চম্পাফুলে সুনীল মন্ডলের পরিবারকে অবমুক্ত করার নির্দেশ
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে চারটি সিসি ক্যামেরা, কাঁটা তারের বেড়া ও ইটের প্রাচীর দিয়ে একটি পরিবারকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে অবমুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার বিকেলে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মঈনুদ্দিন মঈন এক জনাকীর্ণ আদালতে কালিগঞ্জ উপজলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ আদেশ দেন। মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত এ আদেশ বহাল থাকবে বলেও একই আদেশে উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় মামলার আপিলকারি প্রয়াত সুনীল মন্ডলের স্ত্রী মাধবী মন্ডল ও তাদের ছেলে শঙ্কর মন্ডল ও কাঠগড়ায় হাজির ছিলেন।
সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাড. কল্যাণাশীষ মন্ডল ও অ্যাড. সুধান্য সরকার জানান, কালিগঞ্জের চম্পাফুল কালীবাড়িতে অর্পিত সম্পত্তি ট্রাইব্যুনালে তিন বিঘা জমির রায় ও ডিক্রী পান সুনীল মন্ডল। ওই জমি সুনীল মন্ডলের নামে গেজেটভুক্ত হয়। ওই জমির মধ্যে দুই বিঘা জমি এক সময়কার বারোদহা গ্রামের ও বর্তমানে চম্পাফুলের সামাদ গাজী ও তার ছেলে আলমগীর কবীর ১৯৮০ সালে কমলেশ মন্ডলের কাছ থেকে দুটি দলিল মূলে কিনেছেন মর্মে দাবি করে আসছিলেন। ওই দলিল প্রতিষ্ঠিত করতে না পারায় কমলেশ মন্ডলের ছেলে ভারতীয় নাগরিক তাপস মন্ডলকে দেশে এনে নিঃসন্তান প্রয়াত হাজারী মন্ডলের স্ত্রী কৌশল্লার কাছ থেকে দানপত্র দলিল মূলে দাবি করে ১৯১৯ সালে দলিল করে নেন আলমগীর কবীর। ওই দলিল মূলে নামপত্তন করে নিলে সুনীল মন্ডলের পক্ষ থেকে ১৫০ ধারায় নামপত্তন বাতিলের (কেস নং-৫৬/২৩) আবেদন করা হয়। বিবাদীপক্ষকে নোটিশ করা হয়নি এমন কথা উল্লেখ করে ওই আবেদন বাতিল করে দেন কালিগঞ্জের সহকারি কমিশনার (ভূমি)।
এ আদেশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর আদালতে আপিল মামলা (৫৭/২৩) করেন সুনীল মন্ডল। নিজের তিন ভাইপো হত্যা, স্থানীয় এক হিন্দু সম্প্রদায়ের গৃহবধুকে ধর্ষণ, ধান্যহাটি গ্রামের সাঈদ ও তার মাকে হত্যার পর গুম ও সম্প্রতি সুনীল মন্ডলের বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করার মামলার আসামী সামাদ গাজী ও তার ছেলে আলমগীর কবীর (ঘর জ্বালানি মামলার আসামী) গত বছরের ১৭ আগষ্ট থেকে ২৮ আগষ্ট পর্যন্ত সুনীল মন্ডলের চার বিঘা জমির ফলজ ও বনজ গাছ কেটে ও ফল ও সবজি লুটপাট করে তিন লক্ষাধিক টাকার ক্ষতিসাধন করেন। বাঁশের বেড়া দিয়ে সুনীল মন্ডলের প্রায় চার বিঘা জমি ঘিরে নেন। ৯৯৯ এ ফোন পেয়ে সুনীল মন্ডলের পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে গেলে ১৮ আগষ্ট কালিগঞ্জ থানার একজন উপপরিদর্শক ও একজন সিপাহীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাঠগড়ায় হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে ভৎর্সনা করেন কালিগঞ্জ সহকারি জজ তারিকুল ইসলাম। একপর্যায়ে ২৮ আগষ্ট ওই জমিতে আগামি ২৩ সেপ্টেম্বর ধার্যদিন পর্যন্ত স্থিতাবস্থা জারির নির্দেশ দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)। পরবর্তীতে আর আদালত না বসায় স্থিতাবস্থা জারির নির্দেশ বহাল থাকে। এক পর্যায়ে ১৯ নভেম্বর সুনীল মন্ডল মারা যান। স্থিতাবস্থা আদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সামাদ গাজী ও তার ছেলে সাতক্ষীরা দৃষ্টি হাসপাতালের মালিক আলমগীর কবীর গত ১১ ও ১২ ডিসেম্বর ৫০ জনেরও বেশি লাঠিয়াল ভাড়া করে সুনীল মন্ডলের চার বিঘা জমির চারিধার কাটা তারের বেড়া, তুলসী মন্দির ও টিউবওয়েল বাইরে রেখে ঘরে ঢোকার দুই হাত করে বা রেখে ইটের প্রাচীর দিয়ে ওই পরিবারকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন।
সুনীল মন্ডলের পরিবারের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে তাদের পলিথিনে ঘেরা শৌচাগারের পিছনে নারিকেল গাছে, বসতঘরের পিছনে বৈদ্যুতিক লাইটপোষ্টে, উঠানের সামনে আমগাছেসহ মোট চারটি সিসি ক্যামেরা বসান আলমগীর কবীর। অভিযোগ পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া আক্তার কালিগঞ্জ থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলেও পুলিশ তা বাস্তবায়ন করেনি। একপর্যায়ে ১২ ডিসেম্বর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অভিযোগ পেয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কালিগঞ্জ সহকারি কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দিলে তিনি ১৪ ডিসেম্বর ঘটনাস্থলে যান।
আদালতের আদেশ অমান্য করে আলমগীর কবীর সুনীল মন্ডলের পরিবারের সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে বিষয়টি অবমানবিক বলে আলমগীর কবীরের দুষ্টু মিষ্টি কথায় তুষ্ট হয়ে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ওই অবস্থা থাকবে বলে সুনীল মন্ডল ও সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন। এরপরও সামাদ গাজী জবরদখলকৃত জমিতে চাষাবাদের কাজ করার পাশাপাশি সুনীল মন্ডলের আরো সাড়ে চার বিঘা জমিতে বাঁশ কাটা, চাষ করাসহ সকল কাজ বন্ধ করে দেন। অবরুদ্ধ হয়ে পড়া সুনীল মন্ডলের পরিবারের প্রাইভেসি নষ্ট করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন ২৭ ডিসেম্বর প্রথম আলোর অন লাইন, ২৮ ডিসেম্বরের দৈনিক বাংলা ৭১, দৈনিক পত্রদূত, সুপ্রভাত সাতক্ষীরা, দক্ষিণের মশাল, আলোকিত সকালসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
একপর্যায়ে ল্যাংটা হাফিজ ওরফে টেমি হাফিজের সহায়তায় সম্পাদক শাহ আলমকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে আলমগীর কবীর সাতক্ষীরা সংবাদ নামের এক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ ও প্রকৃত তথ্য উদঘাটন সংক্রান্ত এক মনগড়া প্রতিবেদন ছাপেন। তাতে এক মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকের চরিত্রহনন সংক্রান্ত মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করা হয়। একপর্যায়ে বুধবার আদালতের আদেশ অমান্য করে সুনীল মন্ডলের পরিবারকে অবরুদ্ধ করার বিষয়টি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়। তাৎক্ষণিক বিচারক সুনীল মন্ডলের পরিবারকে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তির জন্য নবনির্মিত প্রাচীর, কাাঁটা তারের বেড়া, ও প্রাইভেসি নষ্টকারি সকল সিসি ক্যামেরা অপসারণের জন্য মুঠো ফোনে ও লিখিতভাবে কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া আক্তারকে নির্দেশ দেন।
কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া আক্তার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব এর আদেশ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে সুনীল মন্ডলের পরিবারের সদস্যদের মারপিট করে গায়ের জোরে ওই জমি থেকে সাড়ে ১৬ শতক জমি দখল করে তাতে রাইস মিল বানান সামাদ গাজী ও আলমগীর কবীর। তা নিয়ে উচ্ছেদের ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত দুটি আপিল মামলা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
(আরকে/এসপি/জানুয়ারি ০৭, ২০২৬)
