশুদের কেন ইপিউলিস হতে পারে?

শিশুদের মধ্যে ইপিউলিস তুলনামূলক কম দেখা গেলেও সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক নয়। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রধান কারণগুলো হলো—

১. জন্মগত ইপিউলিস: কিছু শিশুর মুখে জন্মের সময় থেকেই ছোট আকারের ইপিউলিস থাকতে পারে। এটি সাধারণত মাড়ির সামনের অংশে দেখা যায়। অনেক সময় জন্মের পর ধীরে ধীরে কমে আসে, আবার কখনো বড় আকারে দেখা দিলে খাওয়ায় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

২. দাঁত ওঠার সময় মাড়ির সংবেদনশীলতা: দুধদাঁত ওঠার সময় মাড়ি নরম ও ফুলে থাকে। এ সময়ে অতিরিক্ত চাপ, কামড়ানো বা খেলনা চিবানোর কারণে মাড়িতে ক্ষুদ্র ক্ষত তৈরি হলে সেখানে অস্বাভাবিক মাংস বৃদ্ধি হতে পারে।

৩. মুখে আঘাত: শিশুরা খেলাধুলায় প্রায়ই পড়ে গিয়ে বা শক্ত কিছু কামড়ে মাড়িতে আঘাত পায়। সেই আঘাত সারতে গিয়ে অতিরিক্ত মাংস বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে।

৪. মুখ পরিষ্কার না রাখা: অনেক শিশুই নিয়মিত দাঁত মাজতে চায় না বা ঠিকভাবে পরিষ্কার করতে পারে না। ফলে মাড়িতে প্রদাহ ও সংক্রমণ হয়, যা ইপিউলিসের জন্ম দিতে পারে।

৫. দাঁতের জায়গাজনিত চাপ: শিশুর দাঁত কখনো খুব ঘন বা কাছাকাছি ওঠে, ফলে মাড়ির নির্দিষ্ট জায়গায় অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং সেখানে গুটি তৈরি হয়।

ইপিউলিসের সাধারণ লক্ষণ

* মাড়িতে ছোট বা বড় গুটি * স্পর্শ করলে ব্যথা বা সংবেদনশীলতা * সহজে রক্তপাত * মুখে দুর্গন্ধ * কামড়ে গেলে ঘা * দাঁত নড়বড়ে মনে হওয়া * খাওয়ায় অস্বস্তি।শিশুদের ক্ষেত্রে খেতে না চাওয়া, অতিরিক্ত কান্না অথবা মুখে আঙুল ঢোকানোর প্রবণতাও লক্ষণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ইপিউলিস উপেক্ষা করলে কী হতে পারে?

ইপিউলিস সাধারণত বিপজ্জনক নয়, তবে অবহেলা করলে—

* ঘা ও সংক্রমণ * পুঁজ ও দুর্গন্ধ * দাঁত আলগা হয়ে যাওয়া * খাওয়া–দাওয়ায় সমস্যা * মুখের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাওয়া।বড় হলে এটি দৈনন্দিন জীবনেও অসুবিধা তৈরি করতে পারে।

হোমিও সমাধান

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতিতে শুধু রোগ নয়, রোগীর শারীরিক, মানসিক ও ব্যক্তিগত দিক বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। ফলে চিকিৎসা পুরোপুরি ব্যক্তিনির্ভর ও সার্বিক হয়। অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকগণ প্রাথমিকভাবে রোগীর লক্ষণ বিশ্লেষণ করে যেসব ওষুধ নির্বাচন করেন—ক্যালকারিয়া ফ্লুয়োরিকা, সাইলেসিয়া, থুজা অক্সিডেন্টালিস, হিপার সাল্ফ, মারকুরিয়াস সল

সহ আরও অনেক ওষুধ লক্ষণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে। তাই নিজে নিজে ওষুধ ব্যবহার না করে বিশেষজ্ঞ হোমিও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য

১. স্বাভাবিক উপায়ে শরীরকে সুস্থ করার প্রয়াস: হোমিওপ্যাথি শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা বা হিলিং সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে। অস্বাভাবিক টিস্যু-বৃদ্ধি বা গঠনগত পরিবর্তন থাকলেও তা ভেতর থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।

২. রোগের মূল কারণকে লক্ষ্য করা: শুধু বাহ্যিক লক্ষণ নয়—শরীরের ভেতরের অসমতা, টিস্যুর রোগপ্রবণতা, ইমিউন দুর্বলতা ও পুনরাবৃত্তির মূল কারণকে বিবেচনা করে চিকিৎসা করা হয়। ফলে সমস্যা স্থায়ীভাবে কমে এবং পুনঃপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

৩. দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি প্রদান: হোমিওপ্যাথি ধীরে কাজ করলেও এর লক্ষ্য হলো সমস্যাকে ভেতর থেকে স্থায়ীভাবে ঠিক রাখা, যাতে ভবিষ্যতে তা বাড়ে না বা বারবার ফিরে না আসে। মুখগহ্বর ও মাড়ির সমস্যায় এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

৪. অল্প বয়স থেকে বয়স্ক সবার জন্য উপযোগী: শিশু, বয়স্ক ও সংবেদনশীল রোগীদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসা প্রয়োগযোগ্য। ডোজ সবসময় রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সামঞ্জস্য করা হয়।

৫. ব্যথা, জ্বালা ও প্রদাহ কমাতে সহায়ক: মাড়ির ফোলা, অস্বস্তি বা জ্বালায় হোমিওপ্যাথি ধীরে ও নরমভাবে আরাম দেয় এবং টিস্যুর উত্তেজনা কমায়।

৬. অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সাপোর্টিভ কেয়ার: যদি সার্জারি প্রয়োজন হয়, পরে হোমিওপ্যাথি ক্ষত সেরে যাওয়ায়, প্রদাহ কমাতে এবং পুনরাবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সাপোর্ট প্রদান করে।

পরিশেষে বলতে চাই, ইপিউলিস প্রথম দিকে তেমন গুরুত্ব না পেলেও সময়ের সঙ্গে এটিই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই মাড়িতে কোনো অস্বাভাবিক গুটি বা রঙের পরিবর্তন দেখলে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা মানে শরীরের সার্বিক সুস্থতা রক্ষা—এই সচেতনতা সবার থাকা প্রয়োজন।

লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।