ফরিদপুরে মহাসড়কের অর্ধশতাধিক মরা গাছ, উদাসীন বন বিভাগ
রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ফরিদপুর মধুখালি উপজেলার মাঝকান্দি জিরো পয়েন্ট থেকে বোয়ালিয়া বাজার ব্রীজ পর্যন্ত ছকড়িকান্দি এলাকায়, ফরিদপুর-মাগুরা মহাসড়কের পাশে প্রায় অর্ধশতাধিক মরা গাছ দীর্ঘদিন যাবত অবহেলায় পড়ে রয়েছে। যার বেশিরভাগ বিক্রয়যোগ্য মূল্যবান রেন্ডিগাছ হলেও বন বিভাগ ওই গাছগুলো কাটা বা বিক্রির ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না।
যার ফলে, সরকার ওই মরাগাছগুলো থেকে প্রাপ্ত প্রকৃত অর্থ থেকে বঞ্চিত হতে চলেছে। দীর্ঘ সময় মরা অবস্থায় পড়ে থাকায় বেশির ভাগ গাছই ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে কার্যত জ্বালানি কাঠে পরিনত হয়েছে। কিছুকিছু গাছ আবার পোকার আক্রমণের কারণে প্রায় ভঙ্গুর দশা অবস্থায় কোনমতে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় বন বিভাগের সময় মতো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় বেশ কয়েকটি গাছ চুরি হয়ে গেছে বলেও স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কয়েকটি গাছ ভেঙে পড়লে তা রাতের অন্ধকারে কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। সাইজে বেশ বড় ও মহাসড়কের প্বার্শ ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা ওই মরা গাছগুলোর মধ্যে কোনটি ভেঙে সড়কে পড়লে, ফরিদপুর-মাগুরা মহাসড়কের ব্যস্ততম এ গুরুত্বপূর্ণ অংশে যেকোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা, হতে পারে প্রাণহানি।
এদিকে, উল্লেখিত এলাকার ওই গাছগুলো দেখভালের দায়িত্বে থাকা মাঝকান্দি বনায়ন সমবায় সমিতি এ ব্যাপারে স্থানীয় বন বিভাগকে বারবার অবগত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিলেও কোনো প্রকার দৃশ্যমান ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বন বিভাগ।
অপরদিকে, স্থানীয় বন বিভাগ বলেছে এ বিষয়ে সমীক্ষা করে একটি টেন্ডার নোটিশ হলেও তা তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশে বাতিল করা হলে তা আর পুনরায় করা সম্ভব হয়নি। এমতাবস্থায় মহাসড়কের পাশে থাকা গাছগুলো কাটা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে স্থানীয় সচেতন জনসাধারণ। এছাড়া, মহাসড়কে ভেঙে পড়ে কোনো অনাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে এবং মরা গাছগুলোকে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করে সরকারিভাবে বিক্রি করার ব্যবস্থা করতে বন বিভাগের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে অবগত করে চানতে চাওয়া হলে করিমপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুর রহমান জানান, 'মহাসড়কের পাশে থাকা মরা গাছগুলোর কোনোটি সড়কের ওপর বা সড়কের কোনো যানবাহনের ওপর ভেঙে পড়লে, তা অনাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা, প্রানহানি এবং যান চলাচলে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে বৈকি। তবে তার আগেই আশা করছি বন বিভাগ এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিবেন।
এসময় এক প্রশ্নের জবাবে ওসি আমিনুর আরও জানান, 'আমি আমার উর্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে তাঁদের বিষয়টি অবগত করবো। প্রয়োজনে তাঁদের পরামর্শক্রমে এ বিষয়ে লিখিতভাবে বন বিভাগকেও বিষয়টি জানাবো।'
স্থানীয়রা জানায়, গাছগুলো মারা যাওয়ার পর থেকে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত বারবার অবগত করেও বন বিভাগ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পায়নি ওই এলাকার ওসব গাছ দেখভালের দায়িত্বে থাকা মাঝকান্দি বনায়ন সমবায় সমিতি। বিষয়টি স্বীকার করে 'মাঝকান্দি বনায়ন সমবায় সমিতি'র সভাপতি মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম সুজা 'যখন এ মরা গাছগুলো অধিক মূল্যে বিক্রি করা যেতো তখন থেকে আমরা বিষয়টি বন বিভাগকে অবগত করেছি। নিজেদের পায়ের জুতা ক্ষয় করে ফেলেছি, তবুও বন বিভাগ হতে কোনো সমাধান পাইনি। এখন তো গাছগুলো আর আগের মতো নেই। বেশকিছু গাছ শুকিয়ে জ্বালানি কাঠ হয়ে গেছে। কিছু গাছে পোকা ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। সুজা আরও জানান, 'এখনও সময় আছে, বন বিভাগ চাইলে বিক্রি করে ওসব জায়গায় নতুন গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করতে পারে। রাষ্ট্রের সম্পদ এভাবে অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে, দেখতে কষ্ট হচ্ছে। সন্তানের মতো দেখভাল করে গাছগুলোকে বড় করেছি। এসময় বন বিভাগকে এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে স্থানীয় মধুখালি উপজেলা বন কর্মকর্তা দীন মোহাম্মদ মোল্যা জানান, ' উল্লেখিত মরা গাছগুলোর কাটার বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করি নাই তা সঠিক নয়। গাছগুলো বিক্রয়ের জন্য আমরা ইতিপূর্বে দরপত্র আহ্বান করেছিলাম। এমনকি বিক্রয়ের জন্য পত্রিকায় দেওয়া ওই বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা ওই টেন্ডারটি করাতে পারি নাই। হঠাৎ করেই সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশনায় সেটি স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। মুলত: আমাদের মধুখালি উপজেলা বন বিভাগের তরফ থেকে এ ব্যাপারে মোটেও কোনো সমস্যা নাই। ফরিদপুর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে এসব বিষয়ে আমার উর্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করবো। বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা পেলেই আমরা এ ব্যাপারে ইতিআাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবো।'
উপরোক্ত সামগ্রিক বিষয়ে অবগত করে ফরিদপুর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম এর নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান, 'আমি এখানে (ফরিদপুর) নতুন এসেছি। এ গাছগুলোর বিষয়ে আমি আপনার থেকেই প্রথম শুনলাম। বিষয়টির বিস্তারিত খোঁজ খবর নিয়ে পরে আপনাকে জানাতে পারবো।' তিনি আরও জানান,''বর্তমান সরকার দেশের বনায়ন রক্ষার্থে আপাতত গাছ কাটতে নিরুৎসাহিত করেছেন। সরকারের মৌখিকভাবে দেওয়া এ নির্দেশনা অনুযায়ী, একান্ত প্রয়োজন না হলে বা জনস্বার্থ বিঘ্নিত না হলে, গাছ বিক্রিও কার্যত আমরা বন্ধ রেখেছি। এছাড়া, গাছ কাটার বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা এমন যে, যদি জনস্বার্থ বিবেচনায় কোনো জরুরি প্রয়োজনে একটি গাছ কাটা হয় তবে, ওই গাছের পরিবর্তে পাঁচটি গাছ লাগাতে হবে।'
এসময় ফরিদপুর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম আরও জানান, 'এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, 'এ গাছগুলো বিক্রির দরপত্র চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ ও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়েছে- ওই বিষয়টিও আমার জানা নেই।'
এ বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সাথে দেখা হবে জানিয়ে ওই বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আরও বলেন, 'সরকারি নির্দেশনা, সরকারি স্বার্থ রক্ষা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জনস্বার্থের দিকগুলো বিবেচনায় রেখে অবশ্যই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।'
উল্লেখ করা যেতে পারে, উপরোক্ত এলাকায় মহাসড়কের পাশে ওই গাছগুলো কেনো মারা গেছে তা জানা সম্ভব হয়নি। তবে, ওই এলাকার অবস্থিত প্রায় প্রতিটি শিল্প কারখানার গেটে বা পাশে এ গাছ গুলো বেশি দেখা গেছে।
(আরআর/এএস/ডিসেম্বর ২৩, ২০২৫)
