শীতের নীরব প্রভাব: স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সমাজের অদৃশ্য দুর্ভোগ
ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
শীতের ঠান্ডা প্রতি বছরই আসে, কিন্তু তার অভিঘাত সবার জীবনে সমানভাবে পড়ে না। কারও কাছে শীত মানে আরাম, উষ্ণ কাপড় আর কুয়াশামাখা সকালের সৌন্দর্য; আবার কারও কাছে শীত মানে রাতভর কাঁপুনি, অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার সংগ্রাম। বাস্তবতা হলো—শীত যত গভীর হয়, সমাজের অসহায় মানুষগুলোর কষ্ট তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ঠান্ডা শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়; এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার এক কঠিন পরীক্ষা।
শীতকালে সবচেয়ে বড় যে সংকটটি সামনে আসে, তা হলো স্বাস্থ্যঝুঁকি। ঠান্ডা আবহাওয়া শিশু ও বৃদ্ধদের শরীর সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। সর্দি-কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির মতো রোগ এই সময় দ্রুত বাড়তে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য অবহেলা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে। গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া যায় না। উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর অভাব প্রায়ই দেখা যায়। দরিদ্র মানুষের পক্ষে বেসরকারি চিকিৎসা নেওয়া কিংবা নিয়মিত ওষুধ কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা অনেক সময় জীবনঝুঁকিতে রূপ নেয়। বিশেষ করে নবজাতক ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি, যা পরিবারকে বাড়তি উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলে।
স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকটও ঘনীভূত হয়। শীতকাল শ্রমজীবী মানুষের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি। দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক কিংবা খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষদের আয় সরাসরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। কুয়াশার কারণে সকালে কাজ শুরু করতে দেরি হয়, আবার সন্ধ্যায় ঠান্ডা বাড়লে কাজ বন্ধ হয়ে যায় দ্রুত। এতে দৈনিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অথচ সংসারের খরচ কমে না; বরং এই সময়েই বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়—উষ্ণ কাপড়, জ্বালানি, ওষুধ ও চিকিৎসা খরচ। অনেক পরিবার বাধ্য হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের পরিমাণ কমাতে, যা পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
গ্রামাঞ্চলে কৃষিনির্ভর মানুষের অবস্থাও শীতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। অতিরিক্ত কুয়াশা ও ঠান্ডা ফসলের ক্ষতি করতে পারে। আলু, শাকসবজি কিংবা বোরো ধানের চারা রোগবালাইয়ের ঝুঁকিতে পড়ে। অনেক কৃষককে কীটনাশক ও অতিরিক্ত পরিচর্যার পেছনে বাড়তি খরচ করতে হয়। ফসল নষ্ট হলে কৃষকের সারা বছরের পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। ঋণের বোঝা বাড়ে, পারিবারিক অনিশ্চয়তা তীব্র হয়। অনেক পরিবারকে তখন শিক্ষাখরচ বা চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে দিতে হয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শহরের সামাজিক বাস্তবতাও শীতকালে কঠিন হয়ে ওঠে। ফুটপাতে বসবাসকারী মানুষ, ভাসমান শ্রমজীবী পরিবার এবং বস্তিবাসীরা উষ্ণ আশ্রয়ের অভাবে চরম দুর্ভোগে পড়ে। একটি কম্বল কিংবা পাতলা চাদরই অনেকের একমাত্র সম্বল। কখনো কখনো একটি কম্বল ভাগ করে নিতে হয় একাধিক মানুষের মধ্যে। শীতের রাতে এই মানুষগুলো সমাজের চোখের আড়ালেই কষ্ট সহ্য করে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায় কাজ হারিয়ে তারা আরও অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে যায়, যা দারিদ্র্যের চক্রকে আরও গভীর করে তোলে।
শীত সামাজিক বৈষম্যকেও আরও স্পষ্ট করে তোলে। একই শহরে কেউ উষ্ণ ঘরে হিটার জ্বালিয়ে আরাম করে থাকে, আবার একই রাস্তায় কেউ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটায়। এই বৈপরীত্য আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এই সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শীত যেন প্রতিবছর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে।
প্রতিবছর শীত এলেই শীতবস্ত্র বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এটি নিঃসন্দেহে মানবিক ও প্রয়োজনীয় একটি কার্যক্রম। তবে বাস্তবতা হলো—এই সহায়তা অনেক সময় পর্যাপ্ত হয় না, আবার কোথাও কোথাও সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছায় না। পরিকল্পিত তালিকা ও স্থানীয় সমন্বয়ের অভাবে প্রকৃত দরিদ্ররা অনেক সময় বঞ্চিত থেকে যান। সহায়তা কার্যকর করতে হলে আগাম প্রস্তুতি, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা জরুরি।
স্বাস্থ্য খাতে শীতকালীন প্রস্তুতি আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, অক্সিজেন সুবিধা ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গ্রাম ও শহরের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা সেবার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে সময়মতো চিকিৎসা পৌঁছানো সহজ হবে এবং অনেক প্রাণ রক্ষা পাওয়া সম্ভব। শীত মানুষের মানসিক অবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ রাত, কাজের অনিশ্চয়তা ও শারীরিক অসুস্থতা অনেক মানুষের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি করে।
দরিদ্র পরিবারে শীতকাল মানেই বাড়তি দুশ্চিন্তা—আজ কাজ হবে তো, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে তো? এই মানসিক চাপ নীরবে সমাজের একটি বড় অংশ বহন করে, যার প্রভাব পরিবার ও সমাজজীবনেও পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও শীতের ধরন বদলাচ্ছে। হঠাৎ তীব্র ঠান্ডা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী শীত ভবিষ্যতে আরও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শীত মোকাবিলাকে শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
সর্বশেষে বলা যায়, শীতের ঠান্ডা আমাদের কাছে শুধু একটি ঋতু নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এই সময় মানুষের কঠিন অবস্থাই আমাদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। ঠান্ডা থামানো যাবে না, কিন্তু সচেতনতা, পরিকল্পনা ও মানবিকতার মাধ্যমে শীতের কষ্ট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব। সেটাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজ বিশ্লেষক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।
